Views Bangladesh Logo

সুন্দরবন দিবস

আমরা কী সুন্দরবনকে সংরক্ষণ করতে পারছি

তকাল বুধবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিশ্বজুড়ে ভালোবাসা দিবস হিসেবে উদযাপন করা হলেও সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলের মানুষ দিনটিকে ‘সুন্দরবন দিবস’ হিসেবে পালন করেন। সুন্দরবন সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় শ্বাসমূলীয় (ম্যানগ্রোভ) বন। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে খুলনাসহ উপকূলীয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দুই দশক ধরে দিনটি পালিত হয়ে আসছে। ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে সুন্দরবনকে ভালোবাসুন’ এই প্রতিপাদ্যে প্রতি বছর উপকূলীয় এলাকায় সুন্দরবন দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

প্রাচীনকাল থেকেই সুন্দরবনের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। ভূবিজ্ঞান ও ইতিহাস বলে, প্রায় ২ হাজার বছর আগে গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকায় সুন্দরবনের সৃষ্টি হয়। ‘নিকোলাস পাইমেন্টা’ নামীয় একজন মিশনারির ভ্রমণকাহিনিতেও সুন্দরবনের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। কালের বিবর্তনে বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হয়। ব্রিটিশ আমলের বেঙ্গল বন বিভাগ স্থাপনের পর বন আইন-১৮৬৫ মোতাবেক ১৮৭৫-৭৬ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়; কিন্তু বর্তমানে আমরা কি এই সুন্দরবনকে সংরক্ষণ করতে পারছি।

পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের সেই সৌন্দর্য, সম্পদ আর নেই। সাম্প্রতিককালে ওই বনে গাছ কাটা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামলেও হরিণের মাংস ও বাঘের চামড়া পাচার থেমে নেই। নদী ও খালে অসাধু জেলেরা বিষ দিয়ে মাছ শিকার করায় নষ্ট হচ্ছে জলজ পরিবেশ। এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব পর্যটন না হওয়ায় বনে দূষণ বাড়ছে। তাই সমৃদ্ধ এ বনের প্রাণিকুল এখন হুমকির সম্মুখীন।

বন বিভাগ সূত্র বলছে, বাংলাদেশ অংশের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবনে এখন বাঘশুমারি চলছে, যা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এবার শুমারিতে বাঘের সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ২০২৩ সালের শুমারি অনুযায়ী, বনে চিত্রা হরিণ, বন্য শূকর ও বানরের সংখ্যা বেড়েছে। ১৯৯৫ সালে বনের নদীতে কুমির ছিল ১৫০ থেকে ২০০টি, ২০১৬ সালের জরিপে কুমিরের সংখ্যা দেখানো হয় ১৫০ থেকে ২০৫টি। তবে কমেছে দুই প্রজাতির ডলফিন। তা ছাড়া নির্বিচারে গাছ কাটা ও বনের পরিবেশ ধ্বংস তো চলছেই।

যদিও সুন্দরবনে গাছপালা কাটা, বাঘ ও হরিণ হত্যা, সেইসঙ্গে পাচারের অপরাধে অনেকে আটক হয়েছে। এই চোরা শিকারিরা অনেক শক্তিশালী। এদের বিরুদ্ধে মানুষ সাক্ষ্য দিতেও ভয় পায়। তারা এ সুযোগ নিয়ে আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসে, আবারও অপরাধে লিপ্ত হয়।

আশার কথা হচ্ছে, বর্তমানে সুন্দরবনের বন্য প্রাণী রক্ষায় অপরাধে জড়িতদের তথ্য প্রদানকারীকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। ফলে কেউ হরিণ শিকার করলে সেই তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে। যার কারণে কিছু কিছু দুষ্কৃতকারীকে আটক করতে পারছে প্রশাসন। কিন্তু তারপরও থেমে নেই বনের পরিবেশ বিনষ্ট করা ও প্রাণী হত্যা।

অন্যদিকে সুন্দরবন বনদস্যুদের হাত থেকে বনজীবীরা মুক্তি পেলেও বনজীবীদের বিষের উৎপাত থেকে মুক্তি পাচ্ছে না সুন্দরবন। ফলে একবার কোনো খালে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করলে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ওই খালে কোনো মাছ তো পাওয়াই যায় না, এমনকি মাছের ডিম বা পোনাও পাওয়া যায় না।

মূলত প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত একটি চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে স্থানীয় ক্ষমতাসীন ও ব্যবসায়ীরা বাঘ, হরিণ ও বন উজাড়ের মহোৎসব চালিয়ে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে লেখালেখি হলে লোক দেখানো কিছু উদ্যোগ ও তৎপরতা দেখা যায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তারপর আবার যা তা-ই হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে, এই বনই আমাদের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। তাই বনের গাছ কাটা, অবৈধভাবে মাছ ধরা এবং বন্য প্রাণী হত্যা ও পাচার রোধ করতে হলে এসব কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ