Views Bangladesh Logo

সালতামামি ২০২৪

বছরজুড়ে পররাষ্ট্রের হালচাল

Manik Miazee

মানিক মিয়াজী

২০২৪ সালে আলোচনার তুঙ্গে ছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর দেশ-বিদেশের সব মহলের নজর ছিল সেগুনবাগিচার দিকে। আলোচনায় ছিল দেশের পররাষ্ট্রনীতি, কূটনৈতিক অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেশের অবস্থান। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বেশ কিছু নতুন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশ-চীন: জুলাইয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে ২১টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি এবং সাতটি ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং সেক্টরে সহযোগিতা, ব্যবসা-বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি পণ্য রপ্তানি ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

বাংলাদেশ-ভারত: সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ডিজিটাল পার্টনারশিপ ও গ্রিন পার্টনারশিপ চুক্তি, ৩টি নবায়নসহ মোট ১০টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

বাংলাদেশ-কাতার: এপ্রিলে কাতার ও বাংলাদেশের মধ্যে পাঁচটি চুক্তি ও পাঁচটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে, পারস্পরিক বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সুরক্ষা, দ্বৈতকর পরিহার, আইনগত বিষয়ে সহযোগিতা, সাগরপথে পরিবহন এবং কূটনৈতিক, অফিসিয়াল ও বিশেষ পাসপোর্টধারীদের ভিসা অব্যাহতি সংক্রান্ত চুক্তি।

বাংলাদেশ-পূর্ব তিমুর: ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ও পূর্ব তিমুরের মধ্যে দুটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড: এপ্রিলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার থাইল্যান্ড সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে পাঁচটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলো বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিভিন্ন মাত্রায় পরিবর্তিত হয়েছে। সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ও কিছু চ্যালেঞ্জ উভয়ই পরিলক্ষিত হয়েছে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক: ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থিতিশীল ও ইতিবাচক ছিল না। ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা উল্লেখ করেছেন, নয়াদিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল, ইতিবাচক এবং গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। তিনি বলেন, ‘ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিশ্বাস করে যে, দুই দেশের শান্তি, নিরাপত্তা, অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধি পরস্পরের সঙ্গে জড়িত’।

যদিও কার্যত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ১৯৭৫ সালের পর সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ৫ আগস্ট বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে যান এবং সেখান থেকে তার দলের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বাংলাদেশ বলছে, এ কারণে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে, যা দুদেশের বন্ধুত্ব, অর্থনীতি এবং সুসম্পর্ক বিনষ্ট করছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক: স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো পাকিস্তানি মালবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নতির ইঙ্গিত দেয়। পাকিস্তানের হাইকমিশনার সৈয়দ আহমেদ মারুফ এই শিপিং রুটকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের উন্নয়নে বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে, ভারতের কিছু মহল এই সম্পর্ক বাড়ানোকে উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে।

নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক: নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়েছে। চুক্তি অনুসারে, দেশটি বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে, যা দুদেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক: মিয়ানমারের সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ, ভারত, চীনসহ ছয় দেশের প্রতিনিধিরা থাইল্যান্ডে বৈঠকে বসেন। এই বৈঠকে মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের ভূমিকা বিশেষ করে জাতিসংঘ, সার্ক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রেক্ষাপটে অংশগ্রহণ এবং প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম: বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী পাঠানোর ক্ষেত্রে শীর্ষ দেশগুলোর একটি। বিদায়ী বছরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা আরও জোরদার হয়েছে, যদিও জুলাই বিপ্লবের সময় বিপ্লব দমনে জাতিসংঘের লোগো ব্যবহার করে ট্রাংক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা: ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্জিত সাফল্য জাতিসংঘে উপস্থাপন করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অভিযোজন এবং অর্থায়ন নিয়ে জাতিসংঘে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।

সার্ক আঞ্চলিক সহযোগিতা: সার্কের কার্যক্রম বর্তমানে অনেকটা স্থবির। তবে বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মোহাম্মদ ইউনূস আবারও সার্ক আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক সহযোগিতা পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বাণিজ্য: মালদ্বীপ, নেপালসহ অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ।

ওআইসি (অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন): মুসলিম বিশ্বে শান্তি, উন্নয়ন এবং শরণার্থী সমস্যাগুলো নিয়ে বাংলাদেশ তার কণ্ঠস্বর জোরালো ভূমিকা রেখেছে।

বিমসটেক (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ): বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ, বাণিজ্য, এবং নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ বিমসটেকের নেতৃত্বে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

কপ-২৯: আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে জাতিসংঘের ২৯তম জলবায়ু সম্মেলন (কপ ২৯) জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই সম্মেলনে রাষ্ট্রপ্রধান, বিজ্ঞানী, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তারা অংশ নেন। তাদের অংশগ্রহণ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ফ্রান্সের মতো বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানরা অনুপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শরণার্থী ইস্যু: রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ২০২৫ সালে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্যোগ ‘বিশেষ বৈশ্বিক সম্মেলন’ আয়োজনে সম্মতি দিয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ।

অর্থনৈতিক কূটনীতি: ২০২৪ সালটি ছিল অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম এবং পরিবর্তনের বছর। বিভিন্ন দেশ তাদের বাণিজ্য চুক্তি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টায় নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের অক্টোবরে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের পূর্বাভাস দৃশ্যমান করেছে কানাডাভিত্তিক ওয়েবসাইট ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট। এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৬তম এবং ২০২৪ সালে প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক শূন্য শতাংশ।

বাণিজ্য চুক্তির প্রসার
আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি: এ বছর বেশ কিছু আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়িত হয়েছে, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব।

উন্নত দেশগুলোর নতুন সহযোগিতা: ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং উত্তর আমেরিকার দেশগুলো উন্নত প্রযুক্তি এবং গ্রিন এনার্জি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছে।

বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রতিযোগিতা

উন্নয়নশীল দেশগুলোর উদ্যোগ: উন্নয়নশীল দেশগুলো করহ্রাস, সহজতর ব্যবসায়িক নীতিমালা এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে চেয়েছে।

সবুজ অর্থনীতির দিকে ধাবিত হওয়া: গ্রিন এনার্জি প্রকল্পে বিনিয়োগে বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে অনেক দেশ। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে।

প্রধান অর্জন ও চ্যালেঞ্জ

অর্জন: এশিয়ার প্রযুক্তিখাতে বিপুল বিদেশি বিনিয়োগসহ দেশের বেশ কিছু বড় বিনিয়োগ প্রকল্প সফল হয়েছে। পাশাপাশি, বৈশ্বিক বাণিজ্য উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ: ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে।

কনস্যুলার সেবা বৃদ্ধি: দূতাবাস ও কনস্যুলেটের কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়ানো হয়েছে। প্রবাসীদের জন্য জরুরি হটলাইন ও অনলাইন সেবা চালু করা হয়েছে। আইনি সহায়তা ও পরামর্শ দিতে হয়েছে বিশেষায়িত টিমও।

নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে বিশেষ নজরদারি ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার প্রচলন। শ্রমিকদের সুরক্ষা আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ।

প্রবাসীকল্যাণ: প্রবাসীকল্যাণ তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদান। দেশে ফেরা প্রবাসীদের পুনর্বাসনে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।

বিদায়ী বছরে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নতুন বাজার তৈরিতে বিশেষ অগ্রগতি হয়েছে।

নতুন দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি: পূর্ব ইউরোপ, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে নতুন চুক্তি স্বাক্ষর। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও নতুন বাজারে প্রবেশের চেষ্টা।

প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন: আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন। কর্মীদের বিশেষ ভাষা শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ।

সুবিধাজনক রেমিট্যান্স নীতি: রেমিট্যান্স পাঠাতে কম খরচ এবং দ্রুত প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের উন্নয়ন। রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের ট্যাক্স ছাড় ও প্রণোদনা।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ