প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে অ্যামটবের প্রতিবাদ ও প্রতিবেদকের বক্তব্য
গত ১৪ মার্চ ভিউজ বাংলাদেশে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ: তিন মোবাইল অপারেটর গ্রাহকের পকেট কেটে নিয়েছে চার হাজার কোটি টাকা!' শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ১৭ মার্চ মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের (অ্যাসোসিয়েসন অব মোবাইল অপারেটার্স) পক্ষ থেকে এ প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রতিবাদ পাঠানো হয়েছে। যদিও পেশাদার সাংবাদিকতার রীতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট তিন মোবাইল অপারেটরের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে পাঠানো বক্তব্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে যথাযথভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে। তারপরও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম হিসেবে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এখানে অ্যামটবের প্রতিবাদ হুবহু প্রকাশ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিবাদ সম্পর্কে প্রতিবেদকের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে।
অ্যামটবের বক্তব্য:
অ্যামটবের মহাসচিব অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল মোহাম্মদ জুলফিকার স্বাক্ষরিত এ প্রতিবাদে বলা হয়েছে, “গত ১৪ মার্চ অনলাইন পোর্টাল 'ভিউজ বাংলাদেশ'-এ প্রকাশিত "অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ: তিন মোবাইল অপারেটর গ্রাহকের পকেট কেটে নিয়েছে চার হাজার কোটি টাকা!" শীর্ষক প্রতিবেদনটি আমাদের নজরে এসেছে। প্রতিবেদনটিতে কিছু সরল অঙ্কের মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ও ভিত্তিহীন দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে যে, ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি ড্যাটা প্যাকেজ উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর শীর্ষ তিন মোবাইল অপারেটর (বাংলালিংক, গ্রামীণফোন ও রবি আজিয়াটা) গ্রাহকদের কাছ থেকে "বাড়তি" প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আয় করেছে। এই প্রতিবেদনে মোবাইল অপারেটরদের রাজস্ব-সংক্রান্ত যে তথ্য ও অঙ্ক উপস্থাপন করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মনগড়া ও বাস্তবতার নিরিখে ভিত্তিহীন। আমরা এই প্রতিবেদনের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছি।
প্রতিবেদনে দাবি করা বাড়তি ৪ হাজার কোটি টাকার হিসাবটি কোনো প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক বা শিল্প বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়নি। শুধুমাত্র কিছু ধারণা ও জিএসএমএ’র একটি প্রতিবেদন থেকে নেওয়া গ্রাহক সংখ্যা ধরে এই অঙ্ক "দাঁড় করানো" হয়েছে, যা বাস্তব রাজস্ব চিত্রের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
প্রতিবেদনে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সঠিক সংখ্যা এবং ১০ জিবি প্যাকেজ ব্যবহারকারী গ্রাহকের প্রকৃত সংখ্যা—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভেরিয়েবলই দুর্বল। আবার ইন্টারনেটের দাম ধরার ক্ষেত্রে ১০ গিগাবাইটের প্যাকেজকে স্ট্যান্ডার্ড ধরা হয়েছে, যদিও বাংলাদেশে গ্রাহকেরা জনপ্রতি গড়ে এর অর্ধেক বা কিছু বেশি ইন্টারেনেট ব্যবহার করেন। প্রতিবেদক ভালোভাবেই জানেন যে একজন গ্রাহক একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সামান্যতম ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও তাকে একটিভ ব্যবহারকারী বলে ধরে নেওয়া হয়। এর অর্থ এই নয় যে এই বিপুলসংখ্যক ইন্টারনেট ব্যবহারকারীই রাজস্ব আহরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অপারেটরদের ৩০ দিনের প্যাকেজকে হিসাবে ধরে একেকটি অপারেটরের মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ৪০ শতাংশের আয় ধরে হিসাব করা হয়েছে। সাধারণ পাটিগণিতের হিসাবেও যখন কোটির অঙ্ক আসে, তখন ভেরিয়েবলের সামান্য হেরফেরে ফলাফলের বিশাল পরিবর্তন ঘটে। এখানে সেই মৌলিক সত্যটিকেই উপেক্ষা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে "পকেট কাটা" শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা অত্যন্ত আপত্তিকর ও সংবাদমাধ্যম-সম্মত নয়। মোবাইল টেলিকম খাত একটি পণ্য ও সেবাভিত্তিক ব্যবসা। বাজারের অন্যান্য পণ্যের মতোই প্যাকেজের দাম ওঠানামা করে, যা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। গ্রাহকের চাহিদা ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী প্যাকেজ নির্ধারিত হয় এবং গ্রাহক নিজস্ব চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী তা ক্রয় করেন।
প্রতিবেদনে মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে মতামত নেওয়া হলে তারা "রাজস্ব আয়ের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর" বলে উল্লেখ করলেও প্রতিবেদক তা আমলে নেননি। যে ৪ হাজার কোটি টাকার বাড়তি আয়ের কথা বলা হয়েছে, তা শুধু প্রতিবেদকের কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ; অপারেটরদের কোনো অঙ্কেই এর অস্তিত্ব নেই।
আমরা আশা করি, 'ভিউজ বাংলাদেশ' কর্তৃপক্ষ তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধনী (Corrigendum) প্রকাশ করবে। ভবিষ্যতে এমন অপ্রমাণিত ও বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থেকে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকতার চর্চা করবে, যা পাঠক ও শিল্প উভয়ের জন্যই মঙ্গলজনক।
প্রতিবেদকের বক্তব্য:
অ্যামটবের প্রতিবাদে ভিউজ বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যগত বিষয়ে বিভ্রান্তি কোথায় সেটা সুনির্দিষ্টভাবে তুলে না ধরে ভিউজ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে সাংবাদিকতা-বিষয়ক জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যা হাস্যকর। একই সঙ্গে ওই প্রতিবাদপত্রের শেষাংশে ভিউজ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে প্রচ্ছন্ন ভাষায় হুমকি দেওয়া হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
সাংবাদিকতার রীতি মেনে এবং এবং বিশ্ব স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করেই ‘ভিউজ বাংলাদেশ’-এর প্রতিবেদনে যাবতীয় তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গণিত শাস্ত্রের মূল ভিত্তিই ধারণা সূচকের ওপর নির্ভরশীল। পাটিগণিত কিংবা বীজগণিত উভয় ক্ষেত্রেই ‘ধারণা সূচক’ দিয়ে শুরু করেই জটিল অঙ্কের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণের মাধ্যমে সঠিক ফলাফল নির্ধারণ করা হয়। এটা গণিতশাস্ত্র সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা রাখা ব্যক্তিমাত্রই জানেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কিংবা এ জাতীয় বিশ্বস্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোও ‘ধারণা সূচক’ গাণিতিক পদ্ধতি অবলম্বন করেই প্রতি বছর বিভিন্ন দেশের দুর্নীতি বেড়ে যাওয়া কিংবা কমে যাওয়ার ধারণাপত্র দিচ্ছে। একটি দেশের জিডিপিও নির্ধারণ করা হয় মূল্যভিত্তিক ও মাথাপিছু আয়ের তুলনামূলক ধারণা সূচক থেকেই। ভিউজ বাংলাদেশ আধুনিক গণিতশাস্ত্র এবং বিশ্বস্বীকৃত দুর্নীতিবিরোধী এবং অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিষ্ঠিত ‘ধারণা সূচক’ পদ্ধতি অসুসরণ করেই চার হাজার কোটি টাকা বাড়তি আয়ের যুক্তিযুক্ত তথ্য দিয়েছে, যা পাঠক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
বাংলাদেশে কোনো মোবাইল অপারেটরই ইন্টারনেট থেকে আয়ের হিসেব প্রকাশ করে না। এমনকি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি’র পরিসংখ্যানেও কোন অপারেটরের কত গ্রাহকসংখ্যা সে হিসাব দিলেও কোন অপারেটরের ড্যাটা গ্রাহকসংখ্যা কত, কোন মাসে কোন ধরনের প্যাকেজের গ্রাহকসংখ্যা কত ছিল, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয় না। ফলে বাংলাদেশে মোবাইল অপারেটরদের ড্যাটা প্যাকেজ সংক্রান্ত ব্যবসা সবসময়ই রহস্যময় থেকে গেছে। এ কারণে অ্যামটবের প্রতিবাদপত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে তিন মোবাইল অপারেটরের কার কত ড্যাটা গ্রাহক ছিল এবং কোন ধরনরে প্যাকেজ কতজন গ্রাহক ব্যবহার করেছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে সেটাই হতো গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিযুক্ত।
প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ‘পকেট কাটা’ শব্দটি বাংলা সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে, গণমাধ্যমে, সংবাদমাধ্যমে স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য শব্দ হিসেবে বহুল ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কেউ কোনো কৌশলে কিংবা অপকৌশলে কোনো ক্ষেত্র থেকে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ নিলে সেখানে ‘পকেট কাটা’ শব্দটি উচ্চ স্তরের রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়। ভিউজ বাংলাদেশের প্রতিবেদনেও রূপক অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিন মোবাইল অপারেটরের পাঠানো বক্তব্য হুবহু সংযুক্ত করা হলেও অ্যামটবের প্রতিবাদপত্রে ‘মোবাইল অপারেটরদের মতামত আমলে নেওয়া হয়নি’ বলে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা অসত্য এবং অগ্রহণযোগ্য। জন্ম থেকেই সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠতা ও পেশাদারত্ব ‘ভিউজ বাংলাদেশ’-এর মূল ভিত্তি। ভিউজ বাংলাদেশ সবসময়ই এ ধারা অব্যাহত রাখবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে