অমাবস্যা থেকে অকালবোধন
ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা হলো তার মানুষের সামষ্টিক চেতনার আধারও। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শব্দের স্তরে স্তরে জমা হয়ে থাকে মানুষের দুঃখ, আখ্যান, ভয় ও স্বপ্ন। তাই দুটি ভাষার নৈকট্য কেবল তাদের শব্দের সাদৃশ্য দিয়ে মাপা যায় না।
দুটি ভাষা পরস্পরের কাছে আসে তখনই, যখন তাদের অন্তরে লালিত হয় একই রকম অন্ধকার, একই ধরনের স্বপ্ন। হিন্দি ও বাংলা—উভয়ই সংস্কৃতের কন্যা। কিন্তু কেবল এই পরিচয়ে তাদের আত্মীয়তার কথা বললে সেই নিবিড় সম্পর্কের গভীরতাকেই খাটো করা হয়। পুরাণের একই স্মৃতিভান্ডার থেকে পুষ্ট হয়েছে উভয় ভাষার কল্পনা ও চেতনা।
এই ঘনিষ্ঠতার উজ্জ্বলতম প্রমাণ এমন একটি কবিতা, যাকে নিঃসন্দেহে হিন্দি কাব্যের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোর অন্যতম বলে গণ্য করা যায়—নিরালার ‘রাম কি শক্তিপূজা’। শিল্পকুশলতা, ছন্দবিন্যাস, চিত্রকল্প ও অর্থের গভীরতায় কবিতাটি যেকোনো ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিতার পাশে স্থান পাওয়ার যোগ্য। তবু একে কেবল হিন্দি সাহিত্যের একান্ত সম্পদ বলে ভাবলে এর অর্থের অর্ধেকই হারিয়ে যায়। এর আখ্যানের ভিত্তি এসেছে বাংলা রামায়ণ থেকে, আর এর আত্মা পুষ্ট হয়েছে বাংলার শাক্তচেতনার আলো-হাওয়ায়। এই প্রবন্ধে সেই সম্পর্কেরই সন্ধান করা হবে—কবিতার সূচনায় থাকা অমাবস্যা থেকে তার পরিণতির অকালবোধন পর্যন্ত।
নিরালার শৈশব কেটেছে বাংলায়। তাঁর বাবা সৈনিক হিসেবে যে মহিষাদল রাজ্যে কর্মরত ছিলেন, সেই জনপদও ছিল বাংলার সাংস্কৃতিক চেতনারই অংশ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সীমিত হলেও স্বশিক্ষার মধ্য দিয়ে তিনি হিন্দি, সংস্কৃত, ইংরেজি ও বাংলায় জ্ঞান অর্জন করেন। বাংলার ওপর তাঁর দখল ছিল এতটাই গভীর যে তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস, ‘শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’ এবং বিবেকানন্দের ‘রাজযোগ’ হিন্দিতে অনুবাদ করেন। রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দের একাধিক কবিতার পদ্যানুবাদও করেছিলেন তিনি। হিন্দি সমালোচকেরা বারবার তাঁর কাব্যভাষার বাগ্ভঙ্গি, ছন্দ ও সংবেদনশীলতার ওপর বাংলা ভাষার প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন।
এই সংযোগ কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক ছিল না; ছিল প্রত্যক্ষ জীবন-অভিজ্ঞতারও অংশ। নিরালার বেড়ে ওঠা বাংলায় প্রতি শরৎেই তিনি দেখেছেন দেবীর আগমন, পূজা ও বিসর্জন ঘিরে বাড়ি ও মণ্ডপে মণ্ডপে উৎসবের আবহ। ফলে শরতের অমাবস্যার রাত এবং অসময়ে দেবীকে আহ্বানের কাহিনি রচনা করতে গিয়ে তিনি শুধু কোনো সাহিত্যিক উৎসের ওপর নির্ভর করেননি। ফিরে গিয়েছিলেন নিজের শৈশবের স্মৃতিতে—যা তিনি শুনেছেন, দেখেছেন, অনুভব করেছেন, তারই কাছে। তাঁর ব্যক্তিজীবনও ছিল শোক ও সংগ্রামে ক্ষতবিক্ষত। অল্প বয়সেই স্ত্রীকে হারিয়েছিলেন তিনি; আর এই কবিতা রচনার কিছুদিন আগে মারা যায় তাঁর কন্যা সরোজ।
সাহিত্যজগতেও তাঁকে প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হয়েছে বিরোধিতা, অবহেলা ও দারিদ্র্যের। পরাজয় ও সংগ্রাম যাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, তাঁর রামের মধ্যেও ক্লান্তি ও সংশয়ের ছায়া পড়বে—এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। তাই কখনো কখনো এই কবিতার রামকে নিরালারই প্রতিচ্ছবি বলে মনে হয়।
পঞ্চদশ শতকের কৃত্তিবাসী রামায়ণ বাঙালির কল্পনা ও চেতনায় ততটাই গভীরভাবে প্রোথিত, উত্তর ভারতে তুলসীদাসের ‘রামচরিতমানস’ যেমন। তবে কৃত্তিবাসী রামায়ণের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো এমন এক আখ্যান, যা তুলসীদাসের রচনায় অনুপস্থিত—অকালবোধন। ‘অকাল’ অর্থ অনুপযুক্ত সময়, নির্ধারিত বিধানের বাইরে কোনো কাল; আর ‘বোধন’ অর্থ জাগিয়ে তোলা।
শাস্ত্রের বিধান অনুসারে, দেবীর পূজার উপযুক্ত সময় বসন্তকালীন নবরাত্রি। শরৎ হলো তাঁর নিদ্রার সময়। অথচ চরম সংকটের মুহূর্তে, রাবণবধের আগে, রামকে সেই নিদ্রার কালেই দেবীকে জাগিয়ে তুলতে হয়। এই আখ্যানের বীজ পুরাণে নিহিত, এবং এর সঙ্গে কালিকাপুরাণের ঐতিহ্যেরও সম্পর্ক রয়েছে; কিন্তু বাংলার জনমানসে একে প্রতিষ্ঠিত করার কৃতিত্ব কৃত্তিবাসের।
আজও এই কাহিনিকে বাংলার শারদীয় দুর্গাপূজার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক গভীর প্রশ্ন। জীবন যখন বিপন্ন, তখন কি নির্ধারিত আচারবিধি অতিক্রম করা যায়? বিধান কি মানুষের অস্তিত্বের চেয়েও বড়, নাকি শেষ পর্যন্ত মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই তার প্রয়োজন? কৃত্তিবাসের আখ্যানে ব্রহ্মার পরামর্শে এই প্রশ্নের মীমাংসা হয়। দেবতাদের অনুমতিতেই বিধানের ব্যতিক্রম ঘটে, আর রাম পালন করেন এক অনুগত পুরোহিতের ভূমিকা।
সংঘাত সেখানে আছে, কিন্তু তা অস্তিত্বের সংকট নয়; আচারবিধির পরিসরেই সীমাবদ্ধ। নিরালা সেই একই কাহিনিকে নিয়ে যান সম্পূর্ণ ভিন্ন এক স্তরে।
কবিতার সূচনা গোধূলি পেরিয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার মুহূর্তে। সারাদিনের যুদ্ধ শেষে সূর্য অস্ত যাচ্ছে, আর সামনে নেমে আসছে অমাবস্যার রাত।
এখানে নিরালার প্রথম কাব্যিক সিদ্ধান্তটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়: তিনি যুদ্ধের সূচনায় তাঁর মহাকাব্যিক আখ্যান শুরু করেননি; শুরু করেছেন প্রথম দিনের অমীমাংসিত লড়াইয়ের পরের রাতে। কবিতা শুরু হয় ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন রাম সবচেয়ে দুর্বল।
এখানে প্রকৃতি ও মনের অবস্থার একাত্মতা তীব্রতম রূপ পেয়েছে। দিক্বিদিকের বোধ হারিয়ে যায়, বাতাস স্তব্ধ হয়ে থাকে, আর আকাশের বুক থেকে অন্ধকার যেন উথলে উঠে পৃথিবীর ওপর নেমে আসে। এই অন্ধকার কেবল বাইরের জগতের নয়; এ রামের মনের অন্ধকারও।
ছায়াবাদী কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রকৃতি ও মানুষের অন্তর্জগতের ঐক্য। এই কবিতায় সেই ঐক্য তার গভীরতম প্রকাশ খুঁজে পায়। বাইরের চাঁদহীন রাত আর অন্তরের পরাজয়ের রাত একে অপরের মধ্যে মিশে যায়।
কবিতার ভাষাও এই অন্ধকার নির্মাণ করে। তৎসম শব্দের ভার ও অনুপ্রাসে সমৃদ্ধ শব্দচয়ন পাঠকের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। এক পঙ্ক্তি থেকে আরেক পঙ্ক্তিতে বাক্য গড়িয়ে চলে, শ্বাস নেওয়ার অবকাশও যেন খুব কম থাকে।
ভাষা এখানে শুধু বিষয়কে বর্ণনা করে না; নিজের শরীরের মধ্যেই সেই অভিজ্ঞতাকে বাস্তব করে তোলে।
এবার এই দৃশ্যের পাশে বাংলার স্মৃতিকে রাখলে তার তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়। মহালয়ার অমাবস্যা পিতৃপক্ষ থেকে দেবীপক্ষে উত্তরণের মুহূর্ত—মৃত্যুর সবচেয়ে কাছের প্রান্তে দাঁড়িয়ে নতুন জীবনের সূচনা। শাক্তদর্শনে দেবী সৃষ্টি ও ধ্বংস—উভয়েরই অধিষ্ঠাত্রী। তাই তাঁর আহ্বান জন্ম নেয় সমাপ্তির গর্ভ থেকে, অন্ধকারের অন্তঃস্থল থেকে। নিরালার অমাবস্যা যেন সেই অন্ধকার সময়েরই এক কাব্যিক প্রতিধ্বনি। কবিতাটিকে ‘শক্তির পূজা’ বলা যেতে পারে, কিন্তু তার প্রথম নিশ্বাসে রয়েছে শক্তির অনুপস্থিতি।
পরাজয়ের পর রামের মনে যে মানসিক অবস্থা জন্ম নিয়েছে, তার ভেতর দিয়ে যুদ্ধের স্মৃতি ফিরে আসে। রামের পক্ষ না জিতেছে, না হেরেছে; কিন্তু রামের কাছে বিজয়ের অনুপস্থিতিই পরাজয়ের সমান। সেই অনুভূতি তাঁর অন্তরের গভীরে গিয়ে জমাট বেঁধেছে। এখানে রাম অবতার নন; তিনি এমন এক মানুষ, যিনি নিজের ধর্ম ও কর্তব্য নিয়েই সংশয়ে পড়তে শুরু করেছেন।
এই বিষাদের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী মুহূর্ত আসে তখন, যখন সংযমের জন্য খ্যাত বীরের চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ে। তাঁর মনে জেগে ওঠে সীতার স্মৃতি, আর ঠিক তখনই কবিতাটি এক অসাধারণ বাঁক নেয়।
ভাষা কোমল হয়ে আসে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফুলের বাগানে তাঁদের প্রথম সাক্ষাতের দৃশ্য—যে মুহূর্তে প্রথমবারের মতো মিলেছিল দুটি দৃষ্টি। ধ্বনির জায়গা নেয় রং ও মাধুর্য। এই পরিবর্তন এক গভীর কাব্যিক কৌশল। সেই স্মৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চোখ—দৃষ্টির সঙ্গে দৃষ্টির প্রথম মিলন।
কবিতার চূড়ান্ত মুহূর্তে রাম প্রস্তুত হন নিজের চোখ উৎসর্গ করতে। যে চোখ একদিন সীতাকে দেখেছিল, সেই চোখই তিনি এবার দেবীর উদ্দেশে নিবেদন করতে চান। প্রেমের প্রথম মুহূর্ত আর আত্মত্যাগের শেষ মুহূর্ত একই অঙ্গের মধ্য দিয়ে একসূত্রে বাঁধা পড়ে। কবিতার শুরুতে রোপিত স্মৃতিই পরিণতিতে হয়ে ওঠে তার সমাপ্তির বীজ।
এই বিষাদেরই এক পর্যায়ে রামের উপলব্ধি জন্ম নেয়—যা কবিতার ভাবাদর্শিক কেন্দ্র: ‘অন্যায় জিধর হ্যায়, উধর শক্তি’—অন্যায় যে দিকে, শক্তিও সে দিকেই। এই পঙ্ক্তি নিছক পৌরাণিক পর্যবেক্ষণ নয়; এর মধ্যে নিহিত রয়েছে ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ভার। কবিতাটি রচিত হয় ১৯৩৬ সালে, যখন উপমহাদেশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন। সাম্রাজ্যের বস্তুগত ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সমাজ তখন ক্লান্ত, বিভক্ত ও অনিশ্চিত। রাম হয়ে ওঠেন একই সঙ্গে পরাধীন জাতি ও কবির নিজের প্রতীক।
এবার আমরা পৌঁছে যাই কবিতার নির্ণায়ক সূত্রটির কাছে। এই হতাশার মুহূর্তেই আসে জাম্ববানের পরামর্শ। কৃত্তিবাসের আখ্যানে এই ভূমিকা পালন করেন ব্রহ্মা। নিরালা সেই ভূমিকায় এনেছেন জাম্ববানকে, আর এই পরিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রহ্মা দেবজগতের স্রষ্টা; জাম্ববান যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞ সহযোদ্ধা। ফলে পরামর্শ আর স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনো দৈব নির্দেশ থাকে না।
তার বদলে তা উঠে আসে শিবিরের ভেতর থেকে—এক প্রবীণ সহযোদ্ধার প্রজ্ঞা থেকে। জাম্ববান রামকে শক্তির এক ‘মৌলিক কল্পনা’ নির্মাণ করতে বলেন। কবিতাটি বোঝার চাবিকাঠি এই শব্দবন্ধ। এখানে ‘কল্প’ বলতে বোঝায় পূজার ধরন, তার বিধি ও আচারের বিন্যাস। সুতরাং ‘মৌলিক কল্পনা’ অর্থ নিজের পূজাপদ্ধতি নিজে সৃষ্টি করা—এমন এক সময়ে, যখন শাস্ত্রের বিধান অনুসারে পূজা হওয়ারই কথা নয়।
জাম্ববান রামকে প্রচলিত বিধান অনুসরণ করতে বলেন না। তিনি বলেন, নিজের কল্প নিজেকেই নির্মাণ করতে হবে, নিজের পূজার সময়ও নিজেকেই স্থির করতে হবে—সে সময় অকাল হলেও।
বাংলার পূজার ঐতিহ্যের সঙ্গে এই শব্দের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সেখানে ষষ্ঠীর দিন দেবীর বোধনের পাশাপাশি পালিত হয় ‘কল্পারম্ভ’—নির্ধারিত পূজাপদ্ধতির সূচনা। কৃত্তিবাসের আখ্যানে এই কল্প ব্রহ্মার কাছ থেকে প্রাপ্ত; বিধান বাইরে থেকে, ওপর থেকে আসে, আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। নিরালার কবিতায় বিধান বাইরে থেকে আসে না; সাধককেই নিজের জন্য তা নির্মাণ করতে হয়।
এই দিক থেকে নিরালা কৃত্তিবাসকে অতিক্রম করেন। কৃত্তিবাসের আখ্যানে অকাল হলো এমন এক সমস্যা, যার সমাধান করেন দেবতারা। নিরালার কবিতায় অকাল হয়ে ওঠে এমন এক পরিসর, যেখানে মানুষ তার নিজস্ব সৃজনশীলতার পরিচয় দেয়।
শাস্ত্রনির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে, প্রতিষ্ঠিত সব বিধান যখন কার্যকারিতা হারায়, তখন অবশিষ্ট থাকে কেবল নিজের নির্মিত কল্প। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কবিতাটি হয়ে ওঠে কবির নিজেরও এক ইশতেহার।
স্থির ছন্দের কর্তৃত্বকে যিনি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, কাব্যভাষার সীমানা যিনি প্রসারিত করেছিলেন, জীবন সম্পর্কে তাঁরও ছিল একটি বিশেষ উপলব্ধি: উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিধানের মধ্যে নয়, নিজের হাতে নির্মিত নিয়মের মধ্য দিয়েই সিদ্ধি আসে।
পরাধীন উপমহাদেশের জন্যও এর মধ্যে ছিল এক তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা। শক্তি যখন অন্য পক্ষে অবস্থান করে, তখন সে আপনা থেকেই আমাদের পক্ষে চলে আসবে—এমন বিশ্বাস নিছক মোহ। নিজেদের নির্মিত বিধানের মধ্য দিয়েই তাকে জাগিয়ে তুলতে হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম্’-এ মাতৃভূমিকে কল্পনা করা হয়েছিল দুর্গা ও কালীর রূপে; আর পরাধীন জাতি নিজেই হয়ে উঠেছিল সেই দেবী, যাঁকে সংকটের অকালবেলায় জাগিয়ে তুলতে হবে।
নিরালা বাংলার এই শক্তিকল্পনাকে হিন্দি ভাষায় বহন করে আনেন, কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেন না; একে আরও এক ধাপ এগিয়ে দেন। সেখানে দেবী এক বহিরাগত শক্তি, যাঁর আশ্রয় প্রার্থনা করতে হয়। এখানে সাধক নিজের কল্পনার মধ্য দিয়ে তাঁকে নির্মাণ করেন, জাগিয়ে তোলেন।
কবিতার মধ্যভাগে বর্ণিত হয়েছে সাধনা। রাম দেবীর পূজায় বসেন, আর হনুমান নিয়ে আসেন একশ আটটি নীলপদ্ম। নিরালা কেবল বাহ্যিক আচার নির্মাণ করেন না; তিনি অনুসরণ করেন সাধকের অন্তর্জাগরণের যাত্রাকেও।
রামের মন ধাপে ধাপে ঊর্ধ্বমুখী হয়, চক্রের স্তরগুলো অতিক্রম করে এগিয়ে যায় আজ্ঞাচক্রের দিকে।
এ হলো শাক্ত-তান্ত্রিক যোগের ভাষা, যেখানে দেবী একই সঙ্গে ঐশ্বরিক সত্তার প্রতিমূর্তি এবং মানুষের ভেতরে নিদ্রিত শক্তি। তাই জাগরণ ঘটে অন্তরে; ‘বোধন’ কেবল দেবীর নয়, রামেরও। এই সাধনার মধ্যে রয়েছে পরীক্ষার উপাদানও।
দেবী সহজে বর দেন না। পূজা প্রায় সম্পূর্ণ হওয়ার মুহূর্তে, যখন আর মাত্র একটি পদ্ম নিবেদনের বাকি, রাম আবিষ্কার করেন—একটি পদ্ম নেই। দেবী নিজেই সেটি সরিয়ে নিয়েছেন।
টানটান উত্তেজনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। এই পর্যন্ত পূজা চলেছে নির্ধারিত বিধি মেনে; এবার সেই বিধির সীমান্তে এসে পৌঁছায় আচার, আর তার পরেই শুরু হয় এমন এক অভিজ্ঞতা, যা বিধানের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়।
রাম বিচলিত হন না। মায়ের স্নেহমাখা সম্বোধন—‘রাজীবনয়ন’—তাঁর মনে পড়ে যায়। তিনি নিজের একটি চোখ উৎসর্গ করার জন্য তির তুলে ধরেন। এখানেই মৌলিক কল্পনার পরিণতি।
নির্ধারিত পদ্মের নিবেদন শেষ হয়ে গেছে; তাই রাম নিজের কল্প নির্মাণ করেন, নিজের শরীরকেই পূজার উপকরণ করে তোলেন।
অকালবোধনের প্রশ্নে এটাই নিরালার উত্তর: বিধান যখন আর যথেষ্ট নয়, তখন মানুষ নিজেকেই নিবেদন করুক। রাম দেবীর কাছে কিছু চান না; নিঃশর্তভাবে নিজেকেই উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হন।
ঠিক তখনই দেবীর আবির্ভাব ঘটে। তিনি রামের হাত থামিয়ে তাঁকে সম্বোধন করেন—‘পুরুষোত্তম নবীন’। ‘নবীন’ শব্দটির তাৎপর্য গভীর। রাম আগে থেকেই পুরুষোত্তম, কিন্তু এবার নিজের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে তিনি এই অভিধা অর্জন করেন।
এরপর দেবী অদৃশ্য হয়ে যান না; তিনি রামের মুখমণ্ডলে বিলীন হয়ে যান। কৃত্তিবাসী আখ্যানে শক্তি বাইরে থেকে তাঁর কৃপা বর্ষণ করেন; এখানে তিনি রামের অন্তরে মিশে যান।
যে শক্তির সন্ধান বাইরে করা হচ্ছিল, তা আসলে শুরু থেকেই অন্তরে বিরাজমান ছিল; সাধনা হয়ে ওঠে সেই শক্তিকে জাগিয়ে তোলার উপায়। এই অদ্বৈতবাদী ভাবনা কৃত্তিবাস কিংবা পুরাণে এভাবে নেই; এটি নিরালার নিজস্ব সংযোজন।
বাংলার শাক্তভক্তিতে বিনয় ও বিদ্রোহ পাশাপাশি অবস্থান করে। ভক্ত দেবীর সামনে মাথা নত করেন, আবার তাঁকেই প্রশ্ন করেন, তাঁর কাছে অভিমান ও অভিযোগও জানান।
নিরালার রামের মধ্যেও এই দ্বৈত সত্তা দেখা যায়। তিনি বিনম্র, অথচ বিধান ব্যর্থ হলে অপেক্ষা করে থাকেন না; নিজেই সিদ্ধান্ত নেন। এটি ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং তার দ্বান্দ্বিক রূপান্তর—যেখানে ঐতিহ্যকে একই সঙ্গে গ্রহণ করা হয় এবং অতিক্রমও করা হয়।
তবে এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ধরে নেওয়া ভুল হবে যে প্রভাবের প্রবাহ কেবল এক দিকেই চলে। ভাষার মধ্যে আদান-প্রদান কখনো একমুখী নয়। নিরালার রামও তার সাক্ষ্য বহন করেন।
তুলসীদাসের রচনায় যার শিখর, সেই হিন্দি ঐতিহ্যে রাম মর্যাদা পুরুষোত্তম—অটল, অবিচল, অনড়। অন্যদিকে বাংলা ঐতিহ্যে রামকে প্রায়ই দেখা যায় আরও কোমল, আরও মানবিক রূপে।
নিরালার রাম এই দুই ধারাকে একসূত্রে বাঁধেন। তাঁর মধ্যে মিশে যায় হিন্দি অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত অবিচল দৃঢ়তা এবং বাংলার অশ্রুসজল কোমলতা।
বাংলাও হিন্দি বলয়ের কাছ থেকে অনেক কিছু গ্রহণ করেছে; এই ঋণের ইতিহাসও সুপ্রাচীন। মৈথিলি কবি বিদ্যাপতির পদাবলি বাংলার বৈষ্ণব কবিদের ওপর এমন গভীর প্রভাব ফেলেছিল যে সেখানে জন্ম নিয়েছিল ‘ব্রজবুলি’ নামে এক কাব্যভাষা, যাতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রচিত হয়েছে পদ।
তরুণ রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ লিখেছিলেন এই ভাষাতেই। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তিসাধনার কেন্দ্র ছিল বৃন্দাবন—ব্রজভূমি। কবীরের কণ্ঠস্বর পৌঁছে গিয়েছিল বাংলায়, শিকড় গেড়েছিল এখানকার সাধক ও বাউলদের চেতনায়। অন্যদিকে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম্’ উত্তর ভারতে পৌঁছে হিন্দিভাষী অঞ্চলের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম রণধ্বনিতে পরিণত হয়েছিল।
এই পারস্পরিক সম্পর্ক উৎসবের মধ্যেও দৃশ্যমান। উত্তর ভারতে বিজয়াদশমী উদ্যাপিত হয় রাবণের বিরুদ্ধে রামের বিজয় হিসেবে; বাংলায় প্রায় একই সময়ে তা চিহ্নিত করে দেবীর আরাধনা ও বিদায়ের পর্ব। দুটি অঞ্চল, দুটি স্মৃতি—কিন্তু তারিখ একই।
নিরালার কবিতা এই দুই ধারাকে একসূত্রে বেঁধেছে, কারণ এখানে রাম নিজেই দেবীর পূজা করেন। হিন্দি অঞ্চলের রাম এবং বাংলার দুর্গা—যাঁরা এত দিন আলাদা উৎসবের কেন্দ্রে ছিলেন—এবার একই মঞ্চে মুখোমুখি দাঁড়ান।
যাত্রার শুরু অমাবস্যায়, আর সমাপ্তি অকালবোধনে। এই দুই প্রান্তের মাঝখানে উন্মোচিত হয় কবিতার সমগ্র গতিপথ—পরাজয় থেকে জাগরণে, সংশয় থেকে সংকল্পে। নিরালা কৃত্তিবাসের ‘অকাল’কে রূপান্তরিত করেন নিজের ‘কল্প’ নির্মাণের উপলক্ষে। কৃত্তিবাস ও কালিকাপুরাণের স্মৃতিবাহী অমাবস্যার ঘন অন্ধকারের ভেতর থেকে তিনি সৃষ্টি করেন এক নতুন আলো, যা পুরোপুরি বাংলা নয়, আবার পুরোপুরি হিন্দিও নয়। তা এক অভিন্ন কাব্যচেতনার কণ্ঠস্বর—যার উত্তরাধিকার দুই ভাষারই।
ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্যের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে এই বহুভাষিক অন্তঃস্রোতেই।
মতামত দিন