শাহীন খন্দকার
হামের পাশাপাশি শিশুরা অ্যাডিনোতে আক্রান্ত হচ্ছে: ডা. মুয়াজ
দেশে গত ১৫ মার্চ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত সরকারি হিসেবে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৪৫৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৭৫ শিশু এবং হামের উপসর্গে ৩৮৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এসব শিশুর মধ্যে ৮২ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক ভাইরাল সংক্রমণগুলোর মধ্যে একটি, ফলে বাংলাদেশে টিকার অভাবে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই রোগ। এর মধ্যেই আরেকটি ভয়ের বার্তা দিলেন চিকিৎসকরা। বাংলাদেশে হামের পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়ছে অ্যাডিনো ভাইরাস। এটি করোনার মতোই একটি ‘রেসপিরেটরি ভাইরাস’, অর্থাৎ যা শ্বাসযন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়। এর উপসর্গগুলোও অনেকটা কোভিডের মতোই এবং এটিও অত্যন্ত ছোঁয়াচে বা সংক্রামক।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ সফি আহমেদ মুয়াজ ভিউজ বাংলাদেশকে জানান, হামের পাশাপাশি শিশুরা, এমনকি বয়স্করাও এখন আক্রান্ত হচ্ছেন অ্যাডিনো ভাইরাসে।
তিনি বলেন, এর সংক্রমণে শিশুসহ বয়স্করাও দীর্ঘমেয়াদী সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাই এ সময়টাতে শিশু এবং বয়স্কদের করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা উচিত। এই সংক্রমণ নতুন না হলেও এ বছর তার প্রকোপ অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। সবচেয়ে চিন্তার কথা হলো, অ্যাডিনো ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন চার থেকে ছয়-সাত বছর বয়সী (প্রাক-স্কুল পর্যায়ের) শিশুরা, যাদের সার্বিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনিতেই কম।
চিকিৎসকরা বলছেন, এই ভাইরাসের মোকাবিলার ক্ষেত্রে একটি উদ্বেগের বিষয় হলো, বাজারে অ্যাডিনো ভাইরাসের প্রতিরোধের জন্য কোনো টিকা নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু উপসর্গ দেখে এই ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়।
শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা: সর্দি, নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি, কাশি, গলা ব্যথা এবং জ্বর।
চোখের সমস্যা: চোখ লাল হয়ে যাওয়া, চুলকানি বা পিছুলা পড়া (কনজাংটিভাইটিস বা পিঙ্ক আই)।
পেটের সমস্যা: শিশুদের ক্ষেত্রে জলযুক্ত ডায়রিয়া, বমি এবং পেট ব্যথা দেখা দিতে পারে।
এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে প্রাথমেই অ্যান্টিজেন্ট টেস্ট বা পিসিআর (PCR) পরীক্ষার মাধ্যমে সাধারণত এই ভাইরাস শনাক্ত করা হয়।
ড. মুয়াজ বলেন, ভাইরাস শনাক্ত হলেও কোভিডের মতো অ্যাডিনো ভাইরাসেরও নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। এ ক্ষেত্রে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধগুলো কাজ করে না। তাই সাপোর্টিভ চিকিৎসা করতে হয়। অর্থাৎ ভাইরাসের সংক্রমণে জ্বর এলে জ্বরের চিকিৎসা, গা-হাত-পা ব্যথা হলে তার চিকিৎসা ইত্যাদি। অধিক শ্বাসকষ্ট হলে অক্সিজেন এবং নেবুলাইজার দিতে হবে। এআরডিএস’র ক্ষেত্রে ভেন্টিলেশন ছাড়া উপায় নেই।
তিনি বলেন, হামের রোগীদের যখন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় তখন শিশুরা নিউমোনিয়া বা অ্যাডিনোর মতো রোগে আক্রান্ত হয়। এসব বাচ্চাদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এবং তাদের বাঁচানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
শিশুরা যেন এই সংক্রমণে দুর্বল না হয়ে পড়ে সেজন্য শরীরের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়াতে সারা বছর ধরে পুষ্টিকর সুষম খাবার, যেমন তাজা শাক-সবজি, মওসুমি ফল ইত্যাদি খেতে হবে বলে তিনি পরামর্শ দেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, যেসব শিশুর শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আগে থেকেই কম, তারা হামের পর অ্যাডিনো ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এই ভাইরাসের কারণে ফুসফুসের সংক্রমণ এতটাই জটিল হচ্ছে যে উচ্চমাত্রার ওষুধেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
বর্তমানে এই রোগের কোনো টিকা না থাকায় আক্রান্ত শিশুকে আইসোলেশনে বা অন্যদের থেকে আলাদা রাখাকেই উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে