আলীমের বুকে ছিল অনেক গুলির চিহ্ন
রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে আমি কখনো যাইনি। যাওয়ার এবং দেখার ইচ্ছে হয়েছে অনেকবার; কিন্তু যেতে পারিনি। ওখানে হাঁটার কথা ভাবলে আপনা থেকেই পা দুটি আড়ষ্ট হয়ে আসে। হিম হয়ে আসতে থাকে শরীর। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ। মনে হয়, কী করে হাঁটব সেই পথ ধরে, যার ওপর দিয়ে সারি বেঁধে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল তারা! শুনেছি, মিরপুরের ফিজিক্যাল ইনস্টিটিউটে তাদের চোখ বেঁধে, হাত বেঁধে অন্ধকার কুঠুরিতে ফেলে রাখা হয়েছিল। তারপর কাকডাকা ভোরে লাইন করে দাঁড় করিয়ে গুলি আর বেয়নেট চার্জ করে ক্ষতবিক্ষত করে ইটের ভাটায় ফেলে দেয়া হয়েছিল।
ইটখোলায় ছিল লাশের স্তূপ। অনেক আগে ঘাতকরা যাদের মেরেছিল, তাদের লাশ চেনা যায়নি। উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি কিন্তু ১৫ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের ভেতরে যাদের মারা হয়েছিল, তাদের লাশ শনাক্ত করা গেছে। ইটখোলার আশপাশে যারা থাকতেন, তারা গুলির আওয়াজ শুনতেন ভোরের দিকে। সেই সঙ্গে চিৎকার। গোঙানির আওয়াজও শোনা যেত। রায়েরবাজার বিলের বধ্যভূমি থেকে পালিয়ে আসা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন ওই বধ্যভূমির বর্ণনা দিয়েছেন। আলবদর বাহিনী আর সবার মতো তাকেও ধরে নিয়ে গিয়েছিল ১৪ ডিসেম্বরের সকালবেলা ঢাকার শান্তিবাগ এলাকা থেকে। হাত ও চোখ বেঁধে নেয়া হয়েছিল বদর বাহিনীর ক্যাম্পে।
তিনি লিখেছেন, ‘এরপর বদর বাহিনী আমাদের বাসে করে নিয়ে চলল। কৌশলে চোখের বাঁধন আল্গা রাখার সুযোগ হলো বলে দেখতে পেলাম সামনে বিরাট এক বটগাছ। তার সম্মুখে একটা বিরাট বিল। মাঝে মাঝে কোথাও পুকুরের মতো রয়েছে। বটগাছের আরও কাছে গিয়ে দেখতে পেলাম ১৩০ থেকে ১৪০ জন লোককে বসিয়ে রাখা হয়েছে। জল্লাদের দল বেয়নেট দিয়ে হত্যালীলা শুরু করে দিয়েছে। ছুঁড়ছে গুলি। চারদিকে আর্ত চিৎকার। আমি চোখের বাঁধনের কাপড়টি সরিয়ে ফেলে খুব জোরে দৌড় দিলাম (সূত্র: দৈনিক বাংলা, ২১ ডিসেম্বর, ১৯৭২)।’
সেদিন অবিশ্বাস্যভাবে বাঁচতে পেরেছিলেন দেলোয়ার হোসেন; কিন্তু অন্যেরা পারেননি। তারা লাশ হয়ে গেছেন। সেই লাশের স্তূপে আমার স্বামী শহীদ বুদ্ধিজীবী আলীম চৌধুরী উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। হাত দুটি দড়ি দিয়ে শক্ত করে শরীরের পেছনে বাঁধা। যে গামছা দিয়ে চোখ বাঁধা হয়েছিল, সেটা গলায় এসে ঠেকেছে। পরনে ছিল লুঙ্গি, গেঞ্জি আর শার্ট। যখন আমার সম্মুখ থেকে ঘাতকরা ওকে নিয়ে যায়, তখন ওর ঘড়িটা হাতে ছিল। পায়ে ছিল স্যান্ডেল। মারবার আগে ওরা ঘড়িটা খুলে নিয়েছিল। আলবদরের নির্মম ধর্মোন্মাদ ঘাতকরা ফিজিক্যাল ইনস্টিটিউটে সারারাত ধরে ওদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে নিশ্চয়ই। ডিসেম্বরের প্রচণ্ড ঠান্ডায় গায়ে ওদের কোনোরকম গরম কাপড় ছিল না। দেশের বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, অধ্যাপক, চিকিৎসক, সমাজপতি, এমনি আরও অনেক বুদ্ধিজীবীকে কি ভয়ানক ফ্যাসিবাদী কায়দায় সেদিন অত্যাচার করে মারা হয়েছিল, সেই সব লাশ যারা দেখেছে, সেকথা তারাই শুধু জানেন।
আলীমের বুকে ছিল অনেক গুলির চিহ্ন। কপালের বাঁ-দিকে এবং তলপেটে ছিল বেয়নেটের গভীর ক্ষত। আলীমের পাশেই ছিল ডা. ফজলে রাব্বির লাশ। সে লাশেরও ছিল একই রকম হাল। সবাইকে ক্ষত-বিক্ষত করেই মারা হয়েছে। ১৫ ডিসেম্বরের বিকেল সাড়ে ৪টায় আলীমকে ওরা নিয়ে গিয়েছিল। ডা. রাব্বিকেও নেয়া হয়েছিল ওই একই দিন বিকেল সাড়ে ৪টায়। সারারাত নির্যাতনের পর ১৬ ডিসেম্বর ভোররাতে তাদের মারা হয়েছে। চিরকালের মতো নিভিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের প্রাণের প্রদীপ। ১৮ ডিসেম্বর সকালে আমরা উদ্ধার করি তাদের লাশ। ওর শরীরটা একটু ফোলা ছিল, তখনো পচন ধরেনি। গায়ের কাপড়গুলো খুলতে হয়েছিল কেটে। এই মর্মান্তিক অসহনীয় মৃত্যুদৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে আমার সমস্ত চেতনা লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
১৫ ডিসেম্বর আলবদরদের বন্দুকের সামনে ‘হ্যান্ডস আপ’ করা অবস্থায় হেঁটে একটা কাদালেপা ছোট মাইক্রোবাসে উঠে গিয়েছিল যে মানুষটি, তিন দিন পর ১৮ ডিসেম্বরে সে-ই ক্ষতবিক্ষত একটা লাশ হয়ে ফিরে এলো। ঘটনার এই আকস্মিকতা ধারণ করবার মতো ক্ষমতা আমার ছিল না। তখন কি যে আমার হয়েছিল, কিছুই আর মনে নেই। কখন আলীমকে গোসল করিয়ে সাদা কাফনে ঢেকে আজিমপুর গোরস্তানের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সে কথা আর বলতে পারব না। কেবল আবছা মনে পড়ে, যেন অনেক মানুষের কাঁধে ধবধবে কাফনে মোড়ানো একটি লাশ ধীরে ধীরে দৃষ্টির আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। জলজ্যান্ত একজন মানুষ চোখের পলকে এমন করে হারিয়ে যেতে পারে, আমাকে স্থবির করে দিয়েছিল এই ভাবনার আলোড়ন।
মার্চ মাসের উত্তপ্ত দিনগুলোতে সবাই আমরা অস্থির ছিলাম; কিন্তু আলীমের চলাফেরা, মতিগতি, কাজকর্মের ধরন-ধারণ আমাকে অসম্ভব ভাবনায় ভাবিয়ে রাখতো। প্রায় সর্বক্ষণই, বলতে গেলে, অস্বস্তির মধ্যে থাকতাম। আমার ভাবসাব দেখে ও মাঝে মাঝেই বলতো, তোমার এত ভয় পেলেতো চলবে না। মৃত্যু থাকলে ঘরে বসেও আমি মরতে পারি। মৃত্যু না থাকলে বাইরে সারাক্ষণ থাকলেও আমার কিচ্ছু হবে না। তুমি আরেকটু সাহসী হও। আমাকে কাজ করতে দাও। এ রকমভাবেই ও আমাকে আশ্বাস দিতো। মনের ভেতরকার শঙ্কা দূর করবার চেষ্টা করত। ২৫ মার্চ বিকেলে রোজকার মতোই ও চেম্বারে গেল। কিছুক্ষণ পর সুধীনদা (গায়ক সুধীন দাশ) এলেন আমাকে গান শেখাতে; কিন্তু গান করা সেদিন আর হলো না। সুধীনদা বললেন, শহরের অবস্থা ভালো মনে হচ্ছে না। আজ চলে যাই। আপনি আলীম সাহেবকে বলুন তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসতে। আজকে রোগী দেখতে গেলে বাসায় ফিরতে দেরি হতে পারে তার। ভয়ংকর একটা কিছু ঘটবে বা ঘটতে যাচ্ছে, আমরা সবাই সেটা আঁচ করতে পারছিলাম। রাতের অন্ধকারে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকা ছেড়ে চলে গেছেন।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গত কয়েকদিনকার সব আলাপ-আলোচনা কোনোরকম ফলাফল ছাড়াই ব্যর্থ, এ ঘটনাকে তো আর হালকা করে দেখবার উপায় নেই। মনে তাই নানারকম শঙ্কার উঁকিঝুঁকি। ১৬ মার্চেই শুরু হয়েছিল মুজিব-ইয়াহিয়ার বৈঠক। ১৮, ১৯, ২০, ২১ ও ২২ মার্চেও অব্যাহত থাকে সেই আলোচনা। আর এতে করে একটা রাজনৈতিক মীমাংসার আশা আমাদের সবার মনেই স্বাভাবিকভাবে জেগে ওঠে। খবরের কাগজগুলোতে এরকম আগাম আভাস দেয়া হয়েছিল যে, ২৩ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া বেতার ভাষণ দেবেন। আর সেই বেতার ভাষণে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ঘোষণা করবেন। সেই সময় দেশের বহু জায়গায় সেনাবাহিনী আর জনসাধারণের সংঘর্ষ চলছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা করে বলেছিলেন, এ আলোচনা বৈঠকের অর্থ কি? শহীদের রক্তের সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না।
বাংলাদেশের পতাকা ওড়াই প্রত্যেক ঘরে ঘরে; কিন্তু ২৫ মার্চ সকালেই আমরা খবর পেলাম, পত্রিকার মারফতই, সেনাবাহিনী দেশের বিভিন্ন জায়গায় আরও প্রায় শ দেড়েক মানুষকে মেরেছে। চট্টগ্রাম বন্দরে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনা অস্ত্র জাহাজ থেকে খালাস করার সময় গণ্ডগোল হয়েছে। শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়েছে সেখানে। ফলে কারো পক্ষে এটা আর বুঝতে অসুবিধে হলো না যে, রাজনৈতিক মীমাংসার নাম করে কালক্ষেপণ করা হয়েছে। আর বাঙালিদের দমন করার জন্য তলে তলে নেয়া হচ্ছে সামরিক প্রস্তুতি। দেশব্যাপী চলছে তাই প্রতিরোধের সংগ্রাম। ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় বেরিকেড দেয়া শুরু হয়ে গেছে। ছাত্র-যুবকদের সবাই নেমে গেছে রাজপথে। বড় বড় গাছ কেটে, ওয়াসার পাইপ ফেলে, যেখানে যেভাবে সম্ভব আর্মির গাড়ি ঠেকাবার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
দ্রুত ফোন করলাম আলীমকে। আমি তাকে সমস্ত শঙ্কার কথা বলতেই ও বলল, চলে আসছি এক্ষুণি। আমি হাল-হকিকত যতটুকু বুঝতে পারছি, বলতে চাইলাম। ও বললো, সব জানি। আমাকে ভাবনামুক্ত রাখবার জন্য সেদিনকার অনেক কথাই ও গোপন রেখেছিল। পরে সেটা জানতে পেরেছি ওর কাছ থেকেই। সেদিন চেম্বারে বসে ও খুবই উদ্বিগ্ন মনে রোগী দেখছিল। দেখছিল আর সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে সাবধান করে দিচ্ছিল আসন্ন বিপদ সম্পর্কে। দূরের রোগীদের অনেককে নিজের গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। শুধু পৌঁছেই দেয়নি, অনেককে পরামর্শ দিয়েছিল বাড়ি থেকে সরে থাকবারও। এসব করে সেদিন ও বাসায় ফিরেছিল রাত সাড়ে ১১টার দিকে।
সেই রাতেই সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব (স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান) আমাদের বাসায় এলেন। তিনি আলীমের বড় বোনের ননদের স্বামী। ঢাকা এলেই মগবাজারে আপার বাসায় থাকতেন। ওখান থেকেই আওয়ামী লীগের সভায় যেতেন। কাজকর্ম করতেন পার্টির। যতদিন নজরুল ইসলাম সাহেব ঢাকায় থাকতেন, আলীম আর ওর ছোট ভাই হাফিজ তার সঙ্গে নানা আলোচনায় থাকত মেতে। তিনি এদের দুজনকে খুবই ভালোবাসতেন। মগবাজার থেকে ভাগ্নে আদিল আর তৈয়ব ওকে আমাদের বাসায় নিয়ে এলো। তিনতলায় বাবা-মা থাকতেন। তাড়াতাড়ি করে অসুস্থ বাবাকে দোতলায় নামিয়ে আনলাম। নজরুল সাহেবকে ওখানে থাকবার ব্যবস্থা করে দিলাম। সমস্ত বাড়ির মধ্যে ওই ঘরটিই ছিল সবচেয়ে নিরিবিলি।
বড্ড শখ করে ওড়ানো বাংলাদেশের পতাকা আমাদের তিনতলার ছাদে লম্বা বাঁশের মাথায় তখনো উড়ছিল। বড় কষ্টে সেটিকে নামিয়ে আনলাম। সৈয়দ নজরুল এমনিতেই কম কথা বলতেন। সেদিন দেখলাম, তিনি আরও চুপ হয়ে গেছেন। ওকে অস্বাভাবিক রকম চিন্তিত দেখাচ্ছিল। মগবাজার থেকে পুরানা পল্টনের তিনতলায় ওকে নিয়ে আসা হলো; কিন্তু ওর অবস্থার কোনোরকম হেরফের নেই। তিনি যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তবুও সবাই ওকে নিয়ে খেতে বসলাম। কেমন একটা আচ্ছন্ন অবস্থায় কি যে খেলেন তার কিছুই যেন ওর বোধে জাগলো না। এক সময় দেখলাম, 'বোন প্লেটে' রাখা কাঁটাগুলো তুলে নিয়ে তিনি নিজের প্লেটে রাখছেন। দ্রুত সামনে থেকে সবকিছু সরিয়ে নিলাম। আলীম ওকে ধরে নিয়ে তিনতলায় রেখে এলো। রাত ১২টার পর হঠাৎ করেই গোলাগুলির প্রচণ্ড শব্দে চারদিক কেঁপে উঠল। বুঝতে অসুবিধে হলো না, মর্টার, ট্যাঙ্ক, মেশিনগান, কামান সবকিছু নিয়ে পাকিস্তানি আর্মি আক্রমণ করেছে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। আকস্মিক নির্মমতা আর নির্লজ্জ এক অধ্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুঃখে-হতাশায় আমরা মুহূর্তেই নির্বাক হয়ে গেলাম।
মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা ব্যর্থ হলে তার পরিণতি যে শুভ হবে না, সেটা আমরা অনুমান করতে পেরেছিলাম; কিন্তু সেই পরিণতি যে এত ভয়ংকর, এত ভয়াবহ আর মারাত্মক হবে, সে ছিল আমাদের বোধের সম্পূর্ণ বাইরে। এমন নির্বিচার গণহত্যা যে হতে পারে, আমাদের ধারণায় তা ঘূণাক্ষরেও আসেনি। এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখে সৈয়দ নজরুলকে লুকিয়ে রাখাই এখন আমাদের বড় কাজ হয়ে দাঁড়াল। পাকিস্তানি সৈন্যরা ওকে যে মেরে ফেলবে অথবা ধরে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার চালাবে, সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিন্ত ছিলাম। আমাদের বাসায়ও যদি ওকে রক্ষা করতে না পারি, তাহলে ভয়ানক কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে একটা। তাই ওর তিনতলার সব দরজা-জানালা বন্ধ করে, আলো-টালো নিভিয়ে আলীম দোতলায় শোয়ার ঘরে এলো; কিন্তু ওর চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ এতখানি গভীর ছিল যে, অসম্ভব অস্থির দেখাচ্ছিল ওকে। আর সেটা ও লুকিয়েও রাখতে পারছিল না। কিছুক্ষণ পরপরই সৈয়দ নজরুলকে ও দেখতে যাচ্ছিল। আর প্রতিবারই গিয়ে দেখছিল, ছাদে পায়চারি করছেন তিনি আর টেনে চলেছেন সিগারেট। সে সময় ছাদে বেড়ানো ছিল খুবই বিপজ্জনক। যে কোনো দিক থেকেই গুলি এসে লাগতে পারত; কিন্তু নজরুল ইসলাম সাহেবের সেসব ব্যাপারে বিন্দুমাত্র খেয়াল ছিল বলে মনে হয় না। তিনি তখন এক উদ্ভ্রান্ত মানুষ যেন।
২৫ মার্চের সেই ভয়াল-ভয়ংকর রাত কোনোকালে শেষ হবে বলে অন্তত সেদিন মনে হয়নি। জানালা দিয়ে তাকিয়ে আলীম আর আমি দেখছিলাম হিংস্রতার এক নগ্ন চেহারা। প্রচণ্ড শব্দের সঙ্গে সঙ্গে ছোট-বড় আগুনের গোলা। কোনোটা কোনোটা আবার নীল রং ধারণ করে নেমে আসছে মাটিতে। মানুষের আর্তচিৎকারে বোঝা যাচ্ছিল, ধারে-কাছে কোনোখানেই এইসব গোলা এসে পড়ছে। এভাবেই রাত হলো ভোর; কিন্তু গোলাগুলির শব্দের একটুখানি বিরাম নেই। যেন অন্তহীন তার অভিযান। ঘরে বসে থেকেও আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যরা নির্মম আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আমাদের ওপর। তারপরের ইতিহাস আমাদের সবারই জানা।
লেখক: শহীদ জায়া ও শিক্ষাবিদ

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে