Views Bangladesh Logo

এআই বিনিয়োগে ৩ শতাংশে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি, শ্রমবাজারে ‘সুনামি’র সতর্কতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে। এশিয়ার অর্থনীতিগুলোও এই বিনিয়োগ থেকে সুফল পাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, করব্যবস্থা ও শিক্ষাক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এই পরিবর্তনকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসা ‘সুনামি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।


থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সপ্তাহব্যাপী বার্ষিক বৈঠকের প্রথম দিনে কয়েক শ অংশগ্রহণকারীর সামনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, এআইকে পছন্দ করুন বা অপছন্দ—প্রযুক্তিটি ইতিমধ্যে আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। এবারের বৈঠকে আইএমএফের ১৯১টি সদস্যদেশের অর্থ খাতের কর্মকর্তাসহ প্রায় ১৮ হাজার মানুষের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।


গত জুলাইয়ে আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হবে ৩ শতাংশ। মঙ্গলবার সংস্থাটি তাদের পূর্বাভাস হালনাগাদ করবে। তবে এবারের বৈঠকে কয়েকটি দেশের অর্থমন্ত্রী অংশ নিচ্ছেন না। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ও স্পেনের অর্থমন্ত্রী আর্কাদি এস্পানিয়া। তাঁরা নিজ নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারমূলক কাজে মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।


সোমবারের বৈঠকে জর্জিয়েভা বলেন, এআই খাতে বিনিয়োগ অর্থনীতিতে চাহিদা ও বিনিয়োগ—দুটিই বাড়াচ্ছে। এর ফলে এশিয়ার উন্নত অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে। এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে প্রবৃদ্ধি বাড়ার সম্ভাবনা শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট। তবে জ্বালানি সরবরাহে সংকট বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলেও সতর্ক করেন তিনি।


এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে জর্জিয়েভা বলেন, আইএমএফের গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরির ধরন বা কাজের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। কিছু চাকরির মান কমে যেতে পারে, আবার কিছু চাকরি পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। উন্নত অর্থনীতিগুলোতে প্রায় ৬০ শতাংশ চাকরি এআইয়ের প্রভাবে পরিবর্তিত হতে পারে।


কেবল শ্রমবাজার নয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থা এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতিতেও এআইয়ের প্রভাব পড়তে পারে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমের তুলনায় পুঁজির গুরুত্ব বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ মানুষের শ্রমের বদলে প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে।


প্রাথমিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ চাকরিতে এআই-সম্পর্কিত দক্ষতার প্রয়োজন হচ্ছে। একই সঙ্গে নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের সুযোগ কমছে। অন্যদিকে নির্মাণশিল্প ও তথ্যকেন্দ্রের মতো খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে। তবে এসব খাতের অনেক চাকরিতে তুলনামূলক কম বেতন দেওয়া হয়।


জর্জিয়েভা বলেন, এআই এমন একটি প্রযুক্তি, যা সবকিছু বদলে দিচ্ছে—মানুষের কাজ করার ধরন থেকে শুরু করে জীবনযাপন পর্যন্ত। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, তাঁর এআই সহকারী এখন প্রতিদিনের কর্মসূচি সম্পর্কে ৩০ সেকেন্ডের একটি বার্তা দেয়।


এআই প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক দেশ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তবে এআই অবকাঠামো তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী অনেক প্রতিষ্ঠান এশিয়ায় অবস্থিত। এবারের বার্ষিক বৈঠকের আয়োজক দেশ থাইল্যান্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি এ কথা বলেন।


এআইয়ের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নমও। একই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতক হওয়া শিক্ষার্থীদের চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ার বিষয়টি সরকারগুলোর গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তাঁর মতে, কর্মজীবনে প্রবেশের প্রথম ধাপ—স্নাতক শেষ করে প্রথম চাকরি পাওয়া—এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। আগের তুলনায় এ ক্ষেত্রে সুযোগ কমে আসছে।


থারমানের আশঙ্কা, এআইয়ের কারণে উন্নত ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির মধ্যে প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যবধান আরও বাড়তে পারে। এ বিষয়ে সরকারগুলোকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এআই নিয়ে নিষ্ক্রিয় থাকলে এই ব্যবধান আরও বাড়বে। বরং প্রযুক্তিটির ব্যবহার করে নতুন ও উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে, বিশেষ করে যেসব কাজে মানুষ নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারে।


অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআই ভিন্ন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেন, এআইয়ের কারণে বড় ধরনের পরিবর্তন উন্নত অর্থনীতিগুলোতেই বেশি ঘটবে। কারণ, বড় আকারের এআই মডেল তৈরির কাজ মূলত এসব দেশেই হচ্ছে। উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে একই ধরনের বৃহৎ মডেল তৈরির কাজ তুলনামূলক কম হচ্ছে।


বাঙ্গা জানান, বড় আকারের এআই মডেল তৈরির পরিবর্তে ছোট আকারের এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এসব প্রযুক্তি পরিচালনায় বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না। ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তুলনামূলক সহজে এগুলো কাজে লাগানো সম্ভব। কৃষক, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে বিশ্বব্যাংকের।


সব মিলিয়ে, এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সহায়তা করলেও এর সুফল কতটা সমানভাবে বণ্টিত হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একদিকে প্রযুক্তিটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে চাকরির ধরন বদলে যাওয়া এবং কর্মজীবনে প্রবেশ করতে যাওয়া তরুণদের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিচ্ছে। তাই এআইয়ের সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিষয়েও সরকারগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ