Views Bangladesh Logo

এআইয়ের হাতে ভ্রমণ পরিকল্পনা: কতটা ভরসা করবেন, কতটা যাচাই করবেন

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

রাত ১টা। মাহিনের ফোনে তিনটা ব্রাউজার ট্যাব খোলা, দুইটা ট্রাভেল গ্রুপ, আর বন্ধুদের মেসেঞ্জার গ্রুপে ৮৭টা না-পড়া মেসেজ। আলোচনার বিষয় একটাই, সামনের ছুটিতে কোথায় যাওয়া যায়। একজন বলছে সাজেক, একজন শ্রীমঙ্গল, আরেকজন সন্ধ্যা থেকে একটানা বলে যাচ্ছে ‘সেন্ট মার্টিন ছাড়া কিছু না’, যদিও এখন সেখানে আদৌ যাওয়া যায় কি না, সেটা সে নিজেও জানে না। তিন ঘণ্টা তর্কের পর সিদ্ধান্ত হয়েছে ‘শূন্য’।

বিরক্ত হয়ে মাহিন খুলল একটা এআই চ্যাটবট। টাইপ করল, ‘চারজন বন্ধু, তিন দিন, মাথাপিছু দশ হাজার টাকা। পাহাড় চাই, ভিড় চাই না, আর একজন বাসে বমি করে।’ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে স্ক্রিনে হাজির দিনভিত্তিক পরিকল্পনা। কোন দিন কোথায় থাকা, কী খাওয়া, কখন বের হওয়া, খরচের আনুমানিক হিসাব, এমনকি বমির সমস্যাওয়ালা বন্ধুকে বাসের সামনের দিকের সিটে বসানোর পরামর্শও। মাহিন স্ক্রিনশট দিল গ্রুপে। কিছুক্ষণ সব চুপ। তারপর একজন লিখল, ‘মামা, তুই কবে থেকে ট্রাভেল এজেন্সি খুললি?’

এই দৃশ্য এখন আর মাহিনের একার না। ঢাকার অনেক ঘরেই ঘোরার পরিকল্পনা শুরু হচ্ছে চ্যাটবটের সঙ্গে আলাপ দিয়ে। আর কাকতালীয়ভাবে, আজ ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্যও ঠিক এটাই, ‘ডিজিটাল অ্যাজেন্ডা অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স টু রিডিজাইন ট্যুরিজম’। অর্থাৎ ডিজিটাল প্রযুক্তি আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে ভ্রমণকে নতুন করে সাজাচ্ছে। জাতিসংঘের পর্যটন সংস্থা ১৯৮০ সাল থেকে দিনটি পালন করে আসছে, এবার মূল আয়োজন হচ্ছে মধ্য আমেরিকার দেশ এল সালভাদরে।

মাহিনদের গল্পেই ফেরা যাক। পরিকল্পনা মেনে চার বন্ধু রওনা দিল পাহাড়ের দিকে। প্রথম দিন সব ঠিকঠাক। চ্যাটবটের বানানো প্যাকিং লিস্টে এমন কিছু জিনিস ছিল যা চারজনের কারও মাথায় আসেনি। পাওয়ার ব্যাংক, খাবার স্যালাইন, বাড়তি এক জোড়া মোজা আর ছোট একটা টর্চ। রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর সেই টর্চটাই হয়ে গেল দলের সবচেয়ে জনপ্রিয় সদস্য।

গোলমাল বাধল দ্বিতীয় দিনে। চ্যাটবট খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে একটা রিসোর্টের নাম বলেছিল, ‘পাহাড়ের কোলে দারুণ ভিউ’। গিয়ে দেখা গেল রিসোর্ট আছে ঠিকই, কিন্তু নাম বদলেছে, মালিক বদলেছে, আর ভাড়া বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। যে ঝরনায় যাওয়ার জন্য সকাল সকাল বের হওয়ার কথা, স্থানীয় এক চা-দোকানি হাসতে হাসতে জানালেন, ওটা আসলে পাশের উপজেলায়, আর এখান থেকে যেতে লাগবে সারা দিন। মাহিন চ্যাটবটকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি তো বললা কাছেই?’ উত্তর এল বিনয়ী ক্ষমাপ্রার্থনা, সঙ্গে নতুন আরেকটা পরামর্শ। সেটাও ভুল।

এখানেই এআই দিয়ে ভ্রমণ পরিকল্পনার আসল চেহারাটা বোঝা যায়। কাঠামো বানাতে এটা দুর্দান্ত। কয় দিনে কী কী দেখা সম্ভব, বাজেট কোন খাতে কত রাখা উচিত, কী নিয়ে যেতে হবে, বিদেশে গেলে ভিসার কাগজের তালিকা কী, অচেনা ভাষায় দুই-চারটা দরকারি বাক্য কীভাবে বলতে হয়, এসব কাজে সে সময় বাঁচায় অনেক। কিন্তু যেসব তথ্য প্রতিদিন বদলায়, যেমন বাসের সময়সূচি, হোটেলের ভাড়া, রাস্তার অবস্থা, কোন জায়গা এখন খোলা আর কোনটা বন্ধ, কোথায় যেতে আগে থেকে অনুমতি লাগে, সেসব বিষয়ে চ্যাটবট অনেক সময় পুরোনো বা আন্দাজের তথ্য দেয়। আর সমস্যা হলো, ভুল তথ্যটাও সে দেয় একই রকম আত্মবিশ্বাসী গলায়। শুনলে মনে হয়, সদ্য ঘুরে এসে বলছে।

আরেকটা ব্যাপার অনেকের চোখ এড়িয়ে যায়। টেকসই পর্যটন নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল সাসটেইনেবল ট্যুরিজম কাউন্সিল এবারের পর্যটন দিবস উপলক্ষে সতর্ক করেছে, এআই এখন প্রতিদিন ঠিক করে দিচ্ছে একজন পর্যটক কোন কোন গন্তব্যের নাম দেখবেন। এআইয়ের উত্তর ধীরে ধীরে বিজ্ঞাপনের জায়গা হয়ে উঠছে, আর দৃশ্যমানতা যদি টাকা দিয়ে কেনা যায়, তাহলে বড় ব্র্যান্ডগুলোই সামনে থাকবে। সহজ করে বললে, পাহাড়ি গ্রামের যে পরিবারটা দুই রুমের হোমস্টে চালায়, যাদের রান্না খেয়ে আপনি বছরের পর বছর গল্প করবেন, তারা হয়তো চ্যাটবটের তালিকায় কোনোদিন আসবেই না।

তাহলে কি চ্যাটবট বাদ? মোটেও না। শুধু কাজটা ভাগ করে নিতে হবে। প্রশ্ন যত নির্দিষ্ট হবে, উত্তর তত কাজের হবে। ‘কোথায় ঘুরতে যাব’ না লিখে লিখুন কজন যাচ্ছেন, কত দিন, বাজেট কত, কী পছন্দ আর কী একদম অপছন্দ, দলে বয়স্ক বা শিশু আছে কি না। পরিকল্পনা পাওয়ার পর চ্যাটবটকেই জিজ্ঞেস করুন, ‘এর মধ্যে কোন কোন তথ্য যাওয়ার আগে যাচাই করে নেওয়া দরকার?’ দেখবেন, নিজের দুর্বলতার তালিকা সে নিজেই বেশ ভালো বানিয়ে দেয়। তারপর সেই তালিকা ধরে ফোন করুন হোটেলে, খোঁজ নিন বাস কাউন্টারে, চোখ রাখুন সরকারি ঘোষণায়, আর ভ্রমণ গ্রুপে সাম্প্রতিক ঘুরে আসা মানুষদের অভিজ্ঞতা পড়ুন। হোটেলের রিভিউ পড়ার সময় একটু সন্দেহপ্রবণ থাকাও ভালো। একই ভাষায় লেখা দশটা পাঁচ তারকা রিভিউ দেখলে বুঝতে হবে, হয়তো সেগুলোও কোনো যন্ত্রেরই লেখা।

মাহিনদের ট্যুর শেষ পর্যন্ত খারাপ যায়নি। বরং উল্টো। ঝরনা মিস হওয়ার পর সেই চা-দোকানিই ওদের পাঠালেন কাছের একটা টিলায়, যার নাম কোনো ম্যাপে নেই, কোনো চ্যাটবটের তালিকায়ও নেই। বিকেলে সেখানে বসে চার বন্ধু দেখল মেঘ নামছে উপত্যকায়। ফেরার পথে বাসে বমির সমস্যাওয়ালা বন্ধুটা সামনের সিটে বসে দিব্যি ঘুমিয়ে গেল। অন্তত ওই একটা পরামর্শ চ্যাটবট ঠিকই দিয়েছিল।

যন্ত্র হয়তো পথের নকশা আঁকতে পারে। কিন্তু পথের গল্পগুলো এখনো মানুষের কাছেই থাকে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ