Views Bangladesh Logo

জন্মবার্ষিকীতে আলোচনা সভায় আবুল হাসনাতকে স্মরণ

প্রয়াত কবি, সাহিত্যিক ও সম্পাদক আবুল হাসনাতের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘নবীনের সাহিত্য: স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকালে রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে কালি ও কলম সাহিত্যপত্রিকার আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সভায় বক্তারা বলেন, আবুল হাসনাত শুধু একজন সম্পাদক ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যে নতুন প্রজন্মের লেখক গড়ে তোলার এক নিবেদিতপ্রাণ নির্মাতা। সাহিত্যপত্রের কাজ কেবল লেখা প্রকাশ নয়, বরং নতুন লেখকদের সাহিত্যবোধ, রুচি ও দায়বদ্ধতা গড়ে তোলাও সম্পাদকদের অন্যতম দায়িত্ব।

আলোচনা সভায় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, আবুল হাসনাত বাংলা সাহিত্যে এমন একটি সাহিত্য-রুচির ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, যা আজও অনুসরণীয়। একজন সম্পাদক হিসেবে তিনি কখনো শুধু লেখা নির্বাচন করেই দায়িত্ব শেষ করেননি; বরং লেখকের সম্ভাবনা অনুধাবন করে তাঁকে পরিণত করে তোলার জন্য সময়, শ্রম ও আন্তরিকতা ব্যয় করেছেন। নতুন লেখকদের প্রতি তাঁর যে মমত্ববোধ ছিল, সেটিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। বর্তমান সম্পাদকদেরও সেই দায়বদ্ধতা ধারণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ভালো সাহিত্য সৃষ্টি করতে হলে আগে গভীরভাবে পড়তে হবে, পাঠের কোনো বিকল্প নেই। নিয়মিত পাঠ থেকেই একজন লেখকের ভাষাবোধ, চিন্তার গভীরতা ও সৃজনশীলতা বিকশিত হয়। সাহিত্যে টিকে থাকতে চাইলে ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং আত্মসমালোচনার মানসিকতা অপরিহার্য।

দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য সম্পাদক ও কবি ওবায়েদ আকাশ বলেন, বর্তমান সময়ে সম্পাদকদের দায়িত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে। এখন বিপুলসংখ্যক লেখা জমা পড়ে। তাই প্রতিটি লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়া, লেখককে উত্তর দেওয়া, প্রয়োজনীয় মতামত জানানো এবং সম্ভাবনাময় লেখাকে পুনর্লিখনের পরামর্শ দেওয়া সম্পাদকীয় দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তিনি বলেন, অনেক নবীন লেখক পরামর্শ গ্রহণ করে নিজেদের লেখাকে আরও পরিণত করে তুলছেন। এই ধারাবাহিক সম্পাদনা ও পরিচর্যার মাধ্যমেই ভবিষ্যতের লেখক তৈরি হয়। সম্পাদক যদি শুধু প্রকাশক হয়ে যান, তবে সাহিত্য তার প্রকৃত বিকাশের সুযোগ হারাবে।

ডিজিটাল যুগ প্রসঙ্গে ওবায়েদ আকাশ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম লেখালেখিকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার প্রবণতা অনেক সময় গভীর সাহিত্যচর্চার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সাহিত্যে স্থায়ী অবদান রাখতে হলে ধীরস্থির চর্চার বিকল্প নেই।

ত্রৈমাসিক 'এবং বই' পত্রিকার সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ বলেন, বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর ব্যবহার লেখালেখির জগতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা কিংবা প্রাথমিক অনুসন্ধানে এআই সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সৃজনশীল সাহিত্য রচনায় এটি কখনোই একজন লেখকের বিকল্প হতে পারে না। লেখককে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিজের নৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে। কবিতা, গল্প বা উপন্যাস মানুষের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও কল্পনার শিল্প—এখানে প্রযুক্তি সহযোগী হতে পারে, স্রষ্টা নয়।

ভাষার পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলা ভাষা সবসময় নতুন শব্দ ও নতুন চলন গ্রহণ করেছে। ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষার শব্দের ব্যবহারও বর্তমান বাস্তবতার অংশ। তবে বাংলা শব্দভাণ্ডারের সমৃদ্ধি সম্পর্কে সচেতন থেকে এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, আবুল হাসনাতকে শুধু একজন সফল সম্পাদক হিসেবে দেখলে তাঁর অবদানকে সীমাবদ্ধ করা হবে। তিনি ছিলেন নীতিবান, দূরদর্শী এবং দেশপ্রেমে উজ্জীবিত একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। নতুন লেখকদের প্রতি তাঁর অগাধ আস্থা ও আন্তরিক পরিচর্যাই তাঁকে বাংলা সাহিত্যে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। কালি ও কলমের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে আবুল হাসনাত যে সাহিত্য-রুচির ভিত নির্মাণ করেছিলেন, বর্তমান সম্পাদকমণ্ডলী সেই পথ অনুসরণ করেই সাহিত্যচর্চার মান অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করছে।

আলোচনা সভা শেষে বক্তারা অভিমত ব্যক্ত করেন, বাস্তবতার নানা প্রতিকূলতায় নবীনদের স্বপ্ন কখনো ভেঙে যেতে পারে; কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাই একজন লেখককে আরও পরিণত করে তোলে। সম্পাদকদের আন্তরিক দিকনির্দেশনা এবং নবীনদের নিরবচ্ছিন্ন পাঠ ও সাধনার মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্য আগামী দিনের নতুন শক্তি ও সম্ভাবনা অর্জন করবে।


মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ