Views Bangladesh Logo

বিদ্বেষের প্রচার পেরিয়ে ইতিহাস: যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর আবদুল এল-সাইয়েদ

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে আবদুল এল-সাইয়েদের জয় শুধু একটি আসন দখলের ঘটনা নয়, দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এই জয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এই প্রার্থী। তবে নির্বাচনী প্রচারের পুরোটা সময় তাকে লড়তে হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচয়, আরব বংশোদ্ভূত পরিচয় এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের সঙ্গেও।

মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন এল-সাইয়েদ। আগামী ৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেওয়ার কথা তার। এর আগে গত আগস্টে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচনেও জয় পেয়েছিলেন তিনি। সেই নির্বাচনে তাকে ঠেকাতে ইসরায়েলপন্থি প্রভাবশালী লবি গ্রুপ আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি—এআইপ্যাক বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

পরিচয়কে ঘিরে আক্রমণ, প্রচারে বিদ্বেষ
এল-সাইয়েদের নির্বাচনী লড়াইয়ের অন্যতম দিক ছিল তার মুসলিম ও আরব পরিচয়কে রাজনৈতিক আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ রিপাবলিকান শিবিরের নেতারা প্রচারে তাকে নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করেন। তার নামের উচ্চারণ নিয়েও উপহাস করেন ট্রাম্প। এমনকি তাকে ‘জিহাদি’ ও ‘মুসলিম ব্রাদারহুডের’ সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রচার করা হয়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি।

আরব আমেরিকান ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মায়া বেরি আল জাজিরাকে বলেন, রিপাবলিকানরা আরব ও মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারকে এল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে প্রধান রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই কৌশল সফল হয়নি।

বেরির ভাষায়, ভোটারদের এই অন্ধ বিদ্বেষ প্রত্যাখ্যান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাঁর মতে, এই জয় শুধু এল-সাইয়েদের জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রে আরব ও মুসলিম পরিচয়ে বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এর মধ্য দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের প্রতি দেশটির মানুষের সমর্থনের একটি বার্তা পাওয়া যায়।

মিশিগানে বিপুলসংখ্যক আরব আমেরিকানের বসবাস। বিশেষ করে ডিয়ারবর্ন এলাকায় আরব বংশোদ্ভূত মানুষের বড় একটি সম্প্রদায় রয়েছে। নির্বাচনের সময় তাদের কাছে এল-সাইয়েদের জয় নাগরিক হিসেবে নিজেদের পরিচয়, অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে ওঠে।

ইয়েমেনি-আমেরিকান কমিউনিটির নেতা আলী বালিদ আলমাকলানি আল জাজিরাকে বলেন, ইসলামবিদ্বেষী প্রচার মুসলিম ও আরবদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে আরও বেশি উৎসাহিত করেছে। তাঁর মতে, এল-সাইয়েদ স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে কথা বলেছেন। অন্যদিকে, তাঁর প্রতিপক্ষরা সন্ত্রাসবাদ ও মুসলিম ব্রাদারহুড নিয়ে ভিত্তিহীন প্রচার চালিয়েছে।

ইসরায়েল নিয়ে অবস্থানও ছিল বড় ইস্যু
এল-সাইয়েদের রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন প্রশ্ন। তিনি ইসরায়েলের নীতি এবং গাজায় চলা যুদ্ধের প্রকাশ্য সমালোচক। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষেও তার অবস্থান রয়েছে। তার বক্তব্য, মার্কিন করদাতাদের অর্থ বিদেশি যুদ্ধ বা বর্ণবাদী ও গণহত্যামূলক যুদ্ধে ব্যয় করা উচিত নয়; বরং সেই অর্থ দেশের মানুষের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করা দরকার।

এই অবস্থানের কারণে নির্বাচনী প্রচারে ইসরায়েলপন্থি বিভিন্ন গোষ্ঠীর সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারি ও সাধারণ নির্বাচন—দুই পর্যায়েই তার বিরুদ্ধে প্রচারে অর্থ ব্যয় করেছে এআইপ্যাক। প্রাইমারিতে তাকে হারানোর প্রচারে সংগঠনটি ৩ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছিল বলে গণমাধ্যমের খবরে উঠে আসে।

এল-সাইয়েদের জয়কে তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঘটনা হিসেবে দেখছে না ইসরায়েলি গণমাধ্যমও। দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো তার ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করেছে।

জেরুজালেম পোস্ট এল-সাইয়েদের বিজয়ী ভাষণের একটি মন্তব্যকে শিরোনাম করেছে। নির্বাচনের ফল নিশ্চিত হওয়ার পর সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এত দিন নির্বাচনের ফল নিয়ে কথা বলার সময় তিনি ‘ইনশাআল্লাহ’ বলতেন। এখন সেই শব্দ বদলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার সময় এসেছে।

এই মন্তব্যের সূত্র ধরে পত্রিকাটির শিরোনাম ছিল, ‘ইনশাআল্লাহকে আলহামদুলিল্লাহতে বদলে দিন: মিশিগানে সিনেটর নির্বাচিত এল-সাইয়েদ’। প্রতিবেদনে তাকে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত ডেমোক্র্যাট নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

টাইমস অব ইসরায়েলও তার বিজয়কে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে দেখেছে। সংবাদমাধ্যমটির শিরোনামে এল-সাইয়েদের জয় এবং বর্ণবাদী শাসন ও গণহত্যায় অর্থায়ন বন্ধের অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ইসরায়েলবিরোধী কণ্ঠগুলোর মধ্যে এল-সাইয়েদ অন্যতম। গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর দলটির ভোটারদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমেছে। এমনকি মধ্যপন্থি আইনপ্রণেতাদের মধ্যেও ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।

বিজয়ী ভাষণে ট্রাম্প ও ভ্যান্সকে জবাব
জয় নিশ্চিত হওয়ার পর সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এল-সাইয়েদ তার বিরুদ্ধে চালানো প্রচারণার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, তার জীবদ্দশায় দেখা অন্যতম জঘন্য ও কুরুচিপূর্ণ নির্বাচনী প্রচারণার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে।

ট্রাম্পের নাম ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে করা মন্তব্যের জবাবও দেন তিনি। যেসব অভিভাবক সন্তানদের কাছে ব্যাখ্যা করতে হিমশিম খাচ্ছেন, কেন একজন প্রেসিডেন্ট কোনো মানুষের নাম বা প্রার্থনার পদ্ধতি নিয়ে উপহাস করেন, তাদের উদ্দেশে এল-সাইয়েদ বলেন, সন্তানদের জানিয়ে দিতে পারেন—‘বাজে লোকগুলো হেরে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, তার নাম বা ধর্মীয় পরিচয় মানুষের গ্যাস কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সামর্থ্য কমিয়ে দেয় না। জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা ও সাধারণ মানুষের সংকটই হওয়া উচিত রাজনীতির মূল আলোচ্য বিষয়।

ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে প্রায়ই তার নাম ভুলভাবে উচ্চারণ করতেন। বিজয়ী ভাষণে সেই প্রসঙ্গ টেনে এল-সাইয়েদ বলেন, জানুয়ারিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তাকে শপথ পড়াবেন। বিষয়টিকে তিনি এক ধরনের পরিহাস হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্য এক বক্তব্যে বলেন, ট্রাম্প চাইলে তাকে শুধু ‘সিনেটর’ বলে ডাকতে পারেন।

এল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে রিপাবলিকানদের প্রচারণায় তাকে বামপন্থার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টাও ছিল। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতর থেকেও নির্বাচনের আগে চাপের মুখে পড়েন তিনি। প্রাইমারিতে পরাজিত ইসরায়েলপন্থি ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেনস প্রকাশ্যে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দেন।

তবে এসব চাপের মধ্যেও নিজের নির্বাচনী প্রচারে স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব হ্রাস এবং বিদেশি যুদ্ধে অর্থ ব্যয়ের বদলে দেশের মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সামনে রেখেছিলেন এল-সাইয়েদ।

ভোটারদের কাছে পরিবর্তনের বার্তা
মিশিগানের ডেট্রয়েট ও আশপাশের এলাকায় নির্বাচনের সময় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসননীতি এবং বিদেশি যুদ্ধের প্রশ্ন। ডেট্রয়েটের কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি অংশও এল-সাইয়েদের পক্ষে অবস্থান নেন। ট্রাম্পের মন্তব্যের জবাবে এক ভোটার আল জাজিরাকে বলেন, ‘সবাই জানে আসল পাগল কে। তিনি যা খুশি তা-ই বলে বেড়ান।’

দক্ষিণ-পশ্চিম ডেট্রয়েটের অভিবাসী ভোটারদের কাছে ট্রাম্প প্রশাসনের ধরপাকড় নীতির অবসান ছিল বড় প্রত্যাশা। স্থানীয় এক ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক ফ্রাঙ্ক এস্পিনোসা বলেন, তাদের প্রধান দাবি—রাস্তা থেকে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার (আইসিই) কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেওয়া। একই সঙ্গে বিদেশি যুদ্ধের অবসান এবং জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার কথাও বলেন তিনি।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্যালি হাওয়েলের মতে, এল-সাইয়েদের জয় আমেরিকান রাজনীতিতে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তার ভাষায়, এই পরিবর্তনের অর্থ মুসলিমবিদ্বেষকে প্রত্যাখ্যান করা এবং আমেরিকানদের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের জীবনের মূল্যকেও স্বীকৃতি দেওয়া।

এল-সাইয়েদের জয় তাই একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়, অন্যদিকে দেশটির বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় সমাজে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নির্বাচনী প্রচারে পরিচয়কে কেন্দ্র করে আক্রমণের মুখেও ভোটারদের সমর্থন পাওয়া তার রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন গুরুত্ব দিয়েছে। এখন সিনেটে তার ভূমিকা এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন বিষয়ে অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই দেখার বিষয়।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ