উদ্বোধনী সংখ্যা ২ : আমরাই পারি
রাজস্বের গতিতে উন্নয়নের নতুন নতুন সাফল্যগাথা
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার আগে মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টায় বরিশাল থেকে ঢাকায় আসা ছিল স্বপ্নের মতো ব্যাপার। অথচ সেতু চালুর পর সেই স্বপ্ন এখন প্রতিদিনের স্বাভাবিক ঘটনা। মাত্র ৩-৪ ঘণ্টার দূরত্বে চলে এসেছে খুলনা মহানগরী এবং মোংলা সমুদ্রবন্দর। এই সেতু দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯টি জেলাকে সড়কপথে সরাসরি সংযুক্ত করেছে। কংক্রিট আর ইস্পাতের কাঠামোয় পদ্মা নদীর দুই প্রান্তের সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের সেতুবন্ধ ঘটছে।
তবে এই সেতু শুধু একটি বড় অবকাঠামো নয়, এটি বিদেশি অর্থায়ন ছাড়া প্রথমবারের মতো বাস্তবায়িত একটি মেগা প্রকল্প। বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বিভিন্ন দেশ ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণসহায়তা নিয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম পদ্মা সেতু। এটির পুরো অর্থায়ন হয়েছে দেশের টাকায়। মানে হলো, কোনো দেশের কাছ থেকে এ সেতুর জন্য ঋণ নেওয়া হয়নি।
২০১১ সালে এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে ঋণচুক্তি সই করা হয়। পরে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে অর্থায়ন বন্ধ করে। বাকি দাতা সংস্থাগুলোও পিছিয়ে যায়। সেই সময় সরকার ঘোষণা দেয়, বাংলাদেশ নিজেদের সামর্থ্যেই গড়ে তুলবে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। উন্নয়ন সহযোগীদের জানিয়ে দেওয়া হয়, তাদের অর্থায়নের দরকার নেই।
দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিলের পর প্রশ্ন ছিল, কীভাবে নির্মাণ হবে পদ্মা সেতু? জবাব ছিল, সেতু নির্মাণ সম্ভব না। অসম্ভব সম্ভব হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে অপার সম্ভাবনার সেতু। নিজস্ব অর্থায়নে এমন একটি সেতু নির্মাণ করতে যাওয়ার কাজটি সহজ ছিল না। পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন বিশ্ব দরবারে দেশ ও জনগণকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস এনে দিয়েছে। রাজস্ব আহরণে দুর্বারগতিতে এগিয়ে যাওয়ার ফলেই এই অসম্ভব কাজ সম্ভব হয়েছে।
পদ্মা সেতু ছাড়াও দেশের উন্নয়নের নতুন নতুন কীর্তিগাঁথা-মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, গভীর সমুদ্রবন্দরসহ অসংখ্য উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে আত্মনির্ভরশীলতার কারণে। স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস হতে সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআরের উন্নয়নমুখী এবং ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব নীতি-কৌশল দেশকে আত্মনির্ভরশীল করে তুলেছে।
অথচ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, দারিদ্র্য পরিস্থিতি, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে প্রয়াত সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে বাসকেট কেস আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, দেশটি বৈদেশিক ঋণ ফেরত দিতে পারবে না। তার আশঙ্কাও ভুল প্রমাণ হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ পৃথিবীতে ঋণ পরিশোধে সফল দেশগুলোর অন্যতম।
গর্বের বিষয়, কিসিঞ্জারের দেশেরই বড় সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমসের স্বনামধন্য কলাম লেখক নিকোলাস ক্রিস্টফ তার এক কলামে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে দারিদ্র্য বিমোচনের উপায় জানতে বাংলাদেশের কাছ শিক্ষা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
এই গৌরব, অহংকারের সবচেয়ে বড় দাবিদার দেশের রাজস্ব খাত। আর এই খাতের সিংহভাগ জোগান দিয়ে থাকে এনবিআর। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও কলেবর অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে বিগত বছরগুলোতে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে ১৬৬ দশমিক ৩০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। স্বাধীনতার পর ৫৩ বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১ হাজার ৯৫৪ দশমিক ২৯ গুণ।
প্রতি দশক হিসাব করে রাজস্ব আদায়ের গতি বৃদ্ধি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় ছিল ১ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা, যা আগের দশকের তুলনায় ১২ গুণ বেশি। এরপরের দশকে ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় ছিল ৮ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা, যা আগের দশকের তুলনায় চার গুণেরও বেশি। এই দশকে রাজস্ব আদায়ের গতি কমার পেছনে বিশ্লেষকরা অরাজনৈতিক সরকারের ক্ষমতায় থাকাকে দায়ী করে থাকেন।
নব্বইয়ের দশকে দেশের রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন দেখা যায়। নানাবিধ সংস্কারের ফলশ্রুতিতে এই দশকে রাজস্ব আদায় বাড়ে মাত্র ৩ গুণ। ২০০২-০৩ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। পরের দশকে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ৫ গুণেরও বেশি। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১ লাখ ১২ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছিল এনবিআর। তবে দেশে সবচেয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে শেষ দশকে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে রেকর্ড করেছে রাজস্ব বোর্ড।
কিছু কৌশল বাস্তবায়ন করার ফলে রাজস্ব আদায় বেড়েছে বহুগুণে। তার মধ্যে রয়েছে-অটোমেশন, কর জাল সম্প্রসারণ, দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, কর সংস্কৃতি সৃষ্টি। আয়কর অনুবিভাগ বিগত কয়েক বছরে কর হার কমানো, অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল, ই-ট্যাক্স সেবা, কর শিক্ষা সম্প্রসারণ, করদাতাদের উৎসাহ প্রদানে কাজ করে গেছে। ২০২৩ সালে নতুন আয়কর আইন চালু হওয়ায় কর প্রদানে আগের জটিলতা দূর হয়ে কর প্রদানের পদ্ধতি অনেক সহজ হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৪ অ্যাসাইকুডা সিস্টেমের পুরোপুরি বাস্তবায়ন, ২০১৯ সালে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন, অনলাইনে ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন, রিটার্ন দাখিল, কর পরিশোধ, ভ্যাটের দলিলাদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষণ ভ্যাট ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। কাস্টমস বিভাগের অথোরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও), অ্যাডভান্স রুলিং, স্ক্যানিং, অ্যাডভান্স প্যাসেঞ্জার ইনফরমেশন (এপিআই) প্রয়োগ করে দ্রুত পণ্য খালাসের সঙ্গে সঙ্গে ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন, রাজস্ব সংরক্ষণ, জাতীয় ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। করবান্ধব ব্যবসায়িক পরিবেশ সৃষ্টি এবং পুরো কর ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোসহ তথ্য প্রযুক্তিতে উৎকর্ষতা সাধন, সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে রাজস্ব আদায়ে এসেছে বিরাট পরিবর্তন।
স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনসহ প্রত্যেকটি আর্থ-সামাজিক সূচকে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। এইসব গৌরবজনক মাইলফলক অর্জনের মূল কারণ আত্মনির্ভরশীলতা। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের স্তর হতে মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৩১-২০৪১ এর উন্নত দেশে পরিণত হবার স্বপ্ন পূরণে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে। এ জন্য উন্নয়নমুখী এবং ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব নীতি-কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন।
তবে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দিনের পর দিন বৃদ্ধি পেলেও তা লক্ষ্যমাত্রা থেকে বহুদূরে। পলিসি সংস্কার, প্রশাসনের সংস্কার এবং সংস্কার বাস্তবায়ণ করা-এ তিন ধরনের বাধার কারণে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হয় না বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
তারা মনে করেন, অর্থনীতির আকার গত এক দশকে যে হারে বেড়েছে, সেই হারে রাজস্ব আদায় বাড়েনি। কর দেয়া সহজ হয়নি, করদাতার ভয় কাটেনি। আবার বছরের পর বছর কর অব্যাহতির সুবিধা নিয়ে দেশের বহু শিল্প খাতের বিকাশ হয়েছে। কর অব্যাহতির অপব্যবহারও হয়েছে। সংস্কারের উদ্যোগে আসে এক শ্রেণির প্রভাবশালীর বাধা। এ ছাড়া পরিপূর্ণ অটোমেশনও সম্পূর্ণ হয়নি এখনো।
তবে এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, প্রতি অর্থবছর রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, করের আওতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে জরিপ কার্যক্রমে পদ্ধতিগত সমন্বয়হীনতা ও দীর্ঘসূত্রতা, আন্তঃকর ব্যবস্থাপনায় তথ্য বিনিময়ের অপ্রতুলতা, দক্ষ জনবলের স্বল্পতা ও ভৌত অবকাঠামোসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা না থাকায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হচ্ছে না।
তবে এ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সামনের দিকে হয়তো এ সমস্যা আর থাকবে না। তখন রাজস্ব আদায়ের গতি আরও বাড়বে।
জানা গেছে, রাজস্ব আদায় বাড়াতে আয়কর ও ভ্যাটের আওতা আরও বাড়ানো, ভ্যাট রিটার্ন শতভাগ অনলাইনে দাখিল করা, উৎসে কর কর্তনের অনলাইন ব্যবস্থা সর্বস্তরে প্রচলন, অনলাইনে কর প্রদানে সব ক্ষেত্রে এ-চালান প্রচলন, ডিজিটাল আয়কর নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু, কর্মকর্তাদের কর আহরণে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর দেয়ার পদ্ধতি সহজ করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে