প্রণমহি বঙ্গমাতার নিভৃতে উৎসর্গিত জীবনকাব্য
১৫ আগস্ট ১৯৭৫, বাংলার আকাশ ভোর হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক তখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডের ৬৭৭ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাড়ির রক্ষীরা বিউগল বাজিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন শুরু করামাত্র কিছু বিপথগামী সেনাসদস্য দক্ষিণ দিক থেকে সরাসরি আক্রমণ শুরু করে।
১৫ আগস্ট নারকীয় হত্যাযজ্ঞে প্রথমে ব্রাশফায়ার করা হয় শেখ কামালকে। শেখ কামালকে হত্যার পর খুনিরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় এ এফ এম মহিতুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার মো. কুদ্দুস শিকদারের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, আবদুল আজিজ পাশা তার সৈন্যদের নিয়ে দোতলায় গিয়ে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব যে ঘরে আছেন সেই দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে।
এক পর্যায়ে তারা দরজায় গুলি করে। ফজিলাতুন নেছা মুজিব তখন দরজা খুলে দেন এবং ঘরের মধ্যে যারা আছেন, তাদের হত্যা না করার অনুরোধ করেন; কিন্তু খুনিরা ফজিলাতুন নেছা মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও গৃহকর্মী রমাকে নিচে নিয়ে আসতে থাকে। সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন বঙ্গমাতা। চিৎকার করে বলেন, ‘আমি যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেল।’
ফজিলাতুন নেছা মুজিব নিচে নামতে অস্বীকৃতি জানালে ঘাতকরা শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে যায়। আর ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে তার ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর ঘরে আগে থেকেই ছিলেন শেখ জামাল, সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল। ফজিলাতুন নেছা মুজিবসহ সবাইকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে আবদুল আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন। ফজিলাতুন নেছা মুজিবের নিথর দেহটি ঘরের দরজায় পড়ে থাকে। বাঁ দিকে পড়ে থাকে শেখ জামালের মৃতদেহ। রোজী জামালের মুখে গুলি লাগে। রক্তক্ষরণে বিবর্ণ হয়ে যায় সুলতানা কামালের মুখ।
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ৮ আগস্ট ১৯৩০ সালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। রেনু ছিল তার ডাকনাম । তার পিতার নাম শেখ জহুরুল হক ও মাতার নাম হোসনে আরা বেগম। তিনি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী। তিনি কেবল বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী ছিলেন না, ছিলেন সহযোদ্ধা, নীরব রাজনৈতিক সহকর্মী। তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক চরিত্র। তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থেকেও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রেরণার সবচেয়ে বড় উৎস ছিলেন। তিনি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই দেশ ও জাতির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।
বঙ্গমাতা সম্পর্কে জাতির পিতা একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার স্ত্রীর মতো সাহসী মেয়ে খুব কমই দেখা যায়। আমাকে যখন পিন্ডির ফৌজ বা পুলিশ এসে জেলে নিয়ে যায়, আমার ওপর নানা অত্যাচার করে, আমি কবে ছাড়া পাব বা কবে ফিরে আসব ঠিক থাকে না, তখন কিন্তু সে কখনো ভেঙে পড়েনি। আমার জীবনের দুটি বৃহৎ অবলম্বন। প্রথমটি হলো আত্মবিশ্বাস, দ্বিতীয়টি হলো আমার স্ত্রী আকৈশোর গৃহিণী।’
১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রের একটি সেমিনারে ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী মায়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমার মা ঘরের ভেতরে বাবাকে ডেকে নিয়ে সেদিন একটি কথাই বলেছিলেন, তিনি যেন তার নিজের মনে যা আছে তাই ওই ভাষণে বলেন। তিনি বলেছিলেন, গোটা দেশ তার এই ভাষণের দিকে তাকিয়ে আছে। অতএব, তাকে সে কথাই বলতে হবে যা বাঙালি জাতি চায়।’ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সে কথা মেনেই বঙ্গবন্ধু ওই ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
বঙ্গমাতার সুমহান ব্যক্তিত্ব ও অপরিসীম ত্যাগ নতুন প্রজন্মের কাছে ভাস্বর হয়ে উঠুক। এই জননীর জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে