শেষ বিকালের মেহেরুন রুনি ও অনন্তকালের আক্ষেপ
২০২৪ সালের পালাবদলের পর আমার মতো খুব সম্ভবত পুরো দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল বহুল আলোচিত সাগর-রুনি হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হবে। কিন্তু সে আশায় গুঁড়েবালি। যতদূর জানা যায়, অন্তবর্তী সরকারের এই মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিশাল অম্বডিম্ব প্রশব করেছেন। তাঁদের আমলে, তাঁদের সময়ে এ নিয়ে আর কিছু হবে না। আর ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে জাতীয় নির্বাচন, তাই ১১ ফেব্রুয়ারি তাঁদের হত্যা দিবসে এবার বিচারের দাবি জানানোর মানুষও কম থাকবে নিঃসন্দেহে। সবাই এখন ক্ষমতামুখী। এমপি, মিনিস্টার ও প্রাইমিনিস্টারের দৌড়ে সাগর-রুনি হত্যার বিচারের দাবি নিভৃতেই কাঁদবে। তবে আসুন আপনাদের একটি গল্প শুনায়। দুজন মানুষের নির্মম হত্যাকাণ্ডের গল্প।
দেশের প্রথম স্যাটেলাইট চ্যানেল এটিএন বাংলার মূল অফিস কারওয়ান বাজারের ওয়াসা ভবনে। আর চ্যানেলটির নিউজরুম ওয়াসা ভবনের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত ঢাকা ট্রেড সেন্টারের আট তলায়। এই চ্যানেল আমি সংবাদ প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছি ২০১০ সালের মার্চ থেকে ২০১৩ সালে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। আমি সাংবাদিক মেহেরুন রুনির সহকর্মী ছিলাম। আমরা কিছু দিন একসাথে কাজ করেছি। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নির্মম মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তিনি আবার এটিএন বাংলায় যোগ দিয়েছিলেন। আবার বলছি কারণ স্বামী সাগর সরওয়ারের কর্মস্থল জার্মানিতে যাওয়ার আগে তিনি এটিএন বাংলাতেই কর্মরত ছিলেন। জার্মানিতে যাওয়ায় তাঁর সাংবাদিকতা ক্যারিয়ারে একটা ছেদ পড়েছিল। চ্যানেলটিতে সংবাদ সম্প্রচারের প্রথম দিককার কর্মী ছিলেন মেহেরুন রুনি।
২০১২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দিনটি ছিল শুক্রবার। আমার ছিল নাইট ডিউটি। এটিএন বাংলার কাজের সূচি অনুযায়ী রাতের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিবেদকরা রাত ১০টা থেকে অফিসে আসেন। তখন আমি থাকতাম মোহাম্মদপুরে। অবিবাহিত জীবন। বাসায় কোনো কাজ ছিল না তাই ঐ দিন বিকালেই এটিএন বাংলা অফিসে চলে যাই। আর ঐ দিনই মেহেরুন রুনির সাথে আমার শেষ দেখা। এটিএন বাংলার নিউজরুমে মেহেরুন রুনি আমার বসার জায়গার দুই সিট আগে বাম পাশে বসতেন। ছোট হিসেবে আমাকে বেশ আদর করতেন। শুধু আমাকেই নয় অফিসের অন্য ছোটরাও তাঁর আদর পেতেন। মন খোলা, প্রাণবন্ত একজন মানুষ। ঐ শুক্রবার বিকেলে, হয়তো তখন সন্ধ্যা হবে হবে এমন সময় তিনি এটিএন বাংলার নিউজ রুম থেকে বের হয়ে যান। তাঁর শেষ চলে যাওয়া। শেষ প্রস্থান। আজও মনে পড়ে, হাতে ব্যাগ, শীতের কাপড় নিয়ে দ্রুত লয়ে চলে গেলেন রুনি আপা। বলে গেলেন, যাই রে!
সে সময় এস.এ. টিভিতে নিউজ এডিটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন ইলিয়াস হোসেন। বর্তমানে তিনি আর টিভিতে হেড অব নিউজ হিসেবে কর্মরত আছেন। ইলিয়াস হোসেন চ্যানেল ওয়ানে আমার সহকর্মী ছিলেন। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১২ সকাল আটটা থেকে সাড়ে আটটার দিকে ইলিয়াস ভাই আমাকে ফোন করেন। বলেন, আপনি কোথায়? রাতের ডিউটি করে এসে আমি তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কোনোমতে ফোনটা ধরে বলি, বাসায়। ছোট্ট করে বললেন, টিভি খোলেন। আপনাদের রুনি আপা স্বামী সহ খুন হয়েছেন। মোটামুটি এক লাফে টিভি রুমে গেলাম। দেখলাম লাল কালিতে ব্রেকিং নিউজ, পূর্ব রাজাবাজারে নিজ বাড়িতে সাংবাদিক দম্পতি খুন। ঐ বাসায় তখন থাকতো আমার সহপাঠী, দৈনিক প্রথম আলোর সংবাদ কর্মী সাইফুল সামিন। তাঁকে ডাকলাম। বললাম, সর্বনাশ হয়ে গেছে। টিভি দেখো। আমি বের হলাম।
বলা যায় প্রায় দৌড়ে গেলাম পূর্ব রাজাবাজারের ঔই বাড়িতে। দেখলাম এরইমধ্যেই অনেক সহকর্মী চলে এসেছেন। এটিএন বাংলার ও মাছরাঙ্গা টিভির অনেকেই। জায়গাটা বেশ জনাকীর্ণ। ফ্ল্যাটে ঢুকে ড্রয়িং স্পেস পার হয়েই রুনি আপা ও সাগর ভাইয়ে কক্ষ। আমি মোটামুটি শক্ত নার্ভের মানুষ। মরদেহ দেখা আমার কাছে কঠিন কোনো কাজ নয়। খুব সাহস করে রুমটার দরজায় গেলাম। রক্তাক্ত। এলোমেলো কক্ষ। সাগর ভাইয়ের হাত-পা বাঁধা। রুনি আপার টি-শার্ট একটু উপরের দিকে উঠানো। রক্তের ধারা এরইমধ্যেই শুকিয়ে গেছে। কী ভয়াবহ দৃশ্য। দুটো জলজ্যান্ত মানুষ লাশ হয়ে পড়ে আছেন। সময় গড়ার সাথে সাথে ভীড় বাড়ছিল। পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন পেশার গুণীজন, প্রচুর সাংবাদিক ভীড় করেছেন। পুলিশ প্রধান এলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও কত শত মানুষ।
রুনি আপার বাড়ি থেকে চলে আসি এটিএন বাংলা অফিসে। অফিস থমথমে। কারও মুখে কোনো কথা নেই। অফিস থেকে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো মাছারাঙ্গা টিভিতে যাওয়ার জন্য। আমি একটা ইউনিট নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। গেলাম মাছরাঙ্গা টিভিতে। ঐ টিভিতেও একই অবস্থা। শোকাচ্ছন্ন পরিবেশ। মরা বাড়িতে যা হয় ঠিক তেমন। সাগর ভাই মাছরাঙ্গা টিভিতে খুবই সম্মানিত ও জনপ্রিয় ছিলেন। সাগর ভাইয়ের বসার চেয়ারের ছবি নিলাম। যেখানে তিনি আগের রাতেও বসে কাজ করেছিলেন। কয়েকজন শোকার্ত সহকর্মীর সাক্ষাৎকার নিয়ে ফিরলাম এটিএন বাংলায়। সাগর ভাইকে নিয়ে সংবাদ তৈরি করলাম। সম্প্রচার হলো দুপুর ২টার নিউজে। আছর নামাজের পর রুনি আপার মরদেহ এটিএন বাংলার সামনে আনা হলো। জানাজা হলো। তারপর বিকালের শেষ আলোয় তাঁকে আমরা শেষ বিদায় জানালাম।
বাংলাদেশের ইতিহাসে অতি আলোচিত ঘটনা সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড। মানুষের প্রত্যাশা ছিল এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য মানুষ দ্রুতই জানতে পারবে। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হবে। কিন্তু হায়! অতি সংবেদনশীল এই ঘটনা নিয়ে শুরু হলো এক লংকাকাণ্ড। রুনি আপার চরিত্র হনন, এটিএন বাংলার কয়েকজন সহকর্মীকে রুনি আপার প্রেমিক বানিয়ে দেওয়া, জ্বালানি খাতের সংবাদ প্রকাশের আক্রোশ থেকে হত্যাকাণ্ড, কতো কী! এমনকি আমি লেখক নিজেও এই হত্যাকাণ্ডের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এমন কথাও মানুষের কাছ থেকে শুনেছি। প্রকৃত রহস্য ভেদ না হওয়ায়, নানা সন্দেহ, নানা গল্প, নানা তত্ত্ব এই ঘটনাকে এতোটাই রহস্যঘেরা করে তুলেছে যে, এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য আদৌও ভেদ হবে কী না তাই বড় সন্দেহ।
রুনি আপা ও সাগর ভাইয়ের হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমি নিজেও অনেক সংবাদ করেছি। দিনের পর দিন র্যাব কার্যালয় ও পুলিশের বিভিন্ন দফতরে ঘোরাফেরা করেছি। অনেক কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ সংবাদকর্মীদের সাথে কথা বলেছি। সব কিছু মিলিয়ে আমার কাছে এই হত্যাকাণ্ডে দুটি সম্ভব্য কারণ থাকতে পারে বলে মনে হয়েছে। এক. এক বা একাধিক ব্যক্তি বাইরে থেকে গিয়ে রুনি আপা ও সাগর ভাইকে হত্যা করেছে। দুই. ঘটনাটি অন্তর্ঘাতমূলক। এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে একবার আলাপ হয়েছিল দেশবরেণ্য সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ারের সাথে। তিনি ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে প্রয়াত হয়েছেন। হাসান শাহরিয়ার দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নিউজউইক এ কয়েক দশক ধরে কাজ করেছেন। তিনি খুবই গুণী সাংবাদিক ছিলেন। নিজ বাড়িতে এক আলাপচারিতায় হাসান শাহরিয়ার আমাকে বলেছিলেন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য ২-৩ দিনের মধ্যে উন্মোচন করে ফেলেছিল। তিনি আমাকে এই হত্যাকাণ্ডের একটি কারণও (মোটিভ) বলেছিলেন। কিন্তু এই ঘটনাটি অতি সংবেদনশীল হওয়ায় এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি না। কারণ এতে কেউ না কেউ আহত হতে পারেন। সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ারের বর্ণনা অনুযায়ী, কোনো এক বিশেষ কারণে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের গতিপথ বদলে যায়। তারপর থেকেই বদলে যাওয়া বিভ্রান্ত গতিপথেই চলছে থাকে তদন্ত। যা কোনোদিনই শেষ হবে না। আলোর মুখ দেখবে না। বছর ঘুরে যখন আবার যখন ১১ ফেব্রুয়ারি সামনে চলে আসে, তখন এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রয়াত সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ারের কথাগুলোই কেন যেন কানে বাজে। তিনি বলেছিলেন, এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য অনন্তকালেও শেষ হবে না। এর গতিমুখ পাল্টে দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনার পতন হলো, অধ্যাপক ইউনূসের অন্তবর্তী সরকারের মেয়াদও ফুরালো। কিন্তু কিছুতেই উন্মোচিত হলো না আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য।
(লেখক: এটিএন বাংলায় মেহেরুন রুনীর সাবেক সহকর্মী, বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে