ইতিহাসের মোড়ে বাংলাদেশের তরুণ
স্টার্টআপ, নেতৃত্ব ও নতুন রাষ্ট্রচিন্তার আহ্বান
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন একটি প্রজন্মের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে পরবর্তী কয়েক দশকের জাতীয় গতিপথ। আজ আমরা ঠিক তেমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রচিন্তার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, স্টার্টআপ সংস্কৃতি, সবুজ প্রযুক্তি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মানবসভ্যতাকে নতুন বাস্তবতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সময়ে প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের তরুণেরা নিজেদের কোথায় দেখতে চায়।
ইতিহাসের এক অমোঘ সত্য হলো, কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার তরুণ প্রজন্ম। প্রতিটি জাতীয় পুনর্জাগরণ, সামাজিক সংস্কার, প্রযুক্তিগত বিপ্লব কিংবা গণতান্ত্রিক নবজাগরণের কেন্দ্রে ছিল যুবসমাজ। কারণ তারুণ্য কেবল একটি বয়সের নাম নয়; এটি সাহস, কল্পনা, উদ্ভাবন এবং পরিবর্তনের প্রতি অদম্য বিশ্বাসের প্রতীক।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘তারুণ্য, স্টার্টআপ ও নতুন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি, উদ্যোক্তা মনোভাব এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনে তাদের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, তবে একটি বিষয় অনস্বীকার্য—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তরুণদের জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের ওপর।
আজকের বিশ্বে কোনো রাষ্ট্রের শক্তি শুধু সামরিক সক্ষমতা কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না। প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে মানুষের চিন্তাশক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার সক্ষমতায়। যে রাষ্ট্র তার তরুণদের স্বপ্ন দেখার, গবেষণা করার এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দেয়।
বিশ্ব ইতিহাসে বড় পরিবর্তনের প্রতিটি অধ্যায়ে তরুণেরাই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ফরাসি বিপ্লব, ইতালির জাতীয় পুনর্জাগরণ, পোল্যান্ডের ‘সংহতি’ আন্দোলন, চেকোস্লোভাকিয়ার ‘মখমলি বিপ্লব’, বার্লিন প্রাচীরের পতন কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার গণতান্ত্রিক উত্তরণ—সব ক্ষেত্রেই যুবসমাজ শুধু প্রতিবাদের নেতৃত্ব দেয়নি; তারা ভবিষ্যতের রূপরেখাও নির্মাণ করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সেই কালজয়ী আহ্বান আজও সমান প্রাসঙ্গিক—‘দেশ তোমার জন্য কী করবে, তা জিজ্ঞেস কোরো না; বরং তুমি দেশের জন্য কী করতে পারো, তা ভাবো।’ একইভাবে বারাক ওবামার ‘হ্যাঁ, আমরা পারি’—এই আহ্বান কোটি তরুণকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে পরিবর্তন কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি মানুষের সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তির ফল।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই জনমিতিক সুবিধা যেমন বিরাট সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে বড় দায়িত্বও। এই শক্তিকে যদি দক্ষতা, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। আর যদি এই সম্ভাবনা অবহেলিত হয়, তবে একই শক্তি বেকারত্ব, হতাশা ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এই বাস্তবতায় স্টার্টআপ সংস্কৃতি নতুন তাৎপর্য বহন করে। স্টার্টআপ মানে শুধু একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং নতুন সমস্যা চিহ্নিত করে তার কার্যকর সমাধান উদ্ভাবন করা। এটি এমন এক মানসিকতা, যেখানে একজন তরুণ সুযোগের অপেক্ষা করে না; বরং নিজেই নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে।
আজ বিশ্বের বহু শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান একসময় ছিল ক্ষুদ্র একটি ধারণা। গুগল শুরু হয়েছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকল্প হিসেবে। অ্যাপলের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি গ্যারেজ থেকে। মাইক্রোসফট জন্ম নিয়েছিল দুই তরুণের স্বপ্ন থেকে। অ্যামাজন শুরু করেছিল একটি অনলাইন বইয়ের দোকান হিসেবে। ওপেনএআইও যাত্রা শুরু করেছিল মানবকল্যাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সাহসী প্রত্যয় নিয়ে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, বিশ্ব বদলে দিতে বিপুল সম্পদের চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী চিন্তা, অধ্যবসায় এবং অনুকূল পরিবেশ।
বাংলাদেশেও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার, মোবাইল আর্থিক সেবা, ইলেকট্রনিক বাণিজ্য, মুক্ত পেশাভিত্তিক বৈশ্বিক কাজ, কৃষি-প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি এবং শিক্ষা-প্রযুক্তি খাতে অসংখ্য তরুণ নতুন উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসছেন। তবে একটি শক্তিশালী স্টার্টআপ পরিবেশ গড়ে তুলতে উদ্যোক্তার সাহসের পাশাপাশি প্রয়োজন সহজ বিনিয়োগ, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা, নীতিগত সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব সুযোগ সৃষ্টি করা; আর নাগরিকের দায়িত্ব সেই সুযোগকে কাজে লাগানো। এই দুইয়ের সমন্বয়েই টেকসই জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব।
তবে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিকতার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেবল দক্ষ মানুষ নয়, সৎ মানুষও প্রয়োজন। কারণ সততা ছাড়া কোনো উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অযোগ্যতা এবং জবাবদিহির অভাব একটি দেশের সবচেয়ে বড় অদৃশ্য শত্রু।
ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবি যথার্থই বলেছিলেন, ‘সভ্যতাগুলো বাইরে থেকে যতটা ধ্বংস হয়, তার চেয়ে বেশি ধ্বংস হয় নিজেদের ভেতরের দুর্বলতায়।’ বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও এই কথার গভীর তাৎপর্য রয়েছে। আমাদের উন্নয়নের প্রধান বাধা বহির্বিশ্ব নয়; বরং নিজেদের দুর্বলতা, অনিয়ম এবং সংকীর্ণ মানসিকতা।
তাই নতুন প্রজন্মের সামনে দ্বৈত দায়িত্ব। একদিকে প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে হবে, অন্যদিকে নৈতিকতায় অটল থাকতে হবে। একজন প্রকৌশলী যদি সততা হারান, একজন উদ্যোক্তা যদি সামাজিক দায়বদ্ধতা ভুলে যান, একজন কর্মকর্তা যদি জবাবদিহি এড়িয়ে চলেন, তবে উন্নয়নের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।
দেশপ্রেমের সংজ্ঞাও আজ নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। দেশপ্রেম শুধু আবেগ নয়; এটি দায়িত্ববোধের নাম। একজন শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠদান করলে, একজন চিকিৎসক আন্তরিকতার সঙ্গে রোগীর সেবা করলে, একজন কৃষক নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করলে, একজন উদ্যোক্তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলে এবং একজন সরকারি কর্মকর্তা স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে—সেখানেই প্রকৃত দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটে।
বিশ্বের সফল রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। সিঙ্গাপুর মেধা ও সুশাসনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া শিক্ষাকে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করেছে। ফিনল্যান্ড সৃজনশীল চিন্তাকে শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে স্থান দিয়েছে। এস্তোনিয়া ডিজিটাল রাষ্ট্র গড়ে দেখিয়েছে, আয়তনে ছোট হলেও দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় হওয়া যায়। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি অবকাঠামো নয়, মানুষ।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাই শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞানসৃষ্টির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের চাকরিপ্রার্থী নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তোলার সংস্কৃতি বিকশিত করতে হবে। শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প ও সরকারের কার্যকর অংশীদারত্বই একটি শক্তিশালী উদ্ভাবনী অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন অপরিহার্য। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য মতের বৈচিত্র্যে, আর শক্তি জাতীয় স্বার্থে ঐক্যে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, তবে তা যেন বিভাজনের নয়; উন্নয়ন, সুশাসন এবং জনকল্যাণের প্রতিযোগিতা হয়। তরুণদের অংশগ্রহণকে সংঘাতের পথে নয়, নীতি, উদ্ভাবন এবং জনসেবার পথে পরিচালিত করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি নতুন সামাজিক অঙ্গীকার গড়ে তোলার সময় এসেছে। এমন একটি অঙ্গীকার, যেখানে রাষ্ট্র তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করবে; আর তরুণেরা রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দেবে সততা, সৃজনশীলতা, পরিশ্রম এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব। যেখানে প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিকতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ব্যক্তিগত সাফল্যের সঙ্গে জাতীয় কল্যাণের সুষম সমন্বয় ঘটবে।
নতুন বাংলাদেশ কোনো একক ব্যক্তি, কোনো একক রাজনৈতিক দল কিংবা কোনো একক সরকারের প্রকল্প নয়। এটি একটি জাতীয় অভিযাত্রা, যার প্রধান চালিকাশক্তি হবে দেশের তরুণ সমাজ। এর ভিত্তি হবে শিক্ষা, বিজ্ঞান, উদ্ভাবন, সুশাসন এবং নৈতিকতা। এর লক্ষ্য হবে এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি তরুণ তার মেধা বিকাশের সমান সুযোগ পাবে, প্রতিটি নাগরিক মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠান জনগণের আস্থা অর্জন করবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই চিরন্তন প্রার্থনা—‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’—আজও আমাদের পথ দেখায়। সেই বাংলাদেশ নির্মাণের দায়িত্ব এখন নতুন প্রজন্মের কাঁধে। ইতিহাস আবারও আমাদের সামনে এক অনন্য সুযোগ এনে দিয়েছে।
প্রশ্ন একটাই—বাংলাদেশের তরুণেরা কি ইতিহাসের নীরব দর্শক হয়ে থাকবে, নাকি ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের নির্মাতা হবে?
সময়ের উত্তর ভবিষ্যৎ লিখবে। কিন্তু সেই ভবিষ্যতের প্রথম বাক্যটি লেখার কলম আজ বাংলাদেশের তরুণদের হাতেই।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি
মতামত দিন