ইন্দোনেশিয়ায় ৬৮ হাজার বছর আগের গুহাচিত্রের সন্ধান
ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের একটি চুনাপাথরের গুহা থেকে প্রায় ৬৮ হাজার বছর পুরনো একটি মানব হাতের ছাপ (হ্যান্ড স্টেনসিল) আবিষ্কৃত হয়েছে, যা মানব সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে প্রচলিত ধারণা পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। এই আবিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে—মানবজাতির প্রতীকী চিন্তা ও সৃজনশীল সংস্কৃতির সূচনা ইউরোপে নয়, আরও অনেক আগেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ঘটে থাকতে পারে।
নিউইয়র্ক পোস্ট–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈজ্ঞানিক সাময়িকী নেচার–এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এই চিত্রকর্মের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, এটি বর্তমানে পরিচিত বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন গুহাচিত্রগুলোর একটি।
আবিষ্কৃত শিল্পকর্মটিতে লাল রঙে তৈরি একটি মানব হাতের ছাপ দেখা যায়। গবেষকদের ধারণা, গুহার দেয়ালে হাত রেখে তার ওপর লাল রঙ ফুঁকিয়ে এই ছাপ তৈরি করা হয়েছিল। এ ধরনের হ্যান্ড স্টেনসিলকে চিত্রকলার সবচেয়ে আদিম রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিজ্ঞানীরা গুহাচিত্রটির নিচে জমে থাকা খনিজ স্তরের ইউরেনিয়ামের মাত্রা বিশ্লেষণ করে এর বয়স নির্ধারণ করেছেন। পরীক্ষায় দেখা গেছে, হাতের ছাপটি অন্তত ৬৭ হাজার ৮০০ বছরের পুরনো।
নেচারে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, এই চিত্রটি এর আগে বিশ্বের প্রাচীনতম বলে বিবেচিত গুহাচিত্রের তুলনায় অন্তত ১৫ হাজার বছর পুরনো। সেই চিত্রটিও ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসিতেই আবিষ্কৃত হয়েছিল, যেখানে একটি শূকরের সঙ্গে মানবসদৃশ কিছু অবয়ব আঁকা রয়েছে। পাশাপাশি, এই নতুন আবিষ্কারটি ফ্রান্সে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন গুহাচিত্রের তুলনায়ও প্রায় ৩০ হাজার বছর আগের বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
গবেষকদের মতে, এই শিল্পকর্মটি শুধু এর প্রাচীনত্বের কারণেই নয়, বরং এর স্বতন্ত্র শৈলীর কারণেও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হাতের ছাপটিতে আঙুলগুলোর আকৃতি কিছুটা পরিবর্তিত বলে মনে হয়, যা অনেকটা প্রাণীর নখের মতো। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই পরিবর্তন প্রতীকী চিন্তাভাবনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এবং প্রাচীন সমাজে মানুষ ও প্রাণীর সম্পর্ক নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনও হতে পারে।
এর আগে সুলাওয়েসি দ্বীপে মানবসদৃশ বিভিন্ন গুহাচিত্রের সন্ধান পেয়েছিলেন গবেষকেরা। এর মধ্যে প্রায় ৪৮ হাজার বছর পুরনো একটি চিত্রকর্মে পাখি, মানব অবয়ব ও অন্যান্য প্রাণীসদৃশ আকৃতি ফুটে উঠেছে।
গবেষকেরা মনে করছেন, বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এলাকায় বসবাসকারী মানুষেরা বিজ্ঞানীদের আগে ধারণা করা সময়ের অনেক আগেই গুহাচিত্র ও শিলালিপি তৈরি করছিল।
এই আবিষ্কার নতুন করে প্রশ্ন তুলছে সেই দীর্ঘদিনের ধারণা নিয়ে—যেখানে বলা হতো, ইউরোপে বরফযুগে প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে বিমূর্ত ও প্রতীকী চিন্তার সূচনা হয়েছিল। নতুন গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, মানব সৃজনশীলতা ও শিল্পচর্চার বিকাশ হয়তো তারও বহু আগে শুরু হয়েছিল।
গবেষণার নেতৃত্বদানকারী অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যাডাম ব্রাম বলেন, ১৯৯০-এর দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তাকে শেখানো হয়েছিল যে মানব সৃজনশীলতার উৎপত্তি ইউরোপের একটি দুর্গম অঞ্চলে। তবে ইন্দোনেশিয়া থেকে পাওয়া এই নতুন প্রমাণ সেই ইউরোপকেন্দ্রিক ধারণাকে দুর্বল করে দেয়। তার মতে, আধুনিক মানব আচরণ—বিশেষ করে শিল্পের মাধ্যমে গল্প বলা ও প্রতীকী প্রকাশের সক্ষমতা—বিশ্বের অন্য অঞ্চলেও অনেক আগেই বিকশিত হয়েছিল।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে