ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৬১,৩৬৯ জন, ‘দুর্ভিক্ষে’ ২১২, গাজা ছাড়বে না ফিলিস্তিনিরা
গাজা উপত্যকার বৃহত্তম নগরী গাজা সিটি দখল এবং দক্ষিণে প্রায় দশ লাখ ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার ইসরায়েলি পরিকল্পনা জীবন দিয়েই রোখার কথা জানিয়েছেন ফিলিস্তিনিরা। শহরটি ছেড়ে যেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন বাসিন্দারা। এ অবস্থায় সামরিক অভিযান জোরদার করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)।
ইসরায়েল বলছে, তারা গাজা শহরের নিয়ন্ত্রণ দখল করবে, একটি ভিন্ন প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করবে এবং হামাসকে নির্মূলের চেষ্টা চালাবে। এনবিসি নিউজ জানায়, কিছু বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজা উপত্যকার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নতুন করে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করছে। গাজা সিটিতে অভিযান শুরু করতেই এ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
ইসরায়েলের দুটি সূত্রের বরাতে সিএনএনও জানিয়েছে, কয়েক ধাপে গাজা সিটি দখলে নেয়া হবে। প্রথম ধাপ চলবে দুই মাস, যা আগামী ৭ অক্টোবর শেষ হবে। এদিনই ইসরায়েলের হামলার দুই বছর পূর্ণ হবে। এই দুই মাসে গাজা সিটির বাসিন্দাদের অন্যত্র সরে যেতে নানাভাবে বাধ্য করা হবে। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে গাজা উপত্যকার মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণের উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে ত্রাণ বিতরণ বাড়ানো হবে, যেন গাজা সিটির বাসিন্দারা সেদিকে চলে যান।
তবে গাজা সিটি সম্পূর্ণ দখলে নিতে পাঁচ মাস লাগতে পারে বলে সিএনএনকে জানিয়েছেন ইসরায়েলের একজন কর্মকর্তা।
এরই মধ্যে প্রায় ৪১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের গাজা উপত্যকার আনুমানিক ৭৫ শতাংশ দখল করেছে ইসরায়েল। গাজা সিটি দখলের মধ্য দিয়ে তা প্রায় ৮৫ শতাংশ হবে। এতে যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকাটির প্রায় ১০ লাখ মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন। হামলা ও অনাহারে প্রাণ হারাতে পারেন আরও কয়েক হাজার ফিলিস্তিনি।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গাজায় সর্বাত্মক হামলা শুরু করে ইসরায়েল। প্রায় দুই বছর পূর্ণ হতে চলা এ যুদ্ধে গাজায় অন্তত ৬১ হাজার ৩৬৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও অন্তত এক লাখ ৫২ হাজার ৮৫০ জন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) ত্রাণ কেন্দ্রগুলোতে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজার ৭৯৩ জন।
হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানায়, শনিবার (৯ আগস্ট) গাজাজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় কমপক্ষে ৩৯ জন নিহত এবং ৪৯১ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২১ জন খাদ্য সহায়তার অপেক্ষায় ছিলেন। অন্যদিকে শনিবারের ১১ জনসহ ইসরায়েলি-সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টিতে মারা গেছেন ২১২ জন, যাদের ৯৮ জনই শিশু।
নাসের হাসপাতালের সূত্র অনুসারে, ত্রাণ আনতে গিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে রাফাহর উত্তরে জিএইচএফের একটি সাহায্য কেন্দ্রের কাছে কমপক্ষে পাঁচজন ও অন্যটিতে আটজন, উত্তর গাজার নেটজারিম করিডরের কাছের কেন্দ্রে ছয়জন এবং দক্ষিণ গাজার সালাহ আল-দিন স্ট্রিটের কেন্দ্রে দুজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
আল-আওদা হাসপাতালের চিকিৎসাকর্মীরা কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে জানান, গাজা উপত্যকায় ত্রাণপ্রার্থী ছাড়াও বেসামরিক নাগরিকদেরও লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এর মধ্যে মধ্য গাজার নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরের উত্তরে হামলার পর পাঁচজনের মরদেহ ও আহত ৩৩ জনকে তাদের হাসপাতালে আনা হয়েছে।
স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজা শহরের দক্ষিণ-পূর্বে জেইতুন পাড়ায় ইসরায়েলি কামানের গোলাবর্ষণ এবং মধ্য গাজার আল-বুরাইজ শরণার্থী শিবিরের পূর্বে আল-শহীদ মসজিদের কাছে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। আইডিএফ হামলা চালিয়েছে নাবলুস শহরের কাছে আল-আইন ও বালাতা শরণার্থী শিবিরেও। খান ইউনিসের একটি অ্যাপার্টমেন্ট লক্ষ্য করে বিমান হামলায় একজন নারী নিহত ও একজন আহত হন।
বিবিসি জানায়, ইসরায়েলি সামরিক অভিযান উপত্যকাটিকে ধ্বংস এবং দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। প্রায় ২১ লাখ বাসিন্দার প্রায় সবাই কয়েকবার করে বাস্তুচ্যুত অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে ও বোমা হামলার শিকার হয়েছেন, রয়েছেন অনাহারেও। তাদের মধ্যেকার এক মিলিয়ন মানুষকে স্থায়ীভাবে বিতাড়নসহ যুদ্ধ শেষ করার পাঁচটি সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে ইসরায়েলি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা। এগুলো হলো– হামাসকে নিরস্ত্র করা, জীবিত-মৃত সব জিম্মিকে ফিরিয়ে আনা, গাজার বেসামরিকীকরণ নিশ্চিত করা, গাজা ভূখণ্ডে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং হামাস বা ফিলিস্তিন (পিএ) কর্তৃপক্ষ ছাড়া বিকল্প কোনো বেসামরিক সরকার গঠন করা।
ইসরায়েলের এখনকার মূল পরিকল্পনা হচ্ছে, এরই মধ্যে কয়েকবার বাস্তুচ্যুত হওয়া ফিলিস্তিনিদের উপত্যকার উত্তরাংশের মূল ভূখণ্ড গাজা সিটি থেকে জোর করে আরও দক্ষিণে ‘কেন্দ্রীভূত অঞ্চলে’ সরিয়ে নিয়ে যাওয়া। ইতোমধ্যেই অধিকাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। তবে এখনো গাজা সিটিসহ কয়েকটি এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।
ইসরায়েলের আগ্রাসনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরটিতে এখন প্রায় দশ লাখ মানুষের বাস। চরম ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষে সেখানে প্রতিদিনই কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে। ইসরায়েল স্থল অভিযান ও বিমান হামলা জোরদার করলে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটার শঙ্কা রয়েছে। এসব মানুষ ইতোমধ্যেই দুর্ভাগ্যপীড়িত, অভুক্ত।
পুরো গাজা দখল প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) ফক্স নিউজ নেতানিয়াহুর কাছে জানতে চায়, গাজার ৭৫ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। তবে কি পুরোটা তিনি দখল করতে চান? জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমাদের ইচ্ছা আছে।’
এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা এসেছে ইসরায়েলের ভেতর থেকেই। তেল আবিবের হোটেল ব্যবসায়ী ড্যানি বুকভস্কি বলেন, ‘আসলে আমি মনে করি, এটি সেখানে বন্দি থাকা সব জিম্মির জন্য মৃত্যুদণ্ড হয়ে দেখা দেবে। এ মুহূর্তে এটি করা হবে ভুল সিদ্ধান্ত।’ গাজায় এখনো ৫০ জন জিম্মি, যাদের মধ্যে ২০ জন জীবিত বলে মনে করা হয়।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর পদক্ষেপকে আলোচনা প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ‘একটি স্পষ্ট অভ্যুত্থান’ বলে বর্ণনা করেছে হামাস। বিবৃতিতে তারা বলছে, অবশিষ্ট জিম্মিদের প্রাণের বিনিময়ে ইসরায়েল এ দখলের অনুমোদন দিয়েছে।
তবে হতাশ, ভীত-আতঙ্কিত, ক্ষুধায় কাতর ও যুদ্ধপীড়িত হলেও গাজা সিটিবাসী বলছেন, ‘জন্মভূমি ছেড়ে যাব না’।
ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলা শুরুর পর থেকে পরিবার নিয়ে অন্তত আটবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন আহমেদ হিরজ। এখন তার ঠাঁই হয়েছে গাজা সিটিতে। তিনি বলেন, ‘খোদার নামে শপথ করে বলছি, আমি ১০০ বারের মতো মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি। এখন আমার জন্য এখানেই মারা যাওয়া ভালো’।
আল–জাজিরাকে আহমেদ হিরজ বলেন, ‘আমি কখনোই এ জায়গা ছেড়ে যাব না। এরই মধ্যে আমরা অনাহার, দুর্ভোগ, নির্যাতন ও করুণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছি। আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো, এখানেই মারা যাওয়া’।
একই কথা বলেন রজব খাদেরও, ‘মরলে এখানেই মরব’। তিনিও সাফ জানান, তিনি কখনোই ‘কুকুর আর অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে রাস্তায় থাকার জন্য’ গাজার দক্ষিণাঞ্চলে যাবেন না। রজব বলেন, ‘আমরা পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে গাজা সিটিতেই থাকব। ইসরায়েলিরা এখানে আমাদের শরীর ও আত্মা ছাড়া আর কিছুই পাবে না’।
এক সময় গাজা উপত্যকার উত্তর–পূর্বাঞ্চলের বেইত হানুনে থাকতেন মাঘজৌজা সাদা। ইসরায়েলি হামলায় বাস্তুচ্যুত হয়ে এখন তার ঠাঁই হয়েছে গাজা সিটিতে। ইসরায়েলিদের পক্ষ থেকে নতুন করে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির হুমকির মুখে এ নারী বলেন, ‘দক্ষিণ আর নিরাপদ নয়। গাজা সিটিও নিরাপদ নয়। উত্তরাঞ্চলও নিরাপদ নয়। আমরা কোথায় যাব?’ তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘আমরা কি নিজেদের সাগরে ছুড়ে ফেলব?’

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে