রাজধানীর ৬০ শতাংশ এলাকা উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে
রাজধানী ঢাকার দ্রুত নগরায়ণ, জলাভূমি ভরাট এবং অপরিকল্পিত নির্মাণের কারণে বড় ধরনের ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ এলাকা ভূমিকম্পের সময় মাটির তরলীকরণ (লিকুইফ্যাকশন) ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে অনেক ভবন বসে যাওয়া, হেলে পড়া কিংবা কাঠামোগত ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাজউক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যৌথ সমীক্ষার তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, রাজধানীর বিস্তীর্ণ অংশে নরম ও ভরাট করা মাটির কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, রাজউকের আওতাধীন প্রায় ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার অর্ধেকেরও বেশি বড় ধরনের ভূমিকম্পে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। তার ভাষ্য, আলগা ও ভরাট করা মাটি ভূমিকম্পের কম্পনকে আরও তীব্র করে তোলে। ফলে এসব এলাকায় ভবনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং ভবন হেলে যাওয়া বা ধসে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার মাটির বড় অংশই নরম কাদামাটি ও পলিমাটি দিয়ে গঠিত। অতীতে জলাভূমি, খাল ও নিচু এলাকা ভরাট করে যেসব আবাসন প্রকল্প ও বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই ভূমিকম্পের সময় বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
গবেষণায় লিকুইফ্যাকশন পটেনশিয়াল ইনডেক্স (এলপিআই) ব্যবহার করে রাজধানীকে চারটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে লাল অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, ম্যাজেন্টা অঞ্চল মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, নীল অঞ্চল তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং সবুজ অঞ্চল সবচেয়ে নিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অধ্যাপক আনসারী জানান, ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে লাল অঞ্চলের মাটি মারাত্মকভাবে শক্তি হারাতে পারে। বিশেষ করে নদী, খাল, পুকুর ও জলাভূমি সংলগ্ন এলাকায়, যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বেশি, সেখানে তরলীকরণের ঝুঁকি আরও বেশি।
তিনি ১৯৮৫ সালের মেক্সিকো সিটি ভূমিকম্পের উদাহরণ টেনে বলেন, ভূমিকম্পের কেন্দ্র অনেক দূরে হলেও নরম মাটি কম্পনের তীব্রতা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে বালু দিয়ে ভরাট করা জমিতে কম্পনের পাশাপাশি মাটি তরল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেও নিরাপদ ভবন নির্মাণ সম্ভব। তবে এজন্য শুধু গভীর পাইলিং করলেই হবে না; ভবনের আশপাশের মাটি শক্তিশালী করার ব্যবস্থাও নিতে হবে। বিশেষ করে মাটির ওপরের ৫ থেকে ৬ মিটার স্তর স্থিতিশীল করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে অনেক নির্মাণ প্রকল্পে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ঢাকার মাত্র ৩৫ শতাংশ এলাকা শক্ত লাল মাটির ওপর অবস্থিত। বাকি অংশ জলাভূমি, বন্যাপ্রবণ এলাকা, পুরোনো খাল এবং নিচু জমি নিয়ে গঠিত। ফলে এসব এলাকায় ভূমিকম্পের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
তার মতে, পুরান ঢাকা, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, খিলগাঁও, মতিঝিল, ফার্মগেট ও মিরপুরের বড় অংশ তুলনামূলক শক্ত মাটির ওপর গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে নদীসংলগ্ন ও ভরাট করা এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
রাজউক ও বুয়েটের ঝুঁকি মানচিত্র অনুযায়ী, হাজরতপুর, সাভার, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, এনায়েতনগর, কাশীপুর, কালাগাছিয়া, বন্দর, মোগরাপাড়া, নারায়ণগঞ্জ সদর, বক্তাবলী, বাড্ডা, আশুলিয়া, দারুস সালামের কিছু অংশ, নিউমার্কেট, লালবাগ, মদনপুর, মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডির কিছু এলাকা সবচেয়ে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ (লাল অঞ্চল) হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অন্যদিকে গুলশান, পল্লবী, ক্যান্টনমেন্ট, খিলগাঁও, তেজগাঁও, রামপুরা, মতিঝিল, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, কাফরুল, দক্ষিণখান, রূপগঞ্জ, ভুলতা, ফতুল্লা, হাজারীবাগের কিছু অংশ, পল্টন ও কোনাবাড়ী মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ (ম্যাজেন্টা অঞ্চল) হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবন নির্মাণে মাটির ধরন অনুযায়ী নকশা প্রণয়ন এবং বাংলাদেশ জাতীয় নির্মাণবিধি (বিএনবিসি) কঠোরভাবে অনুসরণ করা হলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তবে এখনো রাজধানীর ভূমিকম্প ঝুঁকির মানচিত্র নগর পরিকল্পনায় পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। রাজউক জানিয়েছে, ভবিষ্যতে বিস্তারিত এলাকা পরিকল্পনা (ড্যাপ) হালনাগাদের সময় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভুঁইয়া বলেন, আমাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ জাতীয় নির্মাণবিধি অনুসরণ করেই ভবন নির্মাণ করে। তবে ৭ মাত্রা বা তার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে তার প্রকৃত প্রভাব কতটা হবে, তা আগাম নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
মতামত দিন