সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন? কীটপতঙ্গের কাছ থেকেই শিখুন বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কৌশল
সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেকের কাছেই কঠিন হয়ে ওঠে। একটি বিষয় করব, নাকি অন্যটি বেছে নেব, এমন দ্বিধায় গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটে যায়। কখনো কখনো এই সিদ্ধান্তহীনতা এতটাই প্রভাব ফেলে যে ব্যক্তিগত ও পেশাগত অন্যান্য কাজও ব্যাহত হতে থাকে। তবে কিছু কৌশল অনুসরণ করলে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।
আবার রাগ, আবেগ কিংবা অতিরিক্ত তাড়াহুড়োর বশে নেওয়া সিদ্ধান্তও অনেক সময় পরে বড় ধরনের অনুশোচনার কারণ হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষের মতো জটিল মস্তিষ্ক না থাকলেও কিছু ক্ষুদ্র প্রাণী পরিবেশ ও পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতা দেখায়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে পিঁপড়া, মৌমাছি, পঙ্গপাল, তেলাপোকা ও ফলের মাছির আচরণ বিশ্লেষণ করে মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে। এসব শিক্ষা অনুসরণ করলে আবেগ ও দ্বিধা কাটিয়ে আরও বিচক্ষণভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
ফলের মাছি শেখায় ক্ষণিকের লোভ সামলাতে
আবেগের তাড়নায় ভুল করে বসার প্রবণতা মানুষের চিরচেনা দুর্বলতা। এখানেই আশ্চর্যজনকভাবে এগিয়ে ফলের মাছি বা ফ্রুট ফ্লাই। গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই ক্ষুদ্র প্রাণীটি বাইরের পরিবেশের পাশাপাশি নিজের শরীরের ভেতরকার চাহিদাও বিবেচনায় নেয়। দুটি গন্ধের পার্থক্য সামান্য হলে তারা তাড়াহুড়ো না করে সময় নিয়ে যাচাই করে সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতি। এমনকি মিষ্টি কিন্তু পুষ্টিহীন খাবার আর তেতো স্বাদের পুষ্টিকর খাবারের মধ্যে বেছে নিতে বললে, ফলের মাছি ক্ষণিকের স্বাদের বদলে বেছে নেয় দীর্ঘমেয়াদি উপকারিতাকেই।
একাধিক বিকল্পের মুখে পিঁপড়ার সমাধান
চোখের সামনে অসংখ্য বিকল্প থাকলে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি আমরা—বিশেষজ্ঞরা যাকে বলেন ‘চয়েস ওভারলোড’। খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে একই সমস্যায় পড়ে পিঁপড়াও, তবে তাদের কাছে আছে চমৎকার এক সমাধান। প্রথমে কয়েকটি পিঁপড়া বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে খাবার খুঁজতে বের হয়, চলার পথে রেখে যায় ফেরোমোন নামের রাসায়নিক চিহ্ন। যে পথে দ্রুত খাবার মেলে, সেই পথের ফেরোমোন-চিহ্ন শক্তিশালী হতে থাকে, ধীরে ধীরে বাকি পিঁপড়ারাও সেদিকে ঝুঁকে পড়ে। এভাবে কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই গোটা কলোনি বেছে নেয় সবচেয়ে কার্যকর পথ। বেলজিয়ামের ইউনিভার্সিটি লিব্রে দ্য ব্রাসেলসের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগারের সহপরিচালক মার্কো দোরিগোর ভাষ্যে, পিঁপড়ার এই আচরণ থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘অ্যান্ট কলোনি অপটিমাইজেশন’ পদ্ধতি, যা আজ ব্যবহৃত হচ্ছে পরিবহন, লজিস্টিকস ও সময়সূচি তৈরির মতো নানা ক্ষেত্রে।
মৌমাছির গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়া
নতুন বাসা খোঁজার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মৌমাছিরা অনুসরণ করে প্রায় গণতান্ত্রিক এক পদ্ধতি। স্কাউট মৌমাছিরা সম্ভাব্য জায়গা খুঁজে বাসায় ফিরে বিশেষ ‘ওয়াগল ড্যান্স’-এর মাধ্যমে জানায় জায়গাটি কতটা উপযুক্ত। জায়গা যত ভালো, নাচও তত দীর্ঘ ও প্রাণবন্ত হয়। এরপর অন্য মৌমাছিরা নিজেরাও গিয়ে যাচাই করে ফিরে এসে মতামত জানায়, এভাবে একটি নির্দিষ্ট জায়গার পক্ষে যথেষ্ট সমর্থন তৈরি হলে গোটা দল সেদিকেই যাত্রা করে। এখান থেকে মানুষের শেখার বিষয়—কোনো সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করতে একক মতের বদলে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য যাচাই জরুরি।
নিরপেক্ষতার শিক্ষা দেয় পঙ্গপাল
দ্বিধাবিভক্ত মতের মুখে আমরা প্রায়ই কোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য বোধ করি। অথচ পঙ্গপালের আচরণ দেখায় ভিন্ন পথ। কোনদিকে এগোবে তা নিয়ে দ্বিধায় পড়লে পঙ্গপালের দল কিছুক্ষণের জন্য চলা থামিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে চলে যায়—এই সাময়িক বিরতিই তাদের নতুন করে সঠিক পথ বেছে নিতে সহায়তা করে। যুক্তরাজ্যের বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গাণিতিক জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টিয়ান ইয়েটস তরুণ পঙ্গপালদের নিয়ে চালানো এক পরীক্ষায় দেখতে পান, চলার পথে দলটি মাঝেমধ্যেই থমকে গিয়ে হঠাৎ দিক বদলায়। মানুষের ওপর চালানো একই ধরনের এক পরীক্ষায়ও তিনি দেখেন, নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ থাকলে একটি দল সিদ্ধান্তে পৌঁছায় আরও দ্রুত ও সহজে। তার ভাষায়, সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমে এলে সামান্য কোনো প্রভাবও দলের সিদ্ধান্তের গতিপথ বদলে দিতে পারে বড় আকারে।
তেলাপোকা শেখায় ভিন্নমতের গুরুত্ব
দলের সবাই একই রকম চিন্তা করলে সিদ্ধান্ত দ্রুত হতে পারে বটে, তবে তা সবসময় সঠিক নাও হতে পারে। তেলাপোকা নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, দলে সাহসী-অনুসন্ধানী ও লাজুক-সতর্ক—দুই ধরনের সদস্য থাকলে তারা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায় দ্রুততম সময়ে। জাপানের টোকিও মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক আইজাক প্লানাস-সিটজার গবেষণা বলছে, সব সদস্য হুবহু একই আচরণ করলে দলটি সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, কিন্তু ব্যক্তিত্বে বৈচিত্র্য থাকলে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় অনেক দ্রুত।
কীটপতঙ্গদের এসব সহজাত কৌশল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে মানুষের বাস্তব সমস্যা সমাধানের নানা অ্যালগরিদম। তাই পরের বার কোনো কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হলে, ক্ষণিকের আবেগ নয়—বরং এই ক্ষুদ্র পতঙ্গদের প্রজ্ঞাকেই হয়তো অনুসরণ করা যেতে পারে।
মতামত দিন