৯ মাসে দেশের নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে ৪৯১ মরদেহ উদ্ধার: এইচআরএসএস
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে দেশে ১ হাজার ১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭৩ জন নিহত ও ৬ হাজার ৪৭৩ জনের বেশি আহত হয়েছেন। একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৮৭ জন। কারাগারে মারা গেছেন ৯৫ বন্দী। এ ছাড়া ২ হাজার ৪০৪ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫১৮ সাংবাদিক। এসময়ে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডের ৪৬৫টি ঘটনায় ৪৯১টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য জানা গেছে।
রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ, সংগঠনটির সংগৃহীত তথ্য ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ৩৪২টি ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও ২ হাজার ৬৩২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষের ৩২১টি ঘটনায় ১১ জন নিহত ও ২ হাজার ১৯০ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের ৯৩টি সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ৯ জন, আহত ৫৪৫ জন। বিএনপি-এনসিপির ৪৭টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩২০ জন।
আওয়ামী লীগ-এনসিপির পাঁচটি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৫৮ জন। আওয়ামী লীগ-জামায়াতের দুটি সংঘর্ষে একজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের একটি ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১২৮টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩২০ জন। এ ছাড়া অন্যান্য দলের মধ্যে ৭৪টি ঘটনায় ১১ জন নিহত ও ৪০৫ জন আহত হয়েছেন।
এইচআরএসএসের হিসাবে, মোট রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১ শতাংশ—৯৩১টি ঘটনা—ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিএনপির সঙ্গে অন্য দলগুলোর সংঘর্ষে।
রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৪৬ জন, জামায়াতের আটজন, আওয়ামী লীগের ছয়জন, চরমপন্থী একজন এবং সাধারণ নারীসহ অন্যান্য দল বা রাজনৈতিক পরিচয় অজানা ১২ জন রয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থিতা, সমাবেশ, সমর্থকদের সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও চাঁদাবাজিকে এসব সহিংসতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দুর্বৃত্তদের অন্তত ৮৮টি হামলায় কমপক্ষে ১০০ জন আহত এবং ৫২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৩০, আওয়ামী লীগের ১১, জামায়াতের পাঁচ ও অন্যান্য দলের ছয়জন রয়েছেন। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৫০ জনের বেশি রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, দখলদারত্ব, নির্বাচন ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সারাদেশে এক হাজারের বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে নয় মাসে ৪০২টি সহিংসতার ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ২ হাজার ৬২৩ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে ছয় শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
এ সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ১২৩টি ঘটনায় আটজন নিহত ও ৯৪১ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াতের ২৩৪টি সংঘর্ষে চারজন নিহত ও ১ হাজার ৪৩৮ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের তিনটি সংঘর্ষে একজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। বিএনপি-এনসিপির ১৬টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৪১ জন। বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১৭টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬৩ জন। অন্যান্য দলের মধ্যে ১০টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৮ জন।
নিহতদের মধ্যে বিএনপির নয়জন, জামায়াতের দুজন, আওয়ামী লীগের একজন এবং রাজনৈতিক পরিচয় অজানা একজন রয়েছেন।
রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২৭০টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৫ হাজার ৮০৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৩২ হাজার ৪৩৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। বিভিন্ন দলের ৫ হাজার ৬৪৪ নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৪ হাজার ৮২৭, বিএনপির ৬০৯, জামায়াতের ১৪৫, এনসিপির ৪৩ ও চরমপন্থী ৩৭ জন রয়েছেন। পাশাপাশি সন্ত্রাস, নাশকতা, পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযানে ৬৩ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মব সহিংসতা ও সাংবাদিক নির্যাতন
চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাক্বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টাসহ নানা অভিযোগে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত ও ৪০১ জন আহত হয়েছেন।
এ সময়ে ২৮৮টি ঘটনায় ৫১৮ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৯৭ জন আহত, ৮৭ জন লাঞ্ছিত এবং ৭৭ জন হুমকির মুখে পড়েছেন। আটক হয়েছেন ২০ সাংবাদিক। সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৬-এর অধীনে ৫১ সাংবাদিককে আসামি করে ১৯টি মামলা হয়েছে।
এ ছাড়া ৫৮টি সভা-সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে। এসব ঘটনায় ৪৩৯ জন আহত ও ৪৬ জন আটক হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারী রয়েছেন।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ ও সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর বিভিন্ন ধারায় পৃথক ৪০টি মামলায় ১১৩ জনকে অভিযুক্ত এবং ৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে আটক হয়েছেন ১২ জন।
রাজনৈতিক ব্যক্তি, চলমান রাজনৈতিক ইস্যু, জুলাই ইস্যু, মাদক, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, মানহানিকর কনটেন্ট ও কটূক্তির সমালোচনাকে কেন্দ্র করে চারজন নিহত, চারজন নির্যাতনের শিকার এবং ২১ জন আটক হয়েছেন। এ-সংক্রান্ত ২০টি মামলা হয়েছে এবং ১২ জনকে চাকরিচ্যুত বা সমজাতীয় শাস্তি দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কোরআন অবমাননার অভিযোগে ২৪ জনকে আটক করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২৪টি মামলা হয়েছে এবং দুজন মারধরের শিকার হয়েছেন। সাইবার বুলিং, ফেসবুকে সমালোচনা ও কটূক্তিসহ অন্যান্য ঘটনায় আরও ২৯ জনকে আটক করা হয়েছে।
হেফাজত ও কারাগারে মৃত্যু
নয় মাসে কারাগারে ৯৫ বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪০ জন কয়েদি ও ৫৫ জন হাজতি। মৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ২০ জন, বিএনপির একজন এবং সাধারণ বন্দী হিসেবে ৭৪ জনের পরিচয় নথিভুক্ত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে হেফাজতে ও নির্যাতনের শিকার হয়ে ১২ জন, গুলিবিদ্ধ হয়ে দুজন এবং বন্দুকযুদ্ধে তিনজন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া গ্রেপ্তার এড়াতে পালানোর সময় বহুতল ভবন থেকে পড়ে ও পানিতে ডুবে বিভিন্ন কারণে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ অটোরিকশা জব্দ করায় মানসিকভাবে অসুস্থ এক অটোরিকশাচালকের মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গুম ও জোরপূর্বক তুলে নেওয়া
এ সময়ে অন্তত একটি গুম ও একটি জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে এইচআরএসএস। গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাগেরহাটের মোংলায় কোস্ট গার্ড পরিচয়ে মিরাজ শেখ (৩২) নামে এক যুবককে গুমের অভিযোগ রয়েছে। গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর থেকে শামীম খান নামে এক ব্যবসায়ীকে সাদা পোশাকে তুলে নেওয়ার দুই দিন পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আটক দেখানোর তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা
নয় মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলায় ৬২ জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে ২১টি মন্দির, ২০টি প্রতিমা ও ৪৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। জমি দখলের চারটি ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একজন নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
উদ্ধার হওয়া মরদেহ
নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যাকাণ্ডের ৪৬৫টি ঘটনায় ৪৯১টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে এইচআরএসএস। এর মধ্যে বস্তাবন্দি ৪৬টি, ঝুলন্ত অবস্থায় ৮৭টি এবং শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্নসহ ৭৪টি মরদেহ পাওয়া গেছে। গলা কাটা অবস্থায় ৩৫টি এবং হাত-পা বাঁধা ৩১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আরও ২১৮টি মরদেহ পাওয়া গেছে।
সীমান্তে হতাহত
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৪৩টি হামলার ঘটনায় বিএসএফের হামলায় ১৩ জন নিহত ও ৩৯ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ২২ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। বিভিন্ন সীমান্ত থেকে আটক হয়েছেন ৪৪ জন।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২৪টি সহিংসতার ঘটনায় একজন নিহত, ছয়জন আহত, ছয়জন গুলিবিদ্ধ এবং ৮৩ জন আটক হয়েছেন। এ ছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে আটজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন।
শ্রমিক নির্যাতন
নয় মাসে ৫৮২টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ১৪৫ জন নিহত ও ১ হাজার ২৬৩ জন আহত হয়েছেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সুরক্ষাসামগ্রীর অভাবে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ৩৯০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলনের সময় ২৬ জনকে আটক করা হয়েছে।
এ ছাড়া তিন গৃহপরিচারিকা নিহত, সাতজন নির্যাতনের শিকার এবং পাঁচজনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয়জন ছাড়া নিহত ও নির্যাতনের শিকার গৃহপরিচারিকাদের সবাই শিশু ও কিশোরী।
নারী ও শিশু নির্যাতন
প্রতিবেদনে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৪০৪ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৬৫৭ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাঁদের ৩৯২ জন, অর্থাৎ ৬০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ১৩০ জন বা ২০ শতাংশ দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৯ জনকে এবং ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন দুজন।
যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৬৯৬ নারী ও কন্যাশিশু। তাঁদের মধ্যে ২৭৬ জন বা ৪০ শতাংশ শিশু।
যৌতুকের জন্য নির্যাতনে ৩২ নারী নিহত, ৩৫ জন আহত এবং পাঁচজন আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৪৫৭
মতামত দিন