৪৪টি ক্ষুদ্র কফিন ও একটি তালাবদ্ধ ফাইল: কাঠামোগত হত্যার দায় কার?
পাবনার চাটমোহর থেকে আসা আড়াই বছরের শিশু নুসায়বা যখন ১২ মার্চ নিথর হয়ে গেল, তার ঠিক চার দিন পর তার বাবার ফোনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (আইসিইউ) থেকে একটি কল আসে। জানানো হয়, নুসায়বার জন্য একটি শয্যা বরাদ্দ হয়েছে। মৃত সন্তানের জন্য শয্যা বরাদ্দের এই ‘মরণোত্তর ডাক’ আসলে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমাদের সুশাসনের গালে এক বিরাট চপেটাঘাত। নুসায়বার মতো একই ভাগ্য বরণ করেছে তেরখাদিয়ার নাহিদ বা দুর্গাপুরের ১০ মাসের শিশু জিহাদ, যাদের পরিবার দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও একটি যান্ত্রিক নিঃশ্বাসের অধিকার পায়নি।
চিকিৎসক দলের বিষণ্ণ স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, গত আড়াই মাসে এই মৃত্যুর সংখ্যা ৫৩ ছুঁয়েছে; যার মধ্যে কেবল ১০ থেকে ২৪ মার্চের দুই সপ্তাহেই নিবিড় পর্যবেক্ষণের অভাবে ৪৪টি তাজা প্রাণ অকালে ঝরে গেছে।
উন্নয়নের সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, যেখানে শিশুরা সুচিকিৎসার অভাবে প্রতিদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, তার মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে মহানগরীর ঘোড়া চত্বর (বহরমপুর) এলাকায় প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০০ শয্যার আধুনিক বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালটি ২০২৩ সাল থেকেই পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে আছে। সেখানে ৫৬টি অত্যাধুনিক নিবিড় পর্যবেক্ষণ শয্যার অবকাঠামো এবং কেন্দ্রীয় প্রাণবায়ু সঞ্চালন ব্যবস্থা (সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন) মজুত থাকলেও স্রেফ জনবল কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) অনুমোদনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ফাইল আটকে আছে। এই দাপ্তরিক বিলাসিতা আজ শিশুদের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবাক করার মতো তথ্য হলো, প্রধান হাসপাতালে বর্তমানে যে ১২ শয্যার শিশু নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র চলছে, সেটি মূলত দাপ্তরিকভাবে অনুমোদিত নয়; বরং নিজস্ব বিশেষ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। যে রাষ্ট্র হাজার কোটি টাকার বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে, সেই রাষ্ট্রের প্রশাসনিক টেবিলে একটি জনবল কাঠামোর ফাইল কি ৪৪টি শিশুর জীবনের চেয়েও ভারী?
গভীর অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই অচলাবস্থার নেপথ্যে কেবল প্রশাসনিক ধীরগতি নয়, বরং এক শক্তিশালী মুনাফালোভী চক্রের (সিন্ডিকেট) স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) রয়েছে।
সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালটি তালাবদ্ধ থাকায় রাজশাহীর প্রভাবশালী বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে আইসিইউ বাণিজ্যের জোয়ার বইছে। এর চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো, তিন বছর আগে বসানো কোটি কোটি টাকার আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের কারিগরি নিশ্চয়তার মেয়াদ (ওয়ারেন্টি) এখন শেষ হওয়ার পথে। ব্যবহারের আগেই যন্ত্রপাতির লাইসেন্সিং লস ও সেন্সর অকেজো হওয়ার ফলে রাষ্ট্রের যে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তার দায় নির্ধারণে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিচার বিভাগীয় তদন্ত (Judicial Inquiry) এখন সময়ের দাবি।
এছাড়া ২০১২ সাল থেকে একটি অনুপযুক্ত ভাড়া বাড়িতে বহির্বিভাগ চালিয়ে গত এক যুগে সরকারের যে ৪ কোটি টাকার অধিক গচ্চা গেছে, তার পেছনে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ কাজ করেছে কি না—তা খতিয়ে দেখা জরুরি। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটি নিছক অবহেলা নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’ (Structural Violence)।
এখানে একটি বড় প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার নিয়ে। আমরা দেখেছি, সদ্যপ্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার প্রয়োজনে দ্রুততম সময়ে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সরঞ্জাম আনা সম্ভব হয়েছে। রাষ্ট্রের সদিচ্ছা থাকলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত, এমনকি বিদেশ থেকেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান এনে জরুরি সেবা চালু করা কোনো অসম্ভব কাজ নয়। তবে কি ঢাকার বাইরের বিভাগীয় শহর বলেই রাজশাহীর এই মানবিক বিপর্যয় নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্বহীন? জাতীয় গণমাধ্যমে দফায় দফায় সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরও প্রশাসনের এই নিশ্চুপ ভূমিকা কি তবে কেবল ‘আঞ্চলিক বৈষম্যের’ ফল? রাজধানী কেন্দ্রিক উন্নয়ন ও মনস্তত্ত্বের বাইরে গিয়ে প্রান্তিক শিশুদের জীবনের মূল্য কেন সমান হবে না, সেই প্রশ্নের উত্তর আজ জরুরি।
রাজশাহী শিশু হাসপাতালের এই স্থবিরতা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি সুস্পষ্ট আইনি ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। আমাদের সংবিধানের ১৫(ক) এবং ১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব। অবকাঠামো প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও শিশুদের করিডোরে ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেওয়া এই সাংবিধানিক অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট অবমাননা। উচ্চ আদালতের নিকট বিনীত প্রার্থনা—জনস্বার্থ রক্ষায় এই অমানবিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে মহামান্য হাইকোর্ট যেন একটি স্বতঃপ্রণোদিত রুল (Suo Moto Rule) জারি করেন এবং কেন এই হাসপাতালটি অবিলম্বে সচল করার নির্দেশ দেওয়া হবে না, তার কৈফিয়ত তলব করেন।
যদি জনবল সংকটই প্রধান বাধা হয়, তবে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ (In Aid to Civil Power) কাঠামোর অধীনে সরকার চাইলে সেনাবাহিনী বা বিমান বাহিনীর মেডিকেল কোরকে (AMC) এই সংকট নিরসনে সরাসরি নিয়োগ করতে পারে। পাবলিক হেলথ (ইমারজেন্সি প্রভিশনস) অর্ডিন্যান্স, ১৯৪৪-এর ৪ ও ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, সরকার জনস্বার্থ রক্ষায় যেকোনো চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্ব যেকোনো সক্ষম কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত করতে পারে। বর্তমান জরুরি অবস্থায় আর্মি মেডিকেল কোরের বিশেষজ্ঞ টিমকে দিয়ে তালাবদ্ধ হাসপাতালটি অন্তত অস্থায়ীভাবে চালু করা সম্ভব। এতে যেমন কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতির অবচয় কমবে, তেমনি সিন্ডিকেট বাণিজ্যের বলয় থেকে সাধারণ মানুষ মুক্তি পাবে।
রাজশাহী শিশু হাসপাতালের তালাবদ্ধ ফটকটি আজ আমাদের সামগ্রিক বিবেকের ওপর এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন। ৪৪টি ক্ষুদ্র কফিন যেন আমাদের নীতিনির্ধারকদের ঘুম ভাঙানোর জন্য যথেষ্ট হয়। আমরা চাই না আর কোনো নুসায়বার মৃত্যুর চার দিন পর তার বাবার কাছে সেই অভিশপ্ত ডাক আসুক। আমলাতান্ত্রিক দেয়াল ও আঞ্চলিক বৈষম্যের শৃঙ্খল ভেঙে দ্রুত এই হাসপাতালের ফটক খুলে দেওয়া হোক, রক্ষা পাক উত্তরবঙ্গের আগামীর ভবিষ্যৎ।
মো: শামীউল আলীম শাওন
লেখক, উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী
সভাপতি, ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস)
রাজশাহী।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে