৪০ বছরের ভোজিনিয়া: কেপ ভার্দের রূপকথার নায়ক
স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের আগে কেপ ভার্দের নামটা খুব বেশি আলোচনায় ছিল না। বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো খেলতে আসা ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটির সামনে ছিল ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল স্পেন। কাগজে-কলমে হিসাব বলছিল, ম্যাচটি একতরফা হওয়ারই কথা।
কিন্তু ৯০ মিনিট শেষে স্কোরবোর্ডে যখন ০-০, তখন ফুটবল বিশ্ব নতুন করে চিনতে শুরু করে একটি নাম—ভোজিনিয়া।
৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক যেন সেদিন একাই দাঁড়িয়ে ছিলেন স্পেনের আক্রমণের সামনে। একের পর এক শট, আক্রমণ আর সুযোগ—সবকিছুর জবাব দিয়েছেন অভিজ্ঞ দুই হাতে। বিশ্বকাপে অভিষেক ম্যাচেই কেপ ভার্দে যে ইতিহাস গড়ল, তার কেন্দ্রে ছিলেন এই মানুষটি।
ভোজিনিয়ার আসল নাম জোসিমার জোসে এভোরা ডায়াস। ১৯৮৬ সালের ৩ জুন কেপ ভার্দের মিন্ডেলো শহরে জন্ম তার। আজকের তারকাখ্যাতির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। দেশের স্থানীয় ক্লাব বাতুকে ও সিএস মিন্ডেলেন্সে থেকে ফুটবল জীবন শুরু করে ধীরে ধীরে আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন লিগে নিজের পরিচয় গড়েছেন তিনি।
অ্যাঙ্গোলার প্রোগ্রেসো, মলদোভার জিমব্রু কিশিনাউ, পর্তুগালের জিল ভিসেন্তে, সাইপ্রাসের এইইএল লিমাসোল এবং স্লোভাকিয়ার এএস ট্রেনচিন—বিভিন্ন দেশের ক্লাবে খেলতে খেলতে তিনি হয়ে উঠেছেন এক পরিণত গোলরক্ষক। বর্তমানে তিনি পর্তুগালের ক্লাব জিডি শাভেস-এর হয়ে খেলছেন।
জাতীয় দলের জার্সিতে তার যাত্রা শুরু ২০১২ সালে। তারপর থেকে প্রায় এক যুগ ধরে কেপ ভার্দের গোলপোস্টের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নাম তিনি। প্রায় ৯০ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে তিনি দেশের ইতিহাসে অন্যতম বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলার। শুধু একজন গোলকিপার নন, তিনি দলের ভাইস-ক্যাপ্টেন, নেতা এবং অনুপ্রেরণার উৎস।
আফ্রিকান ফুটবলেও তাঁর অবদান কম নয়। ২০১৩, ২০১৫, ২০২১ ও ২০২৩ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে (AFCON) কেপ ভার্দের হয়ে খেলেছেন। দেশটির প্রথমবারের মতো আফকন কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পেছনেও ছিল তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
তবে ভোজিনিয়ার গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টি লেখা হচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপে।
এটাই কেপ ভার্দের প্রথম বিশ্বকাপ। ছোট্ট এই দেশটি যখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে পা রাখল, তখন গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৪০ বছর বয়সী এক অভিজ্ঞ যোদ্ধা। স্পেনের বিপক্ষে তার অসাধারণ পারফরম্যান্স শুধু একটি পয়েন্ট এনে দেয়নি, বিশ্বকে দেখিয়েছে যে অভিজ্ঞতা কখনো পুরোনো হয় না।
কেপ ভার্দের গোলকিপিং বিভাগে অবশ্য শুধু ভোজিনিয়া নন, রয়েছে ভবিষ্যতেরও কিছু আশা।
২৯ বছর বয়সী মার্সিও রোসা বর্তমানে দলের দ্বিতীয় গোলরক্ষক। খুব বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ না খেললেও নিয়মিত স্কোয়াডে আছেন এবং কোচের আস্থাভাজন। আর সবচেয়ে আকর্ষণীয় নাম সিজে ডস সান্তোস। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় জন্ম নেওয়া এই ২৫ বছর বয়সী গোলরক্ষক যুক্তরাষ্ট্রের বয়সভিত্তিক দলেও খেলেছেন। পরে ফিফার অনুমোদন নিয়ে কেপ ভার্দের প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন। ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার এই তরুণ বর্তমানে এমএলএসের সান দিয়েগো এফসিতে খেলেন এবং অনেকের চোখে তিনি ভোজিনিয়ার উত্তরসূরি।
তবু আজকের কেপ ভার্দে দলকে দেখলে বোঝা যায়, গোলপোস্টের নিচে এখনো একজনই শেষ ভরসা—ভোজিনিয়া।
যখন প্রতিপক্ষ স্পেন, যখন গ্যালারিতে হাজারো দর্শক, যখন পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে মাঠের দিকে, তখনও তার চোখে ছিল না কোনো ভয়। ছিল শুধু দায়িত্ববোধ।
ফুটবল মাঝে মাঝে রূপকথা লিখে। কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ যাত্রার সেই রূপকথায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্রটির নাম—ভোজিনিয়া, ৪০ বছর বয়সী এক গোলরক্ষক, যিনি প্রমাণ করে চলেছেন যে স্বপ্নের কোনো বয়স হয় না।
মতামত দিন