Views Bangladesh Logo

ইসরায়েলি হামলায় গাজায় নিহত ছাড়াল ৬০ হাজার, ‘অঘোষিত দুর্ভিক্ষে’ আরও ১৪৭ জন

ত ২৪ ঘন্টায় গাজাজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় নিহত ১১৩ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ বিভিন্ন হাসপাতালে আনা হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন আগের হামলায় মারা যাওয়া একজনও। আহত আরও ৬৩৭ জনকে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হয়েছে।

এ নিয়ে ইসরায়েলি আগ্রাসনের ৬৬২তম দিনে এসে নিহতের সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়াল বলে জানিয়েছে হামাস নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তারা বলছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিহতের সংখ্যা ৬০ হাজার ৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আরও অন্তত এক লাখ ৪৫ হাজার ৮৭০ জন আহত হয়েছেন। এর অর্থ যে, ইসরায়েলি সেনারা দিনে কমপক্ষে ৯০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং প্রতি ৩৬ জন গাজাবাসীর একজন এই বর্বর আগ্রাসনে প্রাণ হারিয়েছেন।

অন্যদিকে জোরপূর্বক অনাহারে ৮৮ জন শিশুসহ ১৪৭ জনের মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরে একে ‘অঘোষিত অনানুষ্ঠানিক দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি’ বলে বর্ণনা করেছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা।

কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, প্রয়োজনীয় মানবিক সাহায্য পৌঁছে দিতে যুদ্ধে ‘সাময়িক বিরতির’ ঘোষণা দিয়েও গাজাজুড়ে বিমান ও ড্রোন হামলা এবং স্থল অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত এসব হামলায় নিহত হয়েছেন ৬২ জন ফিলিস্তিনি, যাদের ১৯ জন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) ত্রাণ কেন্দ্রগুলোতে খাবারের জন্য এসেছিলেন। উদ্ধার হওয়া বাকি ৫১ জনের মরদেহের মধ্যে ৫০ জন নিহত হন সোমবার (২৮ জুলাই) সন্ধ্যা থেকে রাতভরের হামলায়, যাদের ২৪ জন ত্রাণপ্রার্থী। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওই সময়কালে ইসরায়েলি আগের হামলার ধ্বংসস্তূপ থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।


এএফপি জানায়, ইসরায়েলি বিমান হামলায় গাজার কেন্দ্রীয় নুসাইরাত জেলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ৩০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরে বেশ কয়েকটি বেসামরিক বাড়ি লক্ষ্য করে হামলাগুলো সোমবার রাতভর ও মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত চলে।

খান ইউনিসের নাসের হাসপাতাল সূত্র জানায়, রাফাহের উত্তরে সাহায্যকেন্দ্রের কাছে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে মারা যান সাতজন ত্রাণপ্রার্থী। মধ্য গাজার নেটজারিম করিডরের কাছে সাহায্যের জন্য অপেক্ষারত আরও আটজন নিহত এবং ৩৮ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। অন্যদিকে আল-মাওয়াসিতে বাস্তুচ্যুতদের একটি তাঁবুতে বোমা হামলায় নিহত হন চারজন।

এ অবস্থায় খোদ ইসরায়েলি মানবাধিকার গোষ্ঠী বি’তসেলেম এবং ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, ইসরাইল গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে।

অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) সতর্ক করে দিয়েছে, ইসরায়েল সাহায্য প্রবেশে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করায় অবরুদ্ধ ও বোমাবর্ষণে উপত্যকাটিতে ‘দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’ দেখা দিচ্ছে। আইপিসির এই সতর্কতা ‘অনানুষ্ঠানিক দুর্ভিক্ষ ঘোষণা’ এবং এতে বলা হয়েছে, গাজা দুই বছর ধরে দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলী পরিস্থিতি সংকটকে ‘নাটকীয়ভাবে খারাপ’ করেছে এবং ‘উদ্বেগজনক ও মারাত্মক মোড়’ পেরিয়েছে।

গাজা সিটিতে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি ১০০ জন শিশুর মধ্যে ১৭ জনই তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে বলে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘গাজার বেশিরভাগ অঞ্চলে খাদ্যগ্রহণের জন্য দুর্ভিক্ষের সীমা পৌঁছেছে’। তাৎক্ষণিক ও বৃহৎ পরিসরে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, ‘এখনই পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে উপত্যকার বেশিরভাগ অংশে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটবে’। গাজা সরকারের গণমাধ্যম অফিসও জানায়, এখন অন্তত ৪০ হাজার শিশু মৃত্যুর মুখে পড়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য সংস্থার (ডব্লিউএফপি) পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকার আঞ্চলিক ব্যুরোর সিনিয়র আঞ্চলিক প্রোগ্রাম উপদেষ্টা রস স্মিথ বলেছেন, গাজায় যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে তা ‘এই শতাব্দীতে আমরা যা দেখেছি, তার চেয়ে আলাদা। এটি বিংশ শতাব্দীতে ইথিওপিয়া এবং নাইজেরিয়ার বিয়াফ্রায় দেখা দুর্ভিক্ষের কথা মনে করিয়ে দেয়’।

জাতিসংঘ সংস্থা ইউএন উইমেনের নির্বাহী পরিচালক সিমা বাহৌস জানান, গাজার দশ লাখ নারী ও মেয়ে খাদ্যের সন্ধানে অনাহারে থাকা অথবা তাদের জীবনের ঝুঁকি নেয়ার ‘অকল্পনীয় পছন্দের’ মুখোমুখি হচ্ছে। মানবিক সাহায্যের অবাধ প্রবেশাধিকার, বন্দিদের মুক্তি এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টে তিনি বলেছেন, ‘এই ভয়াবহতার অবসান হওয়া উচিত’।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় এক হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে ইসরায়েল সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে গাজার বিভিন্ন এলাকায়।

চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী দেশের চাপে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও ১৮ মার্চ থেকে ফের সামরিক অভিযান চালাচ্ছে আইডিএফ। দ্বিতীয় দফার এই অভিযানে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন আট হাজার ৯৮৬ জন ফিলিস্তিনি এবং আহত হয়েছেন ৩২ হাজার ০৪ জন।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ