Views Bangladesh Logo

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: তারুণ্য যেন তুরুপের তাস

রাজপথ থেকে ভার্চুয়াল; সাতচল্লিশ-বায়ান্ন-একাত্তর-নব্বইয়ের ইতিহাসের পৃষ্ঠা জুড়ে তারুণ্যের জয়ধ্বনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও সর্বত্র তরুণদের ভূমিকা ছিলো সর্বাধিক। দীর্ঘ সতেরো মাসের অপেক্ষার প্রহর শেষে হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরে এই প্রথম তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যপক উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে । বৃহৎ রাজনৈতিক দল গুলোও নতুন করে হিসাব কষতে বসেছে তরুণ ভোটারদের নিয়ে। তারুণ্য যেন তুরুপের তাস; তারুণ্য যার , সংসদ তার- ব্যাপরটা এমনই দাঁড়িয়েছে।


তরুণদের নিয়ে খোদ রাষ্ট্রপ্রধানও অত্যন্ত আশাবাদী।  'ভয়েস অব আমেরিকা' বাংলা বিভাগকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস উল্লেখ করেছেন, এবারের নির্বাচন তরুণদের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার উৎসব। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তরুণরা প্রায় ১০০ ভাগ ভোট দিয়ে দেশের ইতিহাসে এক নতুন নজির স্থাপন করবে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বিশ্লেষক সারা হক উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের তরুণ ভোটাররা এখন কোনো দলের অন্ধ ভক্ত নয়, বরং তারা প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি যথেষ্ট সংশয়ী। তারা নেতাদের অন্ধ অনুসারী হওয়ার চেয়ে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতেই বেশি আগ্রহী।’


নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ। এর মধ্যে জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী তরুণ ভোটার প্রায় চার কোটি ৩২ লাখ। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ইতোমধ্যে বিএনপির নির্বাচনী তফসিলে অগ্রাধিকার পেয়েছে তারুণ্যের চাহিদা। কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বিশেষ পলিসি করার কথাও জানান। তাদের ছাত্র শাখা, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল তরুণদের নিয়ে বিভিন্ন ক্যাম্পেন চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও এই দলের সমর্থকরা তারেক রহমানকে তরুণদের আইকন হিসেবে মনে করছে। তরুণ ভোটারদের টানতে বিএনপি স্লোগানও ঠিক করেছে, ‘তারুণ্যের প্রথম ভোট, ধানের শীষের পক্ষে হোক’।

গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া তরুণদের রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত 'এনসিপি'। এই দলের নেতা থেকে ভোটার উভয়ের বৃহৎ স্টেক হোল্ডার তরুণরা। তারাও তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য অনলাইন-অফলাইন উভয়েই বেশ সরব।


জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি তাদের পলিসি ডায়ালগে তরুণদের জন্য দক্ষ জনশক্তি ও কর্মসংস্থান কেন্দ্রিক বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন সফল হলেও তারা এখানেই থেমে থাকতে চান না। তারা তাদের এই জনপ্রিয়তাকে পুরো দেশে ছড়িয়ে দিতে চান।

আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচন ‘তরুণদের অনুভূতি’ জানতে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তরুণদের সাথে যোগাযোগ করেছে ‘ভিউজ বাংলাদেশ’।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এর বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির পাশাপাশি বিতর্কের অঙ্গনে বেশ সুপরিচিত নাম রুবিনা জাহান তিথী, পড়াশোনা করছেন দর্শন বিভাগে। জুলাই আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করেন। পূর্বের নির্বাচনী মাঠের পরিবেশ ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তার মধ্যে সন্দেহবাদীতা কাজ করতো। তিনি বলেন, ‘আগে নির্বাচন মানেই বিতর্ক ও আস্থাহীনতার কথা বেশি শোনা যেত। ২০২৪ সালের নির্বাচনে যদিও আমি ভোটার ছিলাম, তবে সেই বছর আমি ভোট দিতে যাইনি। কারণ সুষ্ঠ নির্বাচন নিয়ে আমার সংশয় ছিল।’

তবে ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতি ও প্রসাশনিক তৎপরতার নিয়ে তিনি বেশ আশাবাদী হলেও কিছু ক্ষেত্রে সঙ্কাও আছে তার। ভোট দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‌‌‘১২ ফেব্রুয়ারি আমি জীবনের প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছি। এবার প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও অংশগ্রহণ নিয়ে তুলনামূলক বেশি আলোচনা হচ্ছে। তবে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে, তা ভোটের দিনই বোঝা যাবে।’

নির্বাচনে নারী ভোটারদের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক হলেও বিভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপটে সিংহভাগ নারী ভোটরদের কাছে প্রার্থীরা পৌঁছাতে পারেন না। তিনি মনে করেন একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই নারীর সুরক্ষাসহ ভবিষ্যতের সুন্দর বাংলাদেশ উপহার দিতে পারে । এ তরুণ বলেন, ‘ইশতেহারে নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার সব দলই তুলে ধরে। কিন্তু বাস্তবায়ন ছাড়া এসব প্রতিশ্রুতি অর্থহীন। একটা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন ও নির্বাচনের পর নারীর সুরক্ষা সহ প্রার্থীদের দেওয়া সকল প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপায়নই আমার প্রত্যাশা।’

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলায় বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা ছিলো মাহবুব রাব্বানীর। তিনি বর্তমানে পড়াশোনা করছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি এর ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে। গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে তিনি খুবই আশাবাদী ছিলেন। রাব্বানী এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে জুলুম অন্যায় হ্রাস পাবে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশ নিয়ে তিনি খুবই হতাশ। মাহবুব রাব্বানী বলেন, ‘প্রশাসন, সচিবালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহ বিভিন্ন এজেন্সির অসহযোগিতা মূলক আচরণের কারণে, আমরা গণ-অভ্যুত্থানের ফসল ঘরে তুলতে পারিনি। অন্তবর্তীকালীন সরকারও এক্ষেত্রে উদাসীন ছিল।’ নিজ সংসদীয় আসন চাঁদপুর -৪ নিয়ে বলেন, ‘এখানে মোট ৮ জন প্রার্থী থাকলেও ২ জন প্রার্থীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গেছে। নির্বাচনী ইসতেহারে প্রার্থীরা সবাই উন্নয়নের কথা বললেও সামাজিক নিরাপত্তা, সুশাসনের প্রশ্নে সরব নয়। আমি কোন প্রার্থীর প্রতি বিশ্বাস করতে পারছি না।’

তবে হতাশ হলেও তিনি এখনো আশাবাদী ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়ে। তিনি নির্বাচনী ভোটে ‘হ্যাঁ ’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তবে প্রার্থী কাকে ভোট দিবেন সেটা এখনো তিনি নিশ্চিত হননি। তবে তিনি অবশ্যই একজন সৎ যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিবেন। এমনটাই জানান মাহবুব রাব্বানী।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এর ফাইন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী সাগর গাজী। এই প্রথম নির্বাচনে ভোট দিবেন। প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে উদগ্রীব তিনি। তবে প্রার্থী নির্বাচনে আরেকটু সময় নিতে চান জানিয়ে সাগর গাজী বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা, যার প্রধান কাজ হলো আইন প্রণয়ন করা, বাজেট অনুমোদন ও জনগণের পক্ষে সরকারের কাজের তদারকি বা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এই জন্য সংসদে আসুক সু- শিক্ষিত মানুষ।’ তিনি বলেন, ‘ এবারের নির্বাচনে যারাই জিতে সংসদে যাক তাদের যেন দেশ ও বহিঃর্বিশ্ব সম্পর্কে জ্ঞান থাকে।’ সাগর জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যারা মূর্খ, উগ্র, দুর্নীতিবাজ ও 'বেগম পাড়ায়' বাড়ি বানানোর ধান্দায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন করছে জনগণ যেন তাদেরকে বয়কট করে।’

রাজধানীর ফার্মগেট এলকায় কথা হয় মামুনের সঙ্গে। তার বয়স ২৭। বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছেন ড্রাইভিং শিখতে। গ্রামের বাড়ি রংপুরে। গত নির্বাচনে তিনি প্রথম ভোট দিয়েছেন। তবে গতবারের ভোটের তুলনায় এইবারের ভোট নিয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত। গত নির্বাচনে ফলাফল পূর্বানুমান করতে পারলেও এই নির্বাচনে তিনি সেটা করতে পারছেন না। তবে তার মতে, নির্বাচনের আমেজ গত নির্বাচনের মতো পাওয়া যাচ্ছে না। তখন চতুর্দিকে নির্বাচনী ব্যানার ফেস্টুন থাকায় সেটা আলাদা নির্বাচনী আবহ তৈরি করে। এছাড়া নির্বাচন নিয়ে মাইকের প্রচারণা, গান নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নির্বাচনী ছুটিতে বাড়িতে গিয়ে ভোট দেওয়ার ইচ্ছে আছে বলেও জানান তিনি। কাকে ভোট দিবেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, তারা বন্ধুরা একত্রে ভোট কেন্দ্রে যাবে। তখন সবাই মিলে যাকে ঠিক করবে তাকেই ভোট দিবেন তিনি।

সেলিনা শিফা, পড়াশোনা করছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস এর বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। তিনি এখনো কোন রাজনৈতিক দলকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। এছাড়া রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়েও তিনি তেমন সন্তুষ্ট নন। তবে এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে তিনি বেশ আশাবাদী। তিনি জানান, ‘যিনিই ক্ষমতায় আসুক বা সংসদে প্রতিনিধি হয়ে আসুক, তাকে অবশ্যই 'ইনসাফ' বা ন্যায়বিচারের পক্ষে থাকতে হবে। কোনো সাধারণ নাগরিক বা ব্যক্তি যে দলেরই সমর্থক হোক না কেন, তার সঙ্গে যেন সর্বদা ইনসাফ করা হয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কোনো নিরপরাধ মানুষের যেন বিন্দুমাত্র ক্ষতি না হয়, সেটি নিশ্চিত করা। এছাড়া ভবিষ্যত বাংলাদেশ বিনির্মানে তিনি প্রশাসনের কঠোর নজরদারির হস্তক্ষেপ কামনা করেন।


রাজপথের লড়াই থেকে ব্যালট পেপারের লড়াই—তারুণ্যের এই রূপান্তরই বলে দিচ্ছে আগামীর বাংলাদেশ কোন পথে যাবে। রুবিনা, রাব্বানী কিংবা সাগরের মতো কোটি তরুণ আজ কেবল ভোটার নন, তারা একেকজন অতন্দ্র প্রহরী। বিগত দেড় দশকের আক্ষেপ আর জুলাইয়ের রক্তঝরা ইতিহাস বুকে নিয়ে তারা এবার কেন্দ্রে যাবেন। রাজনৈতিক দলগুলোর গালভরা ইশতেহার আর ডিজিটাল ক্যাম্পেইন তাদের কতটুকু আশ্বস্ত করতে পারবে, তা ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেলেই পরিষ্কার হবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—তরুণদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই হতে পারে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের নতুন এক মাইলফলক। এখন দেখার বিষয়, তুরুপের তাস এই তারুণ্য শেষ পর্যন্ত কার হাতে তুলে দেয় দেশের চাবিকাঠি।



মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ