গাছ কেটে, ডাস্টবিন রাস্তায় ফেলে ছেলেরা ট্যাঙ্ক আটকানোর চেষ্টা করেছে: কামাল লোহানী।
কামাল লোহানীর পুরো নাম আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। তিনি একাধারে দেশবরেণ্য সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও রাজনীবিদ। কামাল লোহানীর সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয় দৈনিক মিল্লাত’এ। এরপর তিনি যোগ দেন সংবাদ’ এ। এই পত্রিকাতে সিনিয়ার সাব-এডিটর হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি শিফট ইন-চার্জ হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৬৯ সালে কিছু দিনের জন্য যোগ দেন পয়গাম’এ। এরপর কামাল লোহানী দৈনিক অবজারভার গ্রুপের পাবলিকেশন দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকাতে যোগ দেন। তিনি এই পত্রিকার শিফট ইন-চার্জ ছিলেন। এই সংবাদপত্রে কাজ করার সময় তিনি ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউন খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেনে। পরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। আসুন তাঁর কাছ থেকে জানার চেষ্টা করি বিভীষিকাময় সেই রাতের কথা। এই সাক্ষাৎকারটি ২০১৮ সালে মার্চ মাসে কামাল লোহানীর ধানমন্ডির বাসায় নেওয়া। ২০২০ সালের ২০ জুন কামাল লোহানী মারা যান।
রাহাত মিনহাজ: শুরুতেই একটু জানতে চাই ১৯৭১ সালে আপনি কোন পদে, কোন পত্রিকায় কাজ করতেন?
কামাল লোহানী: আমি ১৯৭১ সালে দৈনিক পূর্বদেশ এ চিফ সাব-এডিটর ছিলাম। ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর আমাদের নিউজ এডিটর ইহতেশাম আহমেদ চৌধুরী পরিবারের সদস্যদের অন্য জায়গায় রেখে আসার কিছু দিনের জন্য ঢাকা ছেড়ে গিয়েছিলেন। ওই সময় আমাকে নিউজ এডিটরের দায়িত্বও দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু আমি ওই দায়িত্ব নেইনি। আমি ও আ. ন. ম. গোলাম মোস্তফা সংবাদপত্রের কর্তৃপক্ষকে বলেছিলাম, আমাদের নিউজ এডিটর আছেন। উনি আসবেন ডেফিনিটলি। সুতরাং আমার দায়িত্ব নিয়ে আর কোন প্রশ্ন আসে না।
এই সময় আরেকটা জিনিস আমি বলি। আমি তখন পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। সেই হিসেবে নন-কোঅপারেশন মুভমেন্টের সময় আমাদের দেশী-বিদেশী সমস্ত সাংবাদিকদের আমাদের ইউনিয়ন থেকে আইডেন্টিফিকেশন কার্ড দিয়েছিলাম। যাতে পুলিশ তাদেরকে আইডেন্টিফাই করতে পারে জার্নালিস্ট হিসেবে।
আপনার সংবাদপত্র নিয়ে একটু জানতে চাই। দৈনিক পূর্বদেশ তো তখন প্রথম সারির সংবাদপত্র?
পত্রিকাটার যেখানে জন্ম নোয়াখালীতে। প্রথমে এটি সাপ্তাহিক ছিল। পরে যখন এটা ১৯৬৯ সালে দৈনিক হয়। এই নামটা দিয়েছিলেন কামরুল হাসান সাহেবের ছোটভাই বদরুল হক। উনিও সাংবাদিক ছিলেন এবং কাজী রহমান ইদ্রিস ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে কাজ করতেন। পরে যখন দৈনিক হলো তখন হাজী মোহম্মদ ইউসুফ সাহেব যোগদান করেছিলেন। বদরু ভাই জয়েন করেননি, তিনি তখন কলেজে চাকরি করেন। আমরা যে মানুষগুলো ওখানে ছিলাম তারা খুবই ডেডিকেটেডভাবে কাজ করেছি।
২৫ মার্চ কালরাতের কথায় আসতে চাই। ওই রাতে আপনি কোথায় ছিলেন, কীভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন অপারেশান সার্চলাইট?
তখন সেন্ট্রাল আইএসপিআরের পরিচালক ছিলেন একজন ব্রিগেডিয়ার। উনি ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি, বিহারি। সেই ব্রিগেডিয়ার অবজারভার অফিসে আসলো। এসে আমাদের বললো স্বাধীনতার জন্য তোমরা তৈরি হয়ে যাও। সে সময় মূসা ভাই, কে.জি. ভাই ও আমি ছিলাম। আমার পশ্চিম পাকিস্তানি ঘনিষ্ট বন্ধু আসরার আহমেদ সে ছিল। সে তখন ইউপিআই (ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল) এর পাকিস্তান প্রতিনিধি ছিল। আমাদের সবার সাথে আলাপচারিতায় ব্রিগেডিয়ার বলে গেলেন, তোমরা তো স্বাধীন হয়ে যাবে, আমাদের কি হবে? আমরা যারা বিহারি আমরা তো শরণার্থীই থেকে যাবো। এর পরে আমরা সবাই খুব উদ্বিগ্ন। হঠাৎ করে খবর আসলো ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ওদিক থেকে কে যেনো টেলিফোন করে জানালো ক্র্যাকডাউন হবে, ট্যাংক নেমে গেছে। তখন বোধ হয় রাত বারোটা বেজে গেছে।
এরপর আপনারা কি দেখলেন?
আমরা দেখলাম প্রেসক্লাবের সামনে দিয়ে একটা ট্যাংক এসে দৈনিক পাকিস্তান এর সামনে দাঁড়ালো। কারণ ওখানে ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে মানুষ। সমস্ত পাড়া মহল্লায় মানুষ ব্যারিকেড দিচ্ছে। ব্যারিকেড দিচ্ছে কংক্রিটের চাক দিয়ে, গাছ কেটে, ডাস্টবিন রাস্তার উপরে রেখে আরো বিভিন্ন ভাবে, যাতে ট্যাংক আসতে না পারে। ওরা এসে ওগুলো সরিয়ে রাস্তাটা ফাকা করে নিল। তারপর ওখান থেকেই চতুর্দিকে যেখানে যেখানে ফায়ার করা দরকার সেখানে করলো। তারা দেখলো ফকিরাপুলে পানির ট্যাংকির উপরে একটা জয় বাংলা পতাকা উড়ছে। পতাকাটা খুব বড় ছিল না। ওরা অনেকগুলো ফায়ার করল কিন্তু কিছু করতে পারলো না।
আপনি কি এসব অফিস থেকেই দেখছিলেন?
পূর্বদেশ এর অফিসের যে জায়গাটা বেশ খালি ছিল। পাশে কোনো বিল্ডিং ছিল না। আর অফিস মেইন রাস্তার পাশেই। সুতরাং রাস্তায় কি ঘটছে না ঘটছে সবই আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম। আমাদের লম্বা একটা বারান্দা ছিল নিউজ সেকশন এবং এ্যাডমিনিস্ট্রেশন সেকশন মিলে। এই বারান্দায় দাঁড়ালে বাম পাশের রাস্তায় কী চলেছ তা দেখা যায়। আমরা দেখলাম যে সমস্ত লোকজন রাস্তায় নেমে ব্যারিকেড দেওয়ার চেষ্টা করছে।
আমরা চতুর্দিক থেকে ক্র্যাকডাউনের খবর পাচ্ছিলাম। রাজারবাগে আগুন দিয়েছে। আমরা আমাদের অফিসের ছাদের উপর উঠলাম। কারণ রাজারবাগের পাশেই আমার বাসা, আমার বাসার কী অবস্থা হলো একটু দুঃচিন্তা ছিল। এদিকে পিলখানাতে ওরা হামলা করেছে। এই সমস্ত খবর গুলো আমরা পাচ্ছিলাম।
আর কি ঘটছিল ওই রাতে?
তখন বোধ হয় রাত সাড়ে এগারোটা। কাজকর্ম শেষ হয়ে গেছে, পরের দিন পত্রিকা বের হবে না এটা আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছি। এরমধ্যে একবার আমি ড. ফজলে রাব্বির সাথে একটু টেলিফোনে কথা বললাম। রাব্বির বাড়ি পাবনা। আমার চিকিৎসা, আমার পরিবারের চিকিৎসাও সে করতো। সেই সুবাদে আমি তাকে টেলিফোন করলাম। টেলিফোন করতেই সে বললো, ‘লোহানী সাহেব চিন্তা করবেন না। আমাদের ছেলোরও রিয়েক্ট করতে শিখেছে। তারা জবাব দিচ্ছে।’ এই যে কথা গুলো বলছে সে সিদ্ধেশ্বরী থেকে। তার মানে মৌচাক, খিঁলগাও ওই এলাকায় যে প্রতিরোধ চলছে সেটা সে দেখতে পেয়েছে। এরপর কথা বলতে বলতেই হঠাৎ করে টেলিফোনটা কেটে গেলো।
ওই রাতে আর কী করেছিলেন?
আমি বদরুন্নেসা আহমেদ কে ফোন করেছিলাম। তিনি বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের পাশের বাড়িদে থাকতেন। আমি তাঁকে বঙ্গবন্ধুর অবস্থা কী জিজ্ঞাসা করি? বদরুন্নেসা আহমেদ বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু ভালো আছেন।’ তারপর ওই লাইনও কেটে গেল। তারপরে দেখলাম টেলিফোন, টেলিগ্রাম, টেলিপ্রিন্টার-সব অফ হয়ে গেলো। কারফিউ জারি হয়ে গেছে।
আপনার অন্যান্য সাংবাদিক সহকর্মী তারা কে কেমন ছিলেন?
এখানে সিনিয়র সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ ভাইয়ের কথা বলতে হয়। পঁচিশে মার্চে ক্র্যাকডাউনের সময় ফয়েজ ভাই তার বাসায় ছিলেন না। উনি প্রেসক্লাবে চলে আসেন। ভেবেছিলেন প্রেসক্লাব নিরাপদ জায়গা। দোতলায় সোফার শুয়ে ছিলেন। কিন্তু রাতে প্রেসক্লাবে শেলিং হলো। তাতে তিনি আহত হলেন। পরের দিন সকালে ডাক্তারের কাছে সেবা নিয়ে বাড়ি চলে গেলেন। প্রেসক্লাবেই কেউ মারা যায়নি। পরবর্তীকালে সাংবাদিক অনেক কয়জন মারা গেছে। সাংবাদিক শহীদ সাবের সাহেব মারা গেছিলেন সংবাদ অফিসেই। আর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল দ্য পিপল এর অফিস। অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে সাংঘাতিক হেডিং দিয়েছিল দ্য পিপল এর আবিদুর রহমান। আমি জানিনা কৌশল না করে তিনি বোকামি করেছিলেন কিনা, আই ডোন্ট নো। কিন্তু আবিদুর রহমান একটা গার্ডস এর পরিচয় দিচ্ছিলেন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে এই ধরনের একটা বোমা বর্ষণ করা শব্দের মাধ্যমে।
এরপর আপনি কি করলেন, আপনিতো পরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিয়েছিলেন...
২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর গেলাম শ্রীনগরে। যাওয়ার পথে হঠাৎ করে ফয়েজ ভাই ডাকলো দোতলা থেকে। ওনাদের বাসাটা ছিল শ্রীনগর থানার পাশে নাগরহাট গ্রামে। উনি জিজ্ঞাসা করলেন লোহানী কোথায় যাচ্ছেন? বললাম যে ওপার যাবো। তো বললো যে আপনি যাবার সময় একটু যোগাযোগ করে যাবেন, আমরা একসঙ্গে যাব।
পরে আমি, ফয়েজ ভাই মিলে প্রায় এগারো জন একসাথে ভারতের ত্রিপুরা যাই। পরে কলকাতায় গিয়ে ২২শে মে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে যাই। সেখানে বাংলাদেশ মিশনের সামনে থেকে আমাকে আমিনুল হক বাদশা প্রায় ধরে নিয়ে গেল নতুন এক জায়গায়। সেটা ছিল কলকাতার বালিগঞ্জের সার্কুলার রোড। সেখান থেকেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু হয়েছিল ২৫ মে ১৯৭১ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে। আমি ছিলাম নিউজের দায়িত্বে। (শেষ)

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে