Views Bangladesh Logo

‘সবচেয়ে জঘন্য’ ভিএফএক্স দেখতেই ভিড়, ২৪ হাজার টাকার সিনেমা আয় করলো ৩৭ কোটি

সাধারণত সিনেমা ব্যবসাসফল করতে নির্মাতারা নির্ভর করেন উন্নত প্রযুক্তির ভিএফএক্স, চোখধাঁধানো অ্যানিমেশন আর মোটা অঙ্কের বাজেটের ওপর। কিন্তু চীনের একটি সিনেমার ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো ঘটনা। ‘নিউ লাই’ নামের এই অ্যানিমেটেড সিনেমাটি এতটাই নিম্নমানের অ্যানিমেশন ও দৃশ্যধারণের জন্য সমালোচিত হয়েছে যে, সেই সমালোচনাই শেষ পর্যন্ত সিনেমাটিকে রাতারাতি বক্স অফিসে ব্লকবাস্টারে পরিণত করেছে।

গত ৫ আগস্ট চীনে মুক্তি পাওয়া ৮৬ মিনিটের এই অ্যানিমেটেড সিনেমাটি একটি সদ্য জন্ম নেওয়া বাছুর ও একটি চড়ুই পাখির সম্পর্ক নিয়ে তৈরি, যা এক অদ্ভুত, স্বপ্নময় কাহিনির মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছে। মুক্তির পর প্রথম দিকে কোনো প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই সিনেমাটি একরকম ব্যর্থতার মুখেই পড়েছিল। মুক্তির প্রথম ১০ দিনে সিনেমাটি আয় করে মাত্র সাত হাজার সাতশ ইউয়ানের মতো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় এক লাখ টাকা), আর টিকিট কিনেছিলেন সারা দেশে মাত্র কয়েকশ দর্শক।

কিন্তু এরপরই বদলে যায় দৃশ্যপট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিনেমাটির খণ্ড খণ্ড ক্লিপ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে দর্শকেরা এর নিম্নমানের থ্রিডি গ্রাফিকস, কাঠখোট্টা চরিত্র-নড়াচড়া, দুর্বল ডাবিং আর দুর্বোধ্য কাহিনি নিয়ে ব্যাপক ট্রল করতে শুরু করেন। কেউ কেউ একে তুলনা করেন সাধারণ ছাত্রদের বানানো প্রজেক্টের সঙ্গে, আবার কেউ বলেন- এটি ‘এআইয়ের চেয়েও খারাপ’। অনেকেই একে ২০২৬ সালের ‘সবচেয়ে বাজে সিনেমা’ বলেও আখ্যা দেন। তবে এই তীব্র সমালোচনাই কাল হয়ে দাঁড়ায় বিপরীত ফল বয়ে আনার; সিনেমাটি আসলেই কতটা বাজে, তা নিজের চোখে দেখতে দর্শকেরা হলমুখী হতে শুরু করেন।

চীনের টিকিট-ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম মাওইয়ানের তথ্য অনুযায়ী, সিনেমাটি এরই মধ্যে এক কোটি ৪৯ লাখ ইউয়ানেরও বেশি আয় করে ফেলেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪ কোটি টাকার কাছাকাছি। অথচ সিনেমাটির নির্মাণ বাজেট ছিল মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার ইউয়ান, বাংলাদেশি টাকায় যা দাঁড়ায় মাত্র হাজার তিরিশেক থেকে চল্লিশেক টাকার মতো। এই আকস্মিক ব্যবসায়িক সাফল্য সিনেমাটিকে নিয়ে গেছে ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ ও মার্ভেলের ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’-র মতো বিশাল বাজেটের হলিউড সিনেমার পাশাপাশি চীনের বক্স অফিস তালিকায়।

সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন মূলত মা-ছেলের একটি দল। পরিচালক শিন ইউমেং ও তার মা সান লিফাং, যারাই লেখা, পরিচালনা, প্রযোজনা থেকে শুরু করে কণ্ঠাভিনয় পর্যন্ত প্রায় সবকিছুই নিজেরা করেছেন। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে তারা এই সিনেমাটি তৈরি করেন। প্রযোজনা সংস্থাটির নাম দালিয়ান জিংইউয়ান কালচার ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন মিডিয়া, যা এর আগে একটি ইন্টেরিয়র ডিজাইন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করত।

চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম বেইজিং নিউজে প্রকাশিত এক মন্তব্য প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই সিনেমা দর্শকদের প্রত্যাশার মান নামিয়ে দিয়েছে এবং প্রেক্ষাগৃহগুলো যদি মানহীন সিনেমা প্রদর্শন করে নিজেদের মান কমিয়ে ফেলে, তাহলে তারা দর্শকদের আস্থা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। প্রতিবেদনে প্রেক্ষাগৃহগুলোকে ‘দ্বাররক্ষী’র ভূমিকা পালন করে এমন মানহীন সিনেমা প্রত্যাখ্যান করার আহ্বানও জানানো হয়। এদিকে সিনেমাটির পরিবেশক জানিয়েছেন, সিনেমাটি মুক্তি না দেওয়ার পরামর্শ পাওয়া সত্ত্বেও পরিচালকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে তিনি তা মুক্তি দিয়েছিলেন। কিছু প্রতিবেদনে আবার দাবি করা হয়েছে, প্রযোজনা সংস্থা সিনেমাটি বর্তমানে প্রত্যাহারও করে নিয়েছে।

সব মিলিয়ে ‘নিউ লাই’-এর এই ঘটনা প্রমাণ করেছে, স্বল্প বাজেটের কোনো সিনেমা কেবল ‘খারাপ’ হওয়ার কারণেও রাতারাতি বাণিজ্যিক সাফল্যের মুখ দেখতে পারে; চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে যা একটি বিরল ও চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
















সিনেমা হিট করার জন্য সাধারণত উন্নত প্রযুক্তির ভিএফএক্স, চোখধাঁধানো অ্যানিমেশন ও মোটা অঙ্কের বাজেটের ওপর নির্ভর করেন নির্মাতারা। তবে সম্প্রতি ‘নিউ লাই’ নামের একটি সিনেমার ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো ঘটনা। অ্যানিমেশন ও ভিএফএক্সের চরম নিম্নমানের কারণেই সিনেমাটি রাতারাতি বক্স অফিসে ঝড় তুলে ব্লকবাস্টার হয়ে গেছে।

চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ‘নিউ লাই’ সিনেমাটির ভিএফএক্স প্রযুক্তি চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য ও নিম্নমানের। তবে এই দৃশ্যধারণ কতটা খারাপ কিংবা দেখতে ঠিক কতটা অদ্ভুত হতে পারে—সাধারণ দর্শকদের মাঝে সেই কৌতূহল তীব্র আকার ধারণ করে। মূলত সিনেমার এই অবিশ্বাস্য নিম্নমান স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করতেই দর্শক হলে ও বিভিন্ন মাধ্যমে ছবিটি দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন।

বাজেট ও আয়ের আর্থিক হিসাবেও সিনেমাটি সবাইকে চমকে দিয়েছে। সিনেমাটি নির্মাণে খরচ হয়েছিল মাত্র ২৪ হাজার টাকা। অথচ নেতিবাচক কৌতূহলকে পুঁজি করে বিশ্বজুড়ে এটি ইতোমধ্যে আয় করে ফেলেছে প্রায় ৩৭ কোটি ৮৮ হাজার টাকা!

স্বল্প বাজেটের কোনো কাজ কেবল খারাপ হওয়ার কারণেই কীভাবে রাতারাতি ব্যবসার মুখ দেখতে পারে, সিনেমা জগতের ইতিহাসে 'নিউ লাই' এখন তার এক অন্যতম উদাহরণ।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ