বিশ্বে হাম পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র বাংলাদেশে: রয়টার্সের প্রতিবেদন
একসময় হাম নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন, টিকা সরবরাহে ঘাটতি এবং কর্মসূচির দুর্বলতার কারণে এখন ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ। মার্চে নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯-এ পৌঁছেছে। রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৬১ জন শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়েছে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের হাম। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৫৯ জন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৫০ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
মৃতদের মধ্যে ৮৯৯ জনের মৃত্যু হামের উপসর্গ নিয়ে হয়েছে, আর পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ১০০ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ফলে সম্মিলিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯৯-এ। এই পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তালিকাতেও বাংলাদেশের এই প্রাদুর্ভাবকে বিশ্বে সবচেয়ে বড় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায় বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রাদুর্ভাবের শুরুতে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল এই বয়সী শিশু। আবার নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা নিয়মিত হাম টিকার আওতায় আসার আগেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছে। টিকাদানে তৈরি হওয়া এই ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত এক দশকে হাম প্রতিরোধে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। কোভিড-১৯ মহামারির সময় কিছুটা ব্যাঘাত ঘটলেও অধিকাংশ সময়ে হাম টিকার আওতা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা ৯৫ শতাংশের কাছাকাছি বা তার ওপরে ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় সেই অগ্রগতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সংকট মোকাবিলায় সরকার গত এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও পরে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি কর্মসূচি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি আগে টিকা না পাওয়া শিশুদের জন্য ‘ক্যাচ-আপ’ কর্মসূচিও প্রয়োজন।
এদিকে হাম প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রকোপও বাড়ায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছিল। ফলে একদিকে হাম আক্রান্ত বিপুলসংখ্যক শিশু, অন্যদিকে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হাসপাতালগুলোতে শয্যা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালেও হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বাড়ছে। কোথাও নির্ধারিত শয্যার চেয়ে রোগী কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় মেঝেতে রেখেও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। শিশুদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় স্যালাইনের ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে। এর ফলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগীদের স্বজনরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, নিয়মিত কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি না করলে প্রাদুর্ভাবের প্রভাব আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। দুই ডোজ হাম টিকা এই অত্যন্ত সংক্রামক রোগ থেকে কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন।
মতামত দিন