Views Bangladesh Logo

বিশ্বে প্রথম লাইভ এআইয়ের সহায়তায় মস্তিষ্কের টিউমার অপসারণ

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

বিশ্বে প্রথমবারের মতো অস্ত্রোপচারের সময় সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তা নিয়ে মস্তিষ্কের টিউমার অপসারণ করেছেন চিকিৎসকেরা। যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ন্যাশনাল হসপিটাল ফর নিউরোলজি অ্যান্ড নিউরোসার্জারিতে করা এই অস্ত্রোপচারে এআই প্রযুক্তি লাইভ ভিডিও বিশ্লেষণ করে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু ও রক্তনালির অবস্থান শনাক্ত করতে সার্জনদের সহায়তা করে। সফল অস্ত্রোপচারের পর রোগীর দৃষ্টিশক্তিও রক্ষা পেয়েছে।

এই ঐতিহাসিক অস্ত্রোপচারের রোগী ৪৮ বছর বয়সী রিস হিবার্ট। বেডফোর্ডশায়ারের বাসিন্দা হিবার্ট পেশায় কাস্টমার সার্ভিস ম্যানেজার। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাঁটার সময় হঠাৎ অচেতন হয়ে খিঁচুনিতে আক্রান্ত হওয়ার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার পিটুইটারি গ্রন্থিতে প্রায় ১১ মিলিমিটার আকারের একটি টিউমার শনাক্ত হয়। সময়ের সঙ্গে টিউমারটি তার দৃষ্টিশক্তির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করলে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের আশঙ্কা ছিল, চিকিৎসা না হলে একপর্যায়ে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারেন।

অস্ত্রোপচারটি চলতি বছরের মে মাসে করা হলেও এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে সম্প্রতি। এ সময় এআই সিস্টেমটি এন্ডোস্কোপের মাধ্যমে ধারণ করা অস্ত্রোপচারের সরাসরি ভিডিও বিশ্লেষণ করে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগুলো শনাক্ত করে। বিশেষ করে টিউমারের কাছাকাছি থাকা রক্তনালি ও দৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুগুলো চিহ্নিত করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলতে চিকিৎসকদের সহায়তা করে প্রযুক্তিটি। পিটুইটারি গ্রন্থির আশপাশে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও স্নায়ু খুব কাছাকাছি থাকায় মাত্র এক মিলিমিটার ভুলও গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

এআই ব্যবহারের একটি বিশেষ দিক হলো, এটি অস্ত্রোপচারের আগের স্ক্যানের ওপর নির্ভর করেনি। বরং অপারেশন চলাকালীন সরাসরি ভিডিও বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়েছে। প্রযুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক কাঠামো রঙের মাধ্যমে আলাদা করে দেখাতে পারে। গবেষকেরা আগে করা শত শত পিটুইটারি টিউমার অস্ত্রোপচারের ভিডিও ব্যবহার করে এআই ব্যবস্থাটিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ফলে বিভিন্ন রোগীর শারীরিক গঠনের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে অস্ত্রোপচারের সময় গুরুত্বপূর্ণ অংশ শনাক্ত করার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।

তবে অস্ত্রোপচারের নিয়ন্ত্রণ এআইয়ের হাতে ছিল না। চিকিৎসকেরাই পুরো প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত ও নিয়ন্ত্রণে ছিলেন, আর এআই কাজ করেছে এক ধরনের অতিরিক্ত সহকারী হিসেবে। গবেষকদের ভাষায়, এটি একজন বিশেষজ্ঞের ‘দ্বিতীয় জোড়া চোখের’ মতো কাজ করতে পারে। প্রযুক্তিটি অস্ত্রোপচারের যন্ত্রের গতিবিধি এবং যন্ত্র ও টিস্যুর পারস্পরিক অবস্থানও শনাক্ত করতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও জটিল অস্ত্রোপচারে চিকিৎসকদের সহায়তা করতে পারে।

অস্ত্রোপচারের পর দ্রুতই হিবার্টের দৃষ্টিশক্তির উন্নতি ঘটে। এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি চশমা বা লাঠির সহায়তা ছাড়াই হাঁটতে সক্ষম হন এবং পরে কাজে ফিরেছেন। তার ভাষ্য, অস্ত্রোপচারের পর ঘুম থেকে উঠে তিনি আগের তুলনায় অনেক পরিষ্কার দেখতে পান। বর্তমানে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন তিনি এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরছেন।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের হকস ইনস্টিটিউটের তৈরি এই এআই প্রযুক্তি নিয়ে আরও বড় পরিসরে গবেষণা চালানোর প্রস্তুতি চলছে। জাতীয় স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং গুগলের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণায় প্রযুক্তিটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। গবেষকদের লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যা অস্ত্রোপচারের সময় সার্জনদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ সহকারীর মতো তথ্য ও পরামর্শ দিতে পারবে। তবে চিকিৎসাক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে রোগীর নিরাপত্তা ও যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ