আজ বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস, ধোঁয়ার মায়াজালে জীবনের নিঃশব্দ পরাজয়
আজ ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। তামাক ও নিকোটিনজাত পণ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এসব পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উদ্যোগে ১৯৮৮ সাল থেকে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। তামাকজনিত রোগ, অকালমৃত্যু এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
বিশ্বজুড়ে তামাক সেবনের কারণে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হন এবং অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ঘটে। ফুসফুসের ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসতন্ত্রের নানা জটিলতাসহ অসংখ্য প্রাণঘাতী রোগের অন্যতম কারণ তামাক। শুধু ধূমপায়ীই নন, পরোক্ষ ধূমপানের শিকার ব্যক্তিরাও এর ক্ষতিকর প্রভাবের মুখোমুখি হন। তাই তামাক নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘আনমাস্কিং দ্য অ্যাপিল: কাউন্টারিং নিকোটিন অ্যান্ড টোব্যাকো অ্যাডিকশন’ (প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি)। প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে বিশেষ করে তরুণ ও কিশোরদের লক্ষ্য করে তামাক ও নিকোটিনজাত পণ্যের আকর্ষণীয় বিপণন কৌশলের আড়ালের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি থেকে মানুষকে দূরে রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার বর্তমানে এক চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ সরাসরি তামাক ব্যবহার করেন। তামাকজনিত বিভিন্ন মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, তামাক উৎপাদন ও ব্যবহারের ফলে স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। বিস্ময়কর তথ্য হলো, তামাক খাত থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আয় করে, ক্ষতির এই পরিমাণ তার দ্বিগুণেরও বেশি। এছাড়া তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের ফলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা।
আবাদযোগ্য জমির সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তামাক চাষে ব্যবহৃত জমির পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে ১৩তম অবস্থানে রয়েছে। টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্যমতে, দেশে প্রায় ৩১ শতাংশ বন নিধনের জন্য তামাক চাষ দায়ী। বিশেষ করে কক্সবাজার ও বান্দরবান এলাকায় তামাক পাতা শুকানোর কাজে বছরে প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি কাঠ পোড়ানো হচ্ছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী অন্তত ৩ কোটি ৭০ লাখ কিশোর-কিশোরী নিয়মিত তামাক ব্যবহার করে। তামাক কোম্পানিগুলো সুগন্ধিযুক্ত পণ্য, ই-সিগারেট ও ভেপিংয়ের মাধ্যমে তরুণদের এই নেশায় আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যবহার করে এই মরণনেশার প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সুস্থ ও সবল জাতি গড়তে হলে ই-সিগারেট ও ভেপিংসহ সব ধরনের তামাকজাত পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
মতামত দিন