Views Bangladesh Logo

মার্কেটিংয়ে এআই ও মানুষের সমন্বয়ের বার্তায় ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং ফোরাম

মার্কেটিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দায়িত্বশীল ব্যবহার নিয়ে দুই দিনব্যাপী আলোচনার মধ্য দিয়ে রাজধানীর ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং ফোরাম ৬.০। এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইন মার্কেটিং: হিউম্যান + টেক’। এতে দেশি-বিদেশি মার্কেটিং পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, সরকারি প্রতিনিধি ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।

ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির সৌজন্যে এবং এসিআই মটরস লিমিটেডের সঞ্চালনায় আয়োজিত এ ফোরামের আহ্বায়ক ছিল ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিল। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ও ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের অংশীদারত্বে আয়োজনটির কো-হোস্ট ছিল বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম।

আন্তর্জাতিক এ আয়োজনের ষষ্ঠ আসর এবার বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়। দুই দিনের আলোচনায় গুরুত্ব পায় মানুষের অন্তর্দৃষ্টি, নৈতিকতা ও ভোক্তার আস্থা বজায় রেখে মার্কেটিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়টি। আলোচকদের মধ্যে ছিলেন আধুনিক মার্কেটিংয়ের জনক হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক ফিলিপ কটলার।

আয়োজনের স্বাগত বক্তব্য দেন ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিল ও মার্কেটিং সোসাইটি অব বাংলাদেশের (এমএসবি) সেক্রেটারি জেনারেল এবং বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের গ্রুপ সিইও ও এক্সিকিউটিভ এডিটর সাজিদ মাহবুব। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রাহককে সেবা দেওয়ার ধরন বদলে দিচ্ছে, তবে মার্কেটিংয়ের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে মানুষই। প্রযুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে ভবিষ্যৎ গড়তে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মুজিবুল হক। তিনি আন্তর্জাতিক অতিথিদের স্বাগত জানানোর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ভবিষ্যতের জন্য মার্কেটারদের প্রস্তুত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা তুলে ধরেন।

দুই দিনের আয়োজনে ১০টি কিনোট সেশন, দুটি কেস স্টাডি এবং দুটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিলের উদ্যোগে ‘দ্য ঢাকা ডিক্লারেশন’ শীর্ষক একটি ঘোষণা উপস্থাপন করা হয়। এর প্রতিপাদ্য ছিল ‘মার্কেটিং ফর গ্লোবাল গুড: ওয়াই ২০৩০ অ্যান্ড বিয়ন্ড’। এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশন, আফ্রিকান মার্কেটিং কনফেডারেশন ও ইউরোপিয়ান মার্কেটিং কনফেডারেশনের যৌথ অংশগ্রহণে ঘোষণাটি গৃহীত হয়। এতে ৫৪টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক কল্যাণে দায়িত্বশীল মার্কেটিং চর্চা, নেতৃত্ব এবং ২০৩০ সাল ও পরবর্তী সময়ের জন্য অভিন্ন লক্ষ্য ও অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরে।

প্রথম দিনের কিনোট পর্ব শুরু করেন অধ্যাপক ফিলিপ কটলার। মার্কেটিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানুষের বিচারবুদ্ধি কীভাবে পাশাপাশি কাজ করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। এরপর বক্তব্য দেন ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং ফোরামের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা হারমাওয়ান কারতাজায়া। প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে মার্কেটিং কীভাবে বৈশ্বিক কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে, তা তুলে ধরেন তিনি।

দিনের অন্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন গুগলের হেড অব পার্টনার পারফরম্যান্স, চ্যানেল সেলস—এসইএ তারা ইউন এবং মালয়েশিয়ার আইট্রেইন এশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা এরিক কু। মানুষের কৌতূহল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে কার্যকর মার্কেটিংয়ের সম্ভাবনা এবং সাধারণ ভোক্তাদের সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়ার নতুন সুযোগ নিয়ে তাঁরা আলোচনা করেন।

দ্বিতীয় দিনের কিনোট পর্ব শুরু করেন ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক সৈয়দ ফরহাত আনোয়ার। তিনি মার্কেটিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব এবং ব্র্যান্ড ও ভোক্তার ওপর এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে কথা বলেন। এ ছাড়া বক্তব্য দেন থাইল্যান্ডের ড. ড্যান ভিসিতচাইচান, আফ্রিকান মার্কেটিং কনফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট হেলেন ম্যাকইনটি-কার্লাইল, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, ভসু.এআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা নাফিস ফয়সল এবং ইউরোপিয়ান মার্কেটিং কনফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট রালফ স্ট্রাউস।

ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে অধ্যাপক ফিলিপ কটলার বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবসার দক্ষতা বাড়াতে, গ্রাহকের চাহিদা বুঝতে, বাজারের নতুন সুযোগ চিহ্নিত করতে এবং বিক্রি ও মুনাফার পূর্বাভাস দিতে সহায়তা করতে পারে। তবে প্রযুক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে ধাপে ধাপে ও দায়িত্বশীলভাবে এটি ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সক্ষমতাকে সহায়তা করবে, প্রতিস্থাপন করবে না। তাই মার্কেটিংয়ে মানুষের সৃজনশীলতা, তদারকি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা অপরিহার্য।

হারমাওয়ান কারতাজায়া বলেন, সফল মার্কেটিংয়ের জন্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা, আস্থা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয় জরুরি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ ও উন্নত গ্রাহক অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে। তবে এর ব্যবহার পরিচালিত হতে হবে মানুষের দায়িত্ববোধ দিয়ে। মুনাফার পাশাপাশি নৈতিক ব্যবসা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজ ও পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

কিনোট সেশনের পাশাপাশি দুটি প্যানেল আলোচনায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতার বিষয় উঠে আসে। প্রথম দিনের আলোচনায় প্রযুক্তি কীভাবে ছোট ব্যবসার জন্য প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে, তা নিয়ে মত দেন আলোচকেরা। দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় গুরুত্ব পায় একাডেমিক গবেষণাকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব কাজে ব্যবহারের বিষয়টি। এ ছাড়া ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ও কোরিয়ার কে-কালচারে কৃত্রিম এবং অ্যানালগ বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় নিয়ে দুটি কেস স্টাডি উপস্থাপন করা হয়।

ফোরামের বিভিন্ন সেশনে আরও বক্তব্য দেন এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশনের পার্টনার ও প্রেসিডেন্ট জ্যাক ইয়াও, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী, ড্রিম কোম্পানির চিফ ইমাজিনেশন অফিসার অধ্যাপক বুজং কিম, ইন্টারন্যাশনাল ডিস্ট্রিবিউশনস কোম্পানি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফ বিন তাজসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

সমাপনী পর্বে এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশন, আফ্রিকান মার্কেটিং কনফেডারেশন, ইউরোপিয়ান মার্কেটিং কনফেডারেশন ও ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিল যৌথভাবে ‘ঢাকা ডিক্লারেশন: মার্কেটিং ফর গুড’ ঘোষণা করে। এরপর দুই দিনের এ আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।

ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির সৌজন্যে, এসিআই মটরস লিমিটেডের সঞ্চালনায় এবং প্রাণের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয় ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং ফোরাম ৬.০। আয়োজনের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশন, ইউরোপিয়ান মার্কেটিং কনফেডারেশন, আফ্রিকান মার্কেটিং কনফেডারেশন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক বিজনেস স্কুল, মার্কেটিং সোসাইটি অব বাংলাদেশ, মার্কেটার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ, ব্যাকপেজ পিআর এবং ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিল।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ