Views Bangladesh Logo

সিজারের পর পেটে গজ রেখে সেলাইয়ে কনিকার মৃত্যু, দোষীদের শাস্তির আশ্বাস স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর পেটে গজ রেখেই সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। অস্ত্রোপচারের পর ৫১ দিন নানা জটিলতায় চিকিৎসাধীন থাকার পর ফরিদপুরের কনিকা মন্ডল (৩৫) মারা গেছেন। গত বুধবার দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

কনিকার মৃত্যুর খবর পেয়ে শুক্রবার সকালে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে তাঁর বাড়িতে যান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসকের দায়িত্বে অবহেলার কারণে কনিকার মৃত্যু হয়ে থাকলে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে কনিকার ৫২ দিনের শিশুকন্যা অদ্রিজা মন্ডলের ভরণপোষণে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি। এ সময় ব্যক্তিগত তহবিল থেকে কনিকার স্বামী অশান্ত মন্ডলের হাতে ৫০ হাজার টাকা তুলে দেন মন্ত্রী।

অস্ত্রোপচারের পর পেট ফুলে যায়
কনিকার স্বামী অশান্ত মন্ডল বলেন, গত ২৯ জুন প্রসবব্যথা উঠলে কনিকাকে ফরিদপুর শহরের নীলটুলী এলাকার সমরিতা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় হাসপাতালের কনসালটেন্ট ও স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. লক্ষী রানী দত্ত অস্ত্রোপচার করে কন্যাসন্তান প্রসব করান।

অশান্তের ভাষ্য, অস্ত্রোপচারের পরদিন কনিকার পেট ফুলে যায়। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে তাঁরা অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে ৪ জুলাই কনিকাকে ঢাকার কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

কনিকার দেবর সমীর মন্ডল বলেন, ঢাকায় ভর্তির পর ৭ জুলাই সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল জলিলের তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। তখন তাঁরা জানতে পারেন, কনিকার পেটে গজ রেখেই সেলাই করা হয়েছিল। ওই দিনই অস্ত্রোপচার করে গজটি বের করা হয়।

সমীর জানান, গজ বের করার পরও কনিকার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তাঁকে চার দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। হাসপাতালে ৪৮ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের দাবি, কনিকার চিকিৎসায় প্রায় ২০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ধারদেনা ও স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে চিকিৎসার ব্যয় মেটানো হয়।

তিন সন্তানকে রেখে মৃত্যু
কনিকার তিন সন্তান—৫২ দিনের অদ্রিজা মন্ডল, ৯ বছরের অংকন ও ১৫ বছরের পার্থ। পার্থ বারুগ্রাম উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র এবং অংকন বারুগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।

মায়ের মৃত্যুর পর দুই ছেলে নির্বাক হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। মাত্র ৫২ দিনের অদ্রিজা হারিয়েছে মায়ের বুকের দুধ ও মমতা। মায়ের মৃত্যুর পর শিশুটিকে নিজের কোলে তুলে নিয়েছেন তার মাসি দীপিকা বিশ্বাস।

পরিবারের সদস্যরা জানান, কনিকার স্বামী অশান্ত মন্ডলই পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী। কনিকার মৃত্যুতে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারটি উদ্বিগ্ন।

পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি

ঘটনার তদন্তে রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে কমিটি গঠন করা হয় বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় নির্দেশে কমিটি গঠন করা হয়েছে। রোববার থেকে তদন্ত শুরু হয়ে আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।

কনিকার মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী অশান্ত মন্ডলের হোয়াটসঅ্যাপে দুঃখপ্রকাশ করে বার্তা পাঠিয়েছেন চিকিৎসক ডা. লক্ষী রানী দত্ত। ওই বার্তায় চিকিৎসক নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন বলে জানিয়েছে কনিকার পরিবার।

এ ঘটনায় চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বিএনপির নেতারা ও বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিরা।

শুক্রবার কনিকার বাড়িতে গিয়ে জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন অদ্রিজাকে কোলে তুলে নেন। এ সময় তিনি স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি অদ্রিজা ও পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, চিকিৎসকের দায়িত্বে অবহেলার কারণে একজন মায়ের মৃত্যু হয়ে থাকলে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর আইনের আওতায় আনা হবে। এ ঘটনায় কেউ ছাড় পাবে না।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ