Views Bangladesh Logo

গাজীপুরে স্বামীর কবরের পাশে বিধবা মা ও দুই শিশু: মানবিক বিপর্যয়ে নিন্দা

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার উত্তর লস্করচালা গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে ঠাঁই না পেয়ে স্বামীর কবরের পাশে দুই সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হওয়া গৃহবধূ সোনিয়া বেগমের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও জরুরি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস), রাজশাহীর সভাপতি এবং লেখক ও উন্নয়নকর্মী মো. শামীউল আলীম শাওন। এক বিবৃতিতে তিনি ঘটনাটিকে ‘আধুনিক সভ্যতায় চরম বর্বরতা ও আইনের শাসনের মুখে চপেটাঘাত’ বলে অভিহিত করেন।

জানা যায়, সোনিয়া বেগমের স্বামী সুজন মাহমুদের মৃত্যুর পর শ্বশুর কফিল উদ্দিন ও শাশুড়ি তাকে এবং তার দুই সন্তানকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। সোনিয়ার অভিযোগ, শ্বশুরবাড়ির আর্থিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যথাযথ চিকিৎসার অভাবেই তার স্বামী মারা যান। স্বামীর দাফনের সময়ও শ্বশুর উপস্থিত না থেকে স্থান ত্যাগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যা এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

এরপর স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলামের পরিবার সোনিয়াকে কিছুদিন আশ্রয় দিলেও আইনি জটিলতার আশঙ্কায় তা স্থায়ী হয়নি। কোথাও ঠাঁই না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ৯ বছরের কন্যা ছোঁয়া ও ১৮ মাস বয়সী দুগ্ধপোষ্য পুত্রসন্তানকে নিয়ে স্বামীর কবরের পাশেই আশ্রয় নেন সোনিয়া।

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘স্বামীর লাশ ফেলে শ্বশুর চলে গিয়েছিলেন। এই দুই সন্তান নিয়ে কোথায় যাব? আমার আর কোনো জায়গা নেই।’

এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে মো. শামীউল আলীম শাওন বলেন, এটিকে কেবল ‘পারিবারিক বিবাদ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ৯ বছরের কন্যা ও ১৮ মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে একজন মা যখন খোলা আকাশের নিচে কবরের পাশে রাত কাটান, তখন বুঝতে হবে আমাদের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর। আর্থিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সুজন মাহমুদকে যথাযথ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ ফৌজদারি অপরাধ। এরপর তাঁর এতিম সন্তানদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

থানা পুলিশের ‘মীমাংসার চেষ্টা’র বিষয়ে তিনি বলেন, যখন ভুক্তভোগীদের জীবন ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে, তখন অপরাধীদের সঙ্গে টেবিলে বসা সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কিছু নয়। আইনের কঠোর প্রয়োগই হওয়া উচিত প্রথম পদক্ষেপ।

এ ঘটনায় প্রশাসনের প্রতি ছয় দফা দাবি জানান তিনি। এগুলো হলো— শ্বশুর কফিল উদ্দিন ও শাশুড়িকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা; ভুক্তভোগীদের জন্য নিরাপদ আবাসন, খাদ্য ও চিকিৎসার স্থায়ী রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা দেওয়া; সুজন মাহমুদের চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তদন্ত করে প্রমাণ সাপেক্ষে হত্যা বা অবহেলাজনিত মৃত্যুর মামলা রুজু করা; মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে সোনিয়া ও তাঁর সন্তানদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা; শিশু সুরক্ষা আইন ২০১৩-এর আওতায় দুই শিশুর দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষায় জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরকে দায়িত্ব নেওয়া এবং সাংবাদিকদের হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।

বিবৃতির শেষে শাওন বলেন, একটি জাতির সভ্যতা পরিমাপ করা হয় তার সবচেয়ে অসহায় মানুষটির সঙ্গে রাষ্ট্রের আচরণের নিরিখে। সোনিয়া বেগম ও তার দুই সন্তান আজ আমাদের বিচারব্যবস্থার সামনে এক বড় পরীক্ষা। বিচার না হওয়া পর্যন্ত ‘ইয়্যাস’ এই ঘটনার পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাবে।

উল্লেখ্য, ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সুজনের মা সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। কালিয়াকৈর থানার ওসি মো. শহিদুল ইসলাম জানান, দুই পক্ষকে নিয়ে মীমাংসার চেষ্টা চলছে এবং সমাধান না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ