বাংলাদেশের প্রতিটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন ‘রিলায়াবিলিটি ইঞ্জিনিয়ারিং’ পড়ানো উচিত
বাংলাদেশ প্রতি বছর হাজার হাজার প্রকৌশলী তৈরি করে। কিন্তু দেশের উন্নতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন তাদের খুব কমই শেখানো হয়—আর তা হলো: গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাগুলো যাতে নষ্ট না হয়, সেটা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়?
এটা কোনো কল্পনা নয়। বাস্তবে দেখা যায়—চাহিদার চূড়ান্ত সময়ে ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়ে যায়, বন্যার সময় পাম্প স্টেশন বন্ধ হয়ে যায়, পণ্য পাঠানোর আগেই কারখানার মেশিন থেমে যায়, পানি শোধনাগারের ক্ষমতা কমে যায়, হাসপাতালের ব্যাকআপ সিস্টেম কাজ করে না, সেতু তার নকশাকৃত আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার আগেই নষ্ট হয়ে যায়, বা মানুষের প্রয়োজনের সময় ডিজিটাল সেবা বন্ধ হয়ে যায়। এসব ব্যর্থতা অর্থ নষ্ট করে, জনসেবা ব্যাহত করে, নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করে এবং দেশের উৎপাদনশীলতা কমায়।
তাই বাংলাদেশের প্রতিটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রিলায়াবিলিটি ইঞ্জিনিয়ারিং’ পড়ানো উচিত।
‘রিলায়াবিলিটি ইঞ্জিনিয়ারিং’ হলো এমন একটা বিষয় যেখানে শেখানো হয়—কীভাবে কোনো ব্যবস্থা ডিজাইন, চালানো, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নত করা যায়, যাতে সেটা যতদিন সম্ভব ঠিকমতো কাজ করে। এখানে স্পষ্ট প্রশ্ন করা হয়: কী কী ভুল হতে পারে? কতটা সম্ভাবনা আছে? হলে কী হবে? আগে থেকে সতর্ক সংকেত কীভাবে বোঝা যাবে? আর কিছু নষ্ট হওয়ার আগে কী করা উচিত? এটা ডিজাইন, রক্ষণাবেক্ষণ, তথ্য, নিরাপত্তা, দৈনন্দিন কাজ ও খরচ—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত। সংক্ষেপে, এটা প্রকৌশলীদের শুধু ব্যবস্থা তৈরি করতেই শেখায় না, বরং সেগুলো চালু রাখতেও শেখায়।
বাংলাদেশ এতদিন মূলত নির্মাণের দিকে নজর দিয়েছে—সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শোধনাগার, ভবন, বন্দর ও ডিজিটাল ব্যবস্থা। বলাই বাহুল্য, স্থাপনা নির্মাণ জরুরি। কিন্তু পরবর্তী উন্নতির পর্যায় নির্ভর করে কর্মক্ষমতার ওপর। যে বিদ্যুৎকেন্দ্র বারবার নষ্ট হয়, সেটা শুধু প্রকৌশল সমস্যা নয়। যে পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রচুর অপচয় ও পাম্প নষ্ট হয়, সেটা শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়। যে কারখানায় মেশিন বারবার থেমে যায়, সেটা শুধু রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা নয়। যে ডাটা সেন্টার অনলাইন থাকতে পারে না, সেটা শুধু আইটি সমস্যা নয়। এগুলো সবই নির্ভরযোগ্যতার সমস্যা।
তবুও অনেক প্রকৌশল কোর্সে ‘রিলায়াবিলিটি ইঞ্জিনিয়ারিং’ এখনো নেই বা খুব দুর্বল।
ছাত্ররা সার্কিট থিওরি, মেশিন ডিজাইন, থার্মোডাইনামিক্স, স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিস, পাওয়ার সিস্টেম, ইলেকট্রনিক্স, প্রোগ্রামিং, ফ্লুইড মেকানিক্স ও কন্ট্রোল সিস্টেম শেখে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে ব্যবস্থা কীভাবে নষ্ট হয়, সেটাও তাদের বুঝতে হবে। তাদের শেখা উচিত—ব্যর্থতার ধরন, প্রতিরোধমূলক ও পূর্বাভাসমূলক রক্ষণাবেক্ষণ, মূল কারণ বিশ্লেষণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, খুচরা যন্ত্রাংশ পরিকল্পনা, অবস্থা পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তা পদ্ধতি, ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন এবং কোনো সম্পদের পুরো জীবনকালের খরচ। এসব না শিখলে তরুণ প্রকৌশলীরা হিসাব কষতে পারবে, কিন্তু ব্যবস্থা চালু রাখতে পারবে না।
বিদ্যুৎ উৎপাদন, পানি অবকাঠামো, শিল্প অটোমেশন, নির্ভরযোগ্যতা প্রকৌশল ও ডাটা সেন্টার পরিচালনায় নিজের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি—ভালো ও খারাপ সাইটের পার্থক্য একটা মেশিনে নয়। পার্থক্য হয় মেশিনের চারপাশের শৃঙ্খলায়। অ্যালার্ম ঠিকমতো দেখা হয় কি না? রক্ষণাবেক্ষণের রেকর্ড সঠিক কি না? টেকনিশিয়ানরা প্রশিক্ষিত কি না? খুচরা যন্ত্রাংশ আছে কি না? সেন্সর ক্যালিব্রেট করা আছে কি না? ঝুঁকিগুলো গুরুত্ব অনুসারে সাজানো আছে কি না? ব্যর্থতাগুলো ঠিকমতো বিশ্লেষণ করা হয়, নাকি শুধু মেরামত করে ভুলে যাওয়া হয়? নির্ভরযোগ্যতা আগে কাজের সংস্কৃতির বিষয়, পরে সফটওয়্যারের।
বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই সংস্কৃতি দরকার।
জননিরাপত্তা একটা বড় বিষয়। নষ্ট অবকাঠামো জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। খারাপ রক্ষণাবেক্ষণের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা আগুন বা বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটাতে পারে। দুর্বল ড্রেনেজ ও পাম্প বন্যা আরও খারাপ করতে পারে। অনির্ভরযোগ্য পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থা জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। পরিবহনে কাঠামোগত ক্ষয় বিপদ তৈরি করতে পারে। প্রকৌশল কোর্সে স্নাতকদের শুধু ডিজাইন ড্রয়িং ও সমাপনী সনদের বাইরেও দেখতে শেখানো উচিত। তাদের জিজ্ঞাসা করতে শেখানো উচিত—পাঁচ, দশ বা বিশ বছর পর আবহাওয়া, চাপ, ক্ষয়, মানুষের ভুল ও সীমিত বাজেটের মধ্যে ব্যবস্থাগুলো কেমন কাজ করবে।
অর্থনৈতিক শক্তি আরেকটা কারণ। বাংলাদেশ শক্তিশালী উৎপাদন, উচ্চমূল্যের রপ্তানি, ভালো লজিস্টিকস, ডাটা সেন্টার, ডিজিটাল সেবা ও বৈচিত্র্যময় শিল্প চায়। দুর্বল অবকাঠামো দিয়ে এগুলো সফল হবে না। মেশিন হঠাৎ থেমে গেলে কারখানার অর্থ নষ্ট হয়। যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকলে বন্দরের দক্ষতা কমে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের প্রতি জনগণের আস্থা কমে। ডাটা সেন্টার অনলাইন থাকতে না পারলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়। ‘রিলায়াবিলিটি ইঞ্জিনিয়ারিং’ শুধু সংকীর্ণ প্রযুক্তিগত বিষয় নয়। এটা একটা অর্থনৈতিক দক্ষতা, যা ডাউনটাইম কমায়, সম্পদের আয়ু বাড়ায়, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং বিনিয়োগ রক্ষা করে।
ভালো রক্ষণাবেক্ষণও জরুরি। বাংলাদেশ নতুন অবকাঠামোতে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে, কিন্তু তার রক্ষণাবেক্ষণে সমান যত্ন বা গুরুত্ব দেয় না। ‘রিলায়াবিলিটি ইঞ্জিনিয়ারিং’ এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সাহায্য করতে পারে। ছাত্রদের বুঝতে হবে—রক্ষণাবেক্ষণ কোনো নিম্নমানের মেরামত কাজ নয়। এটা ঝুঁকি, তথ্য, পরিদর্শন, পরিকল্পনা ও স্পষ্ট দায়িত্বভিত্তিক একটা পেশাদার বিষয়। যে প্রকৌশলী পাম্প নষ্ট হওয়া আটকায়, ট্রান্সফরমারের ঝুঁকি আগে থেকে ধরে বা উৎপাদন থেমে যাওয়া কমায়, সে অনেক নতুন প্রকল্প ঘোষণার চেয়ে বেশি সরকারি-বেসরকারি অর্থ বাঁচাতে পারে।
অটোমেশন এই প্রয়োজন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আধুনিক অবকাঠামো সেন্সর, স্কাডা সিস্টেম, পিএলসি, ডিজিটাল মিটার, কন্ট্রোল প্যানেল, ডাটা হিস্টোরিয়ান, বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও কম্পিউটারাইজড রক্ষণাবেক্ষণ প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে। প্রকৌশলীদের এই ব্যবস্থাগুলো থেকে যে তথ্য পাওয়া যায়, তা ব্যবহার করতে জানতে হবে। কম্পন বা তাপমাত্রা বেড়ে গেলে, চাপ কমে গেলে, মোটরের কারেন্ট অস্বাভাবিক হলে, ব্রেকার বারবার ট্রিপ করলে বা অ্যালার্মের ধরন দেখলে সেটা আগাম সতর্ক সংকেত হতে পারে। ‘রিলায়াবিলিটি ইঞ্জিনিয়ারিং’ ছাত্রদের সেই সংকেত পড়তে ও জনগণ ব্যর্থতা দেখার আগেই ব্যবস্থা নিতে শেখায়।
জলবায়ু সহনশীলতা চরম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশে গরম, আর্দ্রতা, বন্যা, ঝড়, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য পরিবেশগত চাপ আছে। এগুলো অবকাঠামোর আয়ু কমিয়ে দেয়। নির্ভরযোগ্যতায় প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী ভাবে—জলবায়ু যন্ত্রপাতি, উপকরণ, বৈদ্যুতিক কক্ষ, ড্রেনেজ, ব্যাকআপ সিস্টেম, প্রবেশপথ ও জরুরি সাড়া কীভাবে প্রভাবিত করে। জলবায়ু সহনশীলতা শুধু বাঁধ তৈরি বা নীতি লেখার বিষয় নয়। এটা এমন ডিজাইন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা, যা অস্বাভাবিক অবস্থায়ও কাজ করে।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত—বৈদ্যুতিক, যান্ত্রিক, সিভিল, শিল্প ও পরিবেশ প্রকৌশলের ছাত্রদের জন্য ‘রিলায়াবিলিটি ইঞ্জিনিয়ারিং’কে মূল বা বাধ্যতামূলক কোর্স করা। বিভিন্ন বিভাগ নিজেদের ক্ষেত্র অনুসারে বিস্তারিত মানিয়ে নিতে পারে। কিন্তু মৌলিক ভিত্তি একই হওয়া উচিত—ব্যর্থতার ধরন, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, রক্ষণাবেক্ষণ কৌশল, সম্পদের জীবনকাল ব্যবস্থাপনা, অবস্থা পর্যবেক্ষণ, মূল কারণ বিশ্লেষণ ও নির্ভরযোগ্যতার মাপকাঠি। পাম্প, মোটর, ড্রাইভ, সেন্সর, কন্ট্রোল সিস্টেম, তাপীয় ইমেজিং, কম্পন পর্যবেক্ষণ, পাওয়ার কোয়ালিটি ও শিল্প অটোমেশন নিয়ে ব্যবহারিক ল্যাবরেটরি গড়ে তোলা উচিত। ছাত্রদের শুধু বইয়ের সমস্যা সমাধান নয়—বাস্তব ত্রুটি নির্ণয়, রক্ষণাবেক্ষণ তথ্য পড়া, অ্যালার্ম ব্যাখ্যা ও সংশোধনমূলক পরিকল্পনা শেখানো উচিত।
শিল্পের সঙ্গে অংশীদারিত্ব কোর্সের অংশ হওয়া উচিত। বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ কর্তৃপক্ষ, কারখানা, টেলিকম অপারেটর, ডাটা সেন্টার, বন্দর, হাসপাতাল ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গোপনীয় তথ্য না দিয়ে কেস স্টাডি দিতে পারে। ছাত্ররা বাস্তব ব্যর্থতা থেকে শিখতে পারে—কী ভুল হয়েছিল, কোন সতর্ক সংকেত মিস করা হয়েছিল, মেরামতের খরচ কত, আর একই সমস্যা কীভাবে আটকানো যেত। চূড়ান্ত বছরের প্রকল্পে নির্ভরযোগ্যতা বিষয় থাকা উচিত। ছাত্ররা সস্তা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, পূর্বাভাসমূলক রক্ষণাবেক্ষণ মডেল, ডিজিটাল সম্পদ রেজিস্টার, পাম্প স্টেশন ড্যাশবোর্ড, ট্রান্সফরমার স্বাস্থ্য টুল, পানি অপচয় বিশ্লেষণ, কারখানার ডাউনটাইম অধ্যয়ন বা সাধারণ ডিজিটাল টুইন প্রোটোটাইপ তৈরি করতে পারে। এমন কাজ শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ একাডেমিক অনুশীলনের চেয়ে বাংলাদেশের জন্য অনেক বেশি উপকারী।
পেশাদার সংস্থা ও স্বীকৃতি কর্তৃপক্ষের উচিত ‘রিলায়াবিলিটি ইঞ্জিনিয়ারিং’কে জাতীয় দক্ষতার অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা। দেশের কতগুলো প্রকৌশল প্রোগ্রামে নির্ভরযোগ্যতা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পূর্বাভাসমূলক রক্ষণাবেক্ষণ বা শিল্প রক্ষণাবেক্ষণ কোর্স আছে, সেটা পরীক্ষা করা উচিত। আর নির্ভরযোগ্যতা, অটোমেশন, স্কাডা ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনায় দক্ষ স্নাতকদের জন্য নিয়োগকর্তাদের চাহিদাও মাপা উচিত।
উদ্দেশ্য ছাত্রদের ওপর আরেকটা ফ্যাশনেবল বিষয় চাপিয়ে দেওয়া নয়। এর উদ্দেশ্য হবে—বাংলাদেশের যে অবকাঠামো আছে এবং দেশ যা তৈরি করতে চায়, তার জন্য প্রকৌশলী তৈরি করা। যে দেশ উন্নত উৎপাদন, এআই ব্যবস্থা, সহনশীল ইউটিলিটি ও ডিজিটাল জনসেবার দিকে যাচ্ছে, সেখানে শুধু নতুন ক্ষমতা ডিজাইন করতে জানা প্রকৌশলী নয়—আপটাইম রক্ষা করতে জানা প্রকৌশলী দরকার।
বাংলাদেশ প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রকৌশলী তৈরি করেছে নির্মাণের জন্য। এখন পরবর্তী প্রজন্মকে ব্যবস্থা চালু রাখতে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দেশের ভবিষ্যৎ শুধু কতগুলো সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, কারখানা, ডাটা সেন্টার ও পানি ব্যবস্থা তৈরির ওপর নির্ভর করবে না। বরং ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে—উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার অনেক পরেও সেগুলো জনগণকে নির্ভরযোগ্যভাবে সেবা দিতে পারবে কি না। ‘রিলায়াবিলিটি ইঞ্জিনিয়ারিং’ শুধু শিল্পে প্রবেশের পর বিশেষজ্ঞ হয়ে শেখার বিষয় নয়; এটা শুরু থেকেই প্রকৌশল মানসিকতার অংশ হওয়া উচিত।
মতামত দিন