কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল কেন
২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর, শনিবার সকালে কক্সবাজারের ইনানীর পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
আগুন লাগার সম্ভাব্য কারণ কী?
সর্বশেষ সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে আগুনের সূত্রপাত নিয়ে দুটি সম্ভাব্য কারণের কথা উঠে এসেছে।
রান্নাঘরের চুলা থেকে আগুন: কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ধারণা করেছেন, রান্নাঘরের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।
বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট: রিসোর্টের দায়িত্বশীল ব্যক্তির বরাত দিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটকে আগুনের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আগুনের প্রকৃত উৎস এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়নি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো একটি কারণকে নিশ্চিত বলে ঘোষণা করা সমীচীন হবে না।
আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল কেন?
ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য অনুযায়ী, রিসোর্টটিতে অগ্নিনিরাপত্তার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি ছিল।
১. কাঠের স্থাপনা: দাহ্য কাঠের ব্যবহার আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
২. সমুদ্রের প্রবল বাতাস: বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৩. অগ্নিসংকেত ও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের অভাব: আগুনের প্রাথমিক পর্যায়ে তা শনাক্ত করা ও নেভানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না বলে জানা গেছে।
৪. অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন ও পরিকল্পনার অভাব: ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন ছাড়াই রিসোর্টটি পরিচালিত হচ্ছিল।
একজন অগ্নিনিরাপত্তা পরামর্শক হিসেবে আমার মূল্যায়ন
এই দুর্ঘটনা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলো—শুধু আগুন কীভাবে লেগেছে, সেটি তদন্ত করলেই চলবে না। আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল কেন এবং অতিথিরা কেন নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পারলেন না, সেসব বিষয়ও সমান গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখতে হবে।
তদন্তে বিশেষভাবে যেসব বিষয় পরীক্ষা করা প্রয়োজন
অগ্নিকাণ্ড শনাক্ত করার জন্য স্বয়ংক্রিয় ডিটেকশন ও অ্যালার্ম ব্যবস্থা ছিল কি না।
পর্যাপ্ত ও কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ছিল কি না।
পর্যাপ্তসংখ্যক নিরাপদ বহির্গমনপথ ও জরুরি নির্গমনব্যবস্থা ছিল কি না।
কাঠের মতো দাহ্য নির্মাণসামগ্রী এবং রান্নাঘরের কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অগ্নিঝুঁকি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল কি না।
জরুরি আলোকব্যবস্থা, অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলার পরিকল্পনা এবং অতিথিদের সরিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি ছিল কি না।
এগুলো তদন্তের সম্ভাব্য ক্ষেত্র। প্রতিটি ঘাটতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য তদন্তের ফলাফল প্রয়োজন।
কাঠের রিসোর্টের জন্য অগ্নিনিরাপত্তা নির্দেশিকা
সাধারণত প্রচলিত নির্মাণপদ্ধতিতে তৈরি ভবনের তুলনায় কাঠের রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বেশি হতে পারে। কাঠ সহজে আগুন ধরে, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং কাঠের ছাদ বা দেয়ালের ভেতরে আগুন ছড়ালে তা শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তাই কাঠের রিসোর্ট, কটেজ ও অন্যান্য পর্যটন আবাসনে নকশা থেকে শুরু করে নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ—প্রতিটি পর্যায়ে কঠোর অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
১. অগ্নিকাণ্ড শনাক্তকরণ ও অ্যালার্ম ব্যবস্থা
প্রতিটি অতিথিকক্ষ, করিডর, অভ্যর্থনাকক্ষ এবং গুরুত্বপূর্ণ সেবাকেন্দ্রে উপযুক্ত স্মোক বা হিট ডিটেক্টর স্থাপন করতে হবে।
ম্যানুয়াল কল পয়েন্ট (MCP), অ্যালার্ম সাউন্ডার, দৃশ্যমান সংকেত এবং ফায়ার অ্যালার্ম কন্ট্রোল প্যানেল রাখতে হবে।
রাতে অতিথিরা ঘুমিয়ে থাকলেও যেন অ্যালার্মের শব্দে জেগে ওঠেন, সে জন্য যথেষ্ট শ্রবণযোগ্য অ্যালার্ম নিশ্চিত করতে হবে।
রান্নাঘরে ধোঁয়া ও বাষ্পের কারণে অপ্রয়োজনীয় অ্যালার্ম এড়াতে উপযুক্ত ডিটেক্টর নির্বাচন করতে হবে।
একাধিক কটেজ থাকলে সব ভবনের অ্যালার্ম কীভাবে সমন্বিতভাবে পর্যবেক্ষণ ও পরিচালনা করা হবে, তা নকশায় নির্দিষ্ট করতে হবে।
২. স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার ব্যবস্থা
রিসোর্টের শ্রেণি, উচ্চতা, আয়তন, নির্মাণপদ্ধতি ও প্রযোজ্য বিধিমালা বিবেচনা করে অতিথিকক্ষ, করিডর, রেস্তোরাঁ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্প্রিংকলার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করতে হবে।
কাঠের স্থাপনায় আগুন দ্রুত ছড়ানোর ঝুঁকি বিবেচনায় পুরো ভবনজুড়ে স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার ব্যবস্থা একটি শক্তিশালী সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা।
নকশা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানির উৎস, ফায়ার পাম্প, কন্ট্রোল ভালভ, ফ্লো সুইচ, অ্যালার্ম ভালভ এবং নিরবচ্ছিন্ন পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
নকশা ও স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সংস্করণের NFPA 13 মান অনুসরণ করা যেতে পারে।
৩. বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও হোস ব্যবস্থা
সাধারণ অগ্নিঝুঁকির জন্য ABC ড্রাই কেমিক্যাল পাউডার অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।
বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও রান্নাঘরের ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী CO₂ বা উপযুক্ত বিকল্প অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখতে হবে।
ডিপ-ফ্রায়ারে ব্যবহৃত তেল বা চর্বিজনিত আগুন নেভানোর জন্য Class K অথবা সমতুল্য ওয়েট কেমিক্যাল অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখতে হবে।
রিসোর্টের আকার, বিন্যাস ও ঝুঁকি বিবেচনায় ফায়ার হোস রিল, হাইড্র্যান্ট এবং ফায়ার সার্ভিসের পানি ব্যবহারের উপযোগী সংযোগব্যবস্থা রাখতে হবে।
অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র এমন স্থানে রাখতে হবে, যাতে সেগুলো সহজে দেখা যায়, কোনো বাধা না থাকে এবং জরুরি মুহূর্তে দ্রুত ব্যবহার করা যায়।
৪. নিরাপদ বহির্গমন ও জরুরি আলোকব্যবস্থা
প্রতিটি অতিথিকক্ষ থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার পথ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রযোজ্য বিধিমালা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ও স্বাধীন বহির্গমনপথ রাখতে হবে। বড় বা বহুতল ভবনে শুধু একটি সিঁড়ি বা দরজার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
আলোকিত এক্সিট সাইন, জরুরি আলো এবং রাতে সহজে খোলা যায় এমন দরজা থাকতে হবে।
দরজার সামনে, বারান্দায় ও করিডরে কোনো প্রতিবন্ধক রাখা যাবে না।
বাথরুমে আটকে পড়ার ঝুঁকি এড়াতে দরজা, তালা এবং বিকল্প উদ্ধারব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে হবে।
৫. প্যাসিভ ফায়ার প্রোটেকশন
প্যাসিভ ফায়ার প্রোটেকশন বলতে এমন নির্মাণগত ব্যবস্থা বোঝায়, যা আগুনের বিস্তার ও ধোঁয়া ছড়ানো সীমিত করতে সাহায্য করে।
কাঠের উপযোগী পরীক্ষিত অগ্নিপ্রতিরোধী রাসায়নিক প্রয়োগ বা বিশেষ আবরণ ব্যবহার করতে হবে।
কাঠের বিম, কলাম ও সংযোগস্থলের অগ্নিপ্রতিরোধ ক্ষমতা মূল্যায়ন করতে হবে।
প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত অগ্নিপ্রতিরোধী বিভাজক দেয়াল, দরজা এবং পাইপ বা তার প্রবেশের ফাঁক বন্ধ করার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
কটেজগুলোর মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব অথবা উপযুক্ত অগ্নিবিচ্ছিন্নকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ছাদের ভেতরের ফাঁকা স্থান, কাঠের দেয়ালের অভ্যন্তরীণ অংশ এবং সেবাপাইপ বা তারের ডাক্ট দিয়ে আগুন ছড়ানোর পথ বন্ধ করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ: অগ্নিপ্রতিরোধী আবরণ কাঠকে সম্পূর্ণ অগ্নিরোধী করে না। ব্যবহৃত পণ্যের পরীক্ষার ফলাফল, প্রয়োগপদ্ধতি এবং রক্ষণাবেক্ষণ যাচাই করা জরুরি।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাব্যবস্থা
অগ্নিনির্বাপণের পানির সরবরাহ: পর্যাপ্ত পানি, পাম্পের সক্ষমতা এবং জরুরি মজুত নিশ্চিত করতে হবে।
বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা: সঠিক মাপের তার, MCB/MCCB, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে RCD/RCBO, আর্থিং এবং অতিরিক্ত লোড থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
রান্নাঘরের নিরাপত্তা: চুলা ও গ্যাসলাইনের নিরাপদ স্থাপন, জরুরি শাট-অফ ব্যবস্থা এবং রান্নার ধরন অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা রাখতে হবে।
এলপিজি নিরাপত্তা: গ্যাস সিলিন্ডার বা ট্যাংকের নিরাপদ অবস্থান, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, গ্যাস লিক নিয়ন্ত্রণ এবং উপযুক্ত গ্যাস শনাক্তকরণব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ-সার্জ সুরক্ষা: অবস্থান, ভবনের উচ্চতা ও ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে বজ্রপাত এবং বৈদ্যুতিক সার্জ প্রতিরোধের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
ফায়ার সার্ভিসের প্রবেশপথ: অগ্নিনির্বাপণকারী যানবাহনের চলাচলের উপযোগী রাস্তা, পানির উৎসে প্রবেশাধিকার এবং উদ্ধারকাজের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখতে হবে।
জরুরি ব্যবস্থাপনা: লিখিত উচ্ছেদ পরিকল্পনা, নির্ধারিত সমাবেশস্থল, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার মহড়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বাংলাদেশে কোন বিধিমালা ও মান অনুসরণ করতে হবে?
প্রকল্পের ধরন, অবস্থান, ভবনের ব্যবহার এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী নিম্নলিখিত বিধিমালা ও মান বিবেচনা করা প্রয়োজন:
BNBC 2020: ভবনের ব্যবহার, নির্মাণ, অগ্নিনিরাপত্তা, বহির্গমনপথ এবং প্রযোজ্য অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা।
অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ বিধিমালা, ২০১৪: প্রযোজ্য আইনগত শর্ত ও বাধ্যবাধকতা।
NFPA 13: স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার ব্যবস্থার নকশা ও স্থাপন।
NFPA 72: ফায়ার অ্যালার্ম ও সংকেতব্যবস্থার প্রযোজ্য বিধান।
NFPA 101: জীবননিরাপত্তা, ভবনের ব্যবহারশ্রেণি এবং নিরাপদ বহির্গমনপথের মূল্যায়ন।
এসব মানের কোন সংস্করণ এবং কোন বিধান প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও বাংলাদেশের কার্যকর আইন অনুযায়ী যাচাই করতে হবে।
রিসোর্টের নকশা অনুমোদনের আগে যাচাইয়ের তালিকা
ভবনের ব্যবহারশ্রেণি ও অগ্নিঝুঁকি মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়েছে।
অনুমোদিত স্থাপত্য নকশা ও অগ্নিনিরাপত্তা নকশা প্রস্তুত করা হয়েছে।
বহির্গমনপথ ও জরুরি উচ্ছেদপথ যাচাই করা হয়েছে।
ফায়ার অ্যালার্ম ও স্প্রিংকলার ব্যবস্থার নকশা যাচাই করা হয়েছে।
অগ্নিনির্বাপণের পানির ট্যাংক ও পাম্পের সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে।
কাঠে অগ্নিপ্রতিরোধী রাসায়নিক প্রয়োগের উপযোগিতা যাচাই করা হয়েছে।
বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, এলপিজি ও রান্নাঘরের অগ্নিঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের প্রবেশপথ ও জরুরি সমাবেশস্থল নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্থাপিত ব্যবস্থার পরীক্ষা, কমিশনিং ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে।
অগ্নিনিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, উচ্ছেদ মহড়া ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে।
NFPA মান অনুযায়ী কাঠের রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা
NFPA 101 Life Safety Code অনুযায়ী, রিসোর্টের ব্যবহার, অতিথির সংখ্যা এবং ভবনের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে আবাসনের শ্রেণি নির্ধারণ করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, অতিথিদের সাময়িক আবাসনের জন্য ব্যবহৃত হোটেল ও ডরমিটরি এবং স্বল্পসংখ্যক অতিথির আবাসনের জন্য ব্যবহৃত লজিং বা রুমিং হাউসের ক্ষেত্রে পৃথক বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।
কাঠ দাহ্য নির্মাণসামগ্রী হওয়ায় ভবনের কাঠামো, সক্রিয় অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, বহির্গমনপথ এবং অভ্যন্তরীণ পৃষ্ঠের উপকরণের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
নির্মাণপদ্ধতি ও কাঠের অগ্নিপ্রতিরোধী ব্যবস্থাপনা
নির্মাণের ধরন: NFPA 101-এ অনুমোদিত ভবনের উচ্চতা ও আয়তন নির্ধারণের ক্ষেত্রে NFPA 220-এ বর্ণিত নির্মাণশ্রেণির বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। ভারী কাঠের কাঠামো এবং সুরক্ষিত বা অসুরক্ষিত কাঠের ফ্রেমে নির্মিত ভবনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সীমা যাচাই করতে হবে।
অগ্নিপ্রতিরোধী রাসায়নিক ও আবরণ: কাঠের কাঠামো, উন্মুক্ত কাঠের ফ্রেম বা আলংকারিক কাঠের কাজে NFPA 703-এর আওতায় পরীক্ষিত ও উপযুক্ত অগ্নিপ্রতিরোধী কাঠ বা আবরণ প্রয়োজন হতে পারে।
অভ্যন্তরীণ পৃষ্ঠের উপকরণ: দেয়াল ও ছাদের পৃষ্ঠে ব্যবহৃত উপকরণের ফ্লেম স্প্রেড ইনডেক্স (FSI) এবং স্মোক ডেভেলপড ইনডেক্স নির্ধারিত মানের মধ্যে থাকতে হবে। করিডর ও বহির্গমনপথে উপকরণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভবনশ্রেণির জন্য প্রযোজ্য শর্ত অনুসরণ করতে হবে।
স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার ব্যবস্থা
স্প্রিংকলার স্থাপন: নতুন হোটেল, ডরমিটরি ও সাময়িক আবাসনের ক্ষেত্রে ভবনের শ্রেণি, আকার, উচ্চতা ও নির্মাণপদ্ধতি অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার বাধ্যতামূলক হতে পারে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে NFPA 13, NFPA 13R অথবা NFPA 13D-এর মধ্যে উপযুক্ত মান অনুসরণ করতে হবে।
পানির সরবরাহ ও তদারকি: স্প্রিংকলারের কন্ট্রোল ভালভ যেন অনিচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ না হয়ে যায়, সে জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বৈদ্যুতিক তদারকি বা তালাবদ্ধ অবস্থায় খোলা রাখার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ফায়ার অ্যালার্ম ও আগুন শনাক্তকরণ
অতিথিকক্ষ: প্রতিটি শয়নকক্ষে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী আন্তঃসংযুক্ত স্মোক অ্যালার্ম বা স্মোক ডিটেক্টর রাখতে হবে।
সামগ্রিক অ্যালার্ম: করিডরের স্মোক ডিটেক্টর, স্প্রিংকলারের পানিপ্রবাহ-সংক্রান্ত অ্যালার্ম অথবা ম্যানুয়াল অ্যালার্ম সক্রিয় হলে ভবনের প্রয়োজনীয় অংশে শ্রবণযোগ্য ও দৃশ্যমান সতর্কসংকেত চালু হওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
কার্বন মনোক্সাইড শনাক্তকরণ: জ্বালানিচালিত যন্ত্রপাতি, কেন্দ্রীয় হিটিং প্ল্যান্ট বা সংযুক্ত গ্যারেজের মতো স্থানে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী কার্বন মনোক্সাইড শনাক্তকরণব্যবস্থা রাখতে হবে।
নিরাপদ বহির্গমনপথ
বহির্গমনপথের সংখ্যা: প্রতিটি শয়নকক্ষ ও তলায় প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী পর্যাপ্ত এবং স্বাধীন বহির্গমনপথ থাকতে হবে। দুইটি পথের প্রয়োজনীয়তা ভবনের শ্রেণি, বিন্যাস ও অন্যান্য শর্তের ওপর নির্ভর করে।
বহির্গমনের দূরত্ব: নিরাপদ বহির্গমনপথে পৌঁছানোর সর্বোচ্চ দূরত্ব ভবনের ব্যবহারশ্রেণি, স্প্রিংকলার সুরক্ষা এবং প্রযোজ্য কোড অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। তাই সব রিসোর্টের জন্য একই দূরত্ব ধরে নেওয়া যাবে না।
ডেড-এন্ড করিডর: যেসব করিডরের এক প্রান্ত বন্ধ, সেগুলোর দৈর্ঘ্য প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী সীমিত রাখতে হবে, যাতে আগুন লাগলে অতিথিরা আটকে না পড়েন।
দরজা ও জরুরি আলো: বহির্গমনের জন্য নির্ধারিত দরজা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্যানিক হার্ডওয়্যার, ব্যাকআপ বিদ্যুৎসহ জরুরি আলো এবং আলোকিত এক্সিট সাইন নিশ্চিত করতে হবে।
পরিচালনা, পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ
কর্মীদের জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা, অগ্নিকাণ্ডের সময় করণীয় এবং অতিথিদের সতর্ক করার পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
করিডর, রান্নাঘর ও সাধারণ ব্যবহার্য স্থানে ঝুঁকি অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখতে হবে।
ফায়ার অ্যালার্ম, জরুরি আলো ও স্প্রিংকলার ব্যবস্থার নিয়মিত পরিদর্শন, পরীক্ষা এবং রক্ষণাবেক্ষণের নথি সংরক্ষণ করতে হবে।
নতুন ও পুরোনো ভবনের ক্ষেত্রে পার্থক্য
NFPA 101-এর বিধান অনুযায়ী নতুন নির্মিত ভবন এবং আগে থেকে চালু থাকা ভবনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শর্ত এক নাও হতে পারে।
নতুন ভবন: নতুন কাঠের রিসোর্টে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার এবং আধুনিক ফায়ার অ্যালার্ম ব্যবস্থা স্থাপন বাধ্যতামূলক কি না, তা ভবনের শ্রেণি ও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
বিদ্যমান ভবন: পুরোনো ভবনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো শর্ত পূরণ করা কঠিন হলে বিকল্প জীবননিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও প্রযোজ্য বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের অবস্থান
সাধারণ এলাকা: করিডর, লবি ও অন্যান্য স্থানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের সংখ্যা ও অবস্থান ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রযোজ্য মান অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
উচ্চঝুঁকির এলাকা: বাণিজ্যিক রান্নাঘর, লন্ড্রি ও বয়লার কক্ষের মতো স্থানে সংশ্লিষ্ট আগুনের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখতে হবে।
জরুরি আলো ও নির্দেশক চিহ্ন
ব্যাকআপ বিদ্যুৎ: বিদ্যুৎ চলে গেলেও জরুরি আলো ও এক্সিট সাইন সচল রাখার জন্য ব্যাটারি বা জেনারেটরসহ উপযুক্ত ব্যাকআপ ব্যবস্থা থাকতে হবে। কতক্ষণ এগুলো সচল রাখতে হবে, তা প্রযোজ্য কোড অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
দিকনির্দেশক চিহ্ন: করিডরের বাঁক ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থেকে বহির্গমনের নির্দেশনা যেন স্পষ্ট দেখা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক বিল্ডিং কোড (IBC) অনুযায়ী বিবেচ্য বিষয়
রিসোর্ট বা কটেজের ব্যবহার ও বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক বিল্ডিং কোডের (IBC) প্রাসঙ্গিক বিধান বিবেচনা করা যেতে পারে।
ব্যবহারশ্রেণি: সাময়িক আবাসনের জন্য ব্যবহৃত অনেক রিসোর্ট R-1 শ্রেণির আওতায় পড়তে পারে। তবে চূড়ান্ত শ্রেণি ভবনের প্রকৃত ব্যবহার ও প্রযোজ্য কোড অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার: ভবনের শ্রেণি ও নির্মাণপদ্ধতি অনুযায়ী স্প্রিংকলার স্থাপনের বাধ্যবাধকতা যাচাই করতে হবে।
ফায়ার অ্যালার্ম: স্মোক ডিটেক্টর, ম্যানুয়াল কল পয়েন্ট এবং সতর্কসংকেত প্রদানের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
অগ্নিপ্রতিরোধী কাঠামো: ভবনের কাঠামো ও ব্যবহার অনুযায়ী নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অগ্নিপ্রতিরোধী সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হতে পারে।
বহির্গমনপথ: পর্যাপ্ত বহির্গমনপথ, দৃশ্যমান নির্দেশক চিহ্ন ও জরুরি আলো নিশ্চিত করতে হবে।
কার্বন মনোক্সাইড শনাক্তকরণ: জ্বালানিচালিত যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট স্থানে প্রযোজ্য কোড অনুযায়ী ব্যবস্থা রাখতে হবে।
কাঠের কাঠামো ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কাঠামো বিবেচনা করা যেতে পারে:
1. IBC — International Building Code
2. NFPA — National Fire Protection Association-এর প্রাসঙ্গিক মান
3. Eurocode 5 — কাঠের কাঠামো নকশার ইউরোপীয় মান
সঠিক পরিকল্পনার জন্য ভবনের উচ্চতা, তলার সংখ্যা, কাঠের ধরন এবং নির্মাণপদ্ধতি বিবেচনা করা জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, ম্যাস টিম্বার বা ক্রস-ল্যামিনেটেড টিম্বার (CLT) এবং হালকা কাঠের ফ্রেমের অগ্নিঝুঁকি ও নকশাগত বৈশিষ্ট্য এক নয়।
ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্ব ও কর্তব্য
আমার মতে, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উচিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। শুধু ঝুঁকি শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি।
যেসব রিসোর্ট, হোটেল ও অন্যান্য স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ডের উচ্চঝুঁকি রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টের মতো দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিয়মিত পরিদর্শন, আইন প্রয়োগ এবং কার্যকর নজরদারি অপরিহার্য।
ভবনমালিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য
রিসোর্ট, হোটেল, আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কিংবা শিল্পকারখানা—সব ধরনের ভবনের মালিককে নিজ নিজ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
ভবন নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সময় প্রযোজ্য আইন, অনুমোদিত নকশা এবং অগ্নিনিরাপত্তার নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। নিয়মিত পরিদর্শন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা যাচাই এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি থাকতে হবে।
জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অগ্নিনিরাপত্তাকে কোনো অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে নয়, বরং অপরিহার্য বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
ইঞ্জিনিয়ার এম এ রশিদ টিপু
CFPS, NFPA — CFPS-4773
সার্টিফায়েড ফায়ার প্রোটেকশন স্পেশালিস্ট
ফায়ার অ্যান্ড লাইফ সেফটি ইন্টারন্যাশনাল কনসালট্যান্ট
মতামত দিন