গাজী নজরুলের ‘নৈতিক স্খলনের’ কী শাস্তি হতে পারে?
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ‘নৈতিক স্খলনের’ অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দল থেকে বহিষ্কার করার পর প্রশ্ন উঠেছে—এই অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আইনগতভাবে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব? তিনি কি সংসদ সদস্য পদ হারাতে পারেন, নাকি ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হতে পারেন?
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘নৈতিক স্খলন’ নিজে কোনো পৃথক ফৌজদারি অপরাধ নয়। ফলে শুধু দলীয় তদন্তে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া বা দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার কারণে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রীয় শাস্তি বা সংসদ সদস্য পদ বাতিলের সুযোগ নেই।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, দল থেকে বহিষ্কার হওয়া এবং সংসদ সদস্য পদ হারানো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য নিজ দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হতে পারে। এছাড়া আদালতের রায়ে আইনগত অযোগ্যতা সৃষ্টি হলে তখন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তার সদস্যপদ নিয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের আইনে প্রাপ্তবয়স্ক দুজন মানুষের সম্মতিতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ফৌজদারি অপরাধ নয়। তবে যদি জোরপূর্বক সম্পর্ক, প্রতারণা, জালিয়াতি, ব্ল্যাকমেইল বা অন্য কোনো দণ্ডনীয় অপরাধের অভিযোগ ওঠে এবং তার প্রমাণ পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিও নয়, বরং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো আইনি লঙ্ঘন প্রমাণিত হলে সেটিই বিচার্য হবে। দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রেও প্রচলিত আইন অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়।
বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকাকালে দ্বিতীয় বিয়ে করতে হলে সংশ্লিষ্ট সালিশ পরিষদের পূর্বানুমতি নিতে হয়। অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ না হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তির বিধান রয়েছে। সাম্প্রতিক এক রায়েও হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর সরাসরি সম্মতির চেয়ে সালিশ পরিষদের অনুমতিই আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন, ভাইরাল ভিডিওতে থাকা তরুণী তার বৈধ দ্বিতীয় স্ত্রী। একই দাবি করেছেন তার প্রথম স্ত্রী এবং ওই তরুণীর পরিবারও। তবে আলোচিত কাবিননামা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কাজী গণমাধ্যমে দাবি করেছেন, কাবিনের নথি পরে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং পুরোনো তারিখ ব্যবহার করা হয়েছে। এই অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে জাল নথি তৈরির মতো অপরাধের প্রশ্ন উঠতে পারে, যা তদন্তসাপেক্ষ।
আইন বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, যদি প্রমাণ হয় যে কারও ব্যক্তিগত ভিডিও গোপনে ধারণ করে বা অবৈধভাবে সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাহলে ভিডিও ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও গোপনীয়তা লঙ্ঘন, ডিজিটাল অপরাধ বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বর্তমান তথ্য অনুযায়ী গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়েছে রাজনৈতিক—তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তবে ফৌজদারি বা সাংবিধানিক কোনো শাস্তি হবে কি না, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে তদন্তে নতুন তথ্য-প্রমাণ বা আদালতের রায়ের ওপর।
মতামত দিন