বইমেলায় কাগজের কি নিদারুণ অপচয়
আশির দশকে সাড়া জাগানো ছোট কাগজ ছিল ‘সংবেদ’। সংবেদের সম্পাদক ছিলেন পারভেজ হোসেন। ৯টি সংখ্যার পর সংবেদ প্রকাশ বন্ধ হয়ে গেলে বন্ধুরা অনুরোধ করেন, সংবেদ আবার প্রকাশ করো। সংবেদ পত্রিকা প্রকাশ না করে ২০০৪ সালে তিনি সংবেদ প্রকাশনা সংস্থা নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। মননশীল ও সৃজনশীল গ্রন্থপ্রকাশ হিসেবে অল্প দিনেই প্রকাশনা-সংস্থাটি সমৃদ্ধ-পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পারভেজ হোসেন নিজেও গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ লিখেন। চিন্তাচর্চা করেন। লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ কথাসাহিত্যে ২০২২ সালে অর্জন করেছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। তার লেখালেখি, প্রকাশনা, বইমেলা বাংলাদেশের সামগ্রিক সাহিত্য ও চিন্তাচর্চা নিয়ে কথা হলো ভিউজ বাংলাদেশের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন কামরুল আহসান।
ভিউজ বাংলাদেশ: কেমন আছেন?
পারভেজ হোসেন: আছি, ভালো আছি।
ভিউজ বাংলাদেশ: আপনাকে ভিউজ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। একুশে বইমেলা উপলক্ষে আমাদের এই আয়োজন। এবারের বইমেলা কেমন লাগছে আপনার কাছে?
পারভেজ হোসেন: ভালোই লাগছে। শেষ পর্যন্ত মেলা হচ্ছে। মেলার শুরুর আগে নির্বাচন গেল। মানুষের মনে একটা ভয় ছিল আদৌ মেলা হবে কি না, কেমন হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হবে কি না। শেষ পর্যন্ত ভালোভাবেই মেলার আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। প্রকাশকদের অনুরোধে মেলা কর্তৃপক্ষ মেলার বিস্তৃতি অনেকটা কমিয়ে এনেছে। স্টলগুলো একটু কাছাকাছি এনে তৈরি হয়েছে। গত দুবছর যেরকম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল সেরকমটা হয়নি। এবারের মেলার বিন্যাস নিয়ে আমি এ কারণে খুশি যে বেশির ভাগ স্টলই দুদিকে মুখ পেয়েছে। স্টলগুলোর মাঝ দিয়ে অনেক রাস্তা গেছে। ফলে পাঠক কম ঘুরেই সব প্রকাশনী হাতের কাছে পান।
ভিউজ বাংলাদেশ: কিন্তু অনেকেই বলছেন যে পরিসর ছোট হয়ে গেছে। ফলে বইমেলা কিছুটা আঁটসাট। হাঁটাচলার জায়গা কম।
পারভেজ হোসেন: আমি জানি না কারা একরম বলছে। জায়গা তো যথেষ্ট। বাংলা একাডেমির সেই ছোট্ট প্রাঙ্গণ থেকে আমরা কোথায় চলে এসেছি। সারা পৃথিবীর মানুষ আমাদের মেলা দেখছেন। এই আলোকজ্জ্বল বিস্তৃত প্রান্তর। কী সুন্দর! অভিযোগের কারণ কী আমি জানি না।
ভিউজ বাংলাদেশ: বইমেলার এক সপ্তাহ পার হলো। কেমন দেখছেন পাঠকের উপস্থিতি?
পারভেজ হোসেন: না, পাঠকের উপস্থিতি এখনো তেমন আশানুরূপ নয়। কেমন যেন ঝিমানো ভাব। হয়তো আগামী শুক্রবারের পর মেলা জমবে।
ভিউজ বাংলাদেশ: মননশীল ও সৃজনশীল প্রকাশনী হিসেবে সংবেদ সমৃদ্ধ-পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আপনারা কীরকম সাড়া পাচ্ছেন?
পারভেজ হোসেন: সংবেদের একটা স্লোগান আছে- ‘সৃজনে-নন্দনে-মননে’। শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল একটু অন্য ধরনের বই প্রকাশ করব। মানে দর্শন, সমাজতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব, রাজনীতি ইত্যাদি। মানে যেসব বিষয় নিয়ে আমরা তর্ক-বিতর্ক করি। মননশীলতাকে বজায় রাখার জন্য যে চর্চার মধ্য দিয়ে আমরা যেতে চাই, সেই বইগুলোর দিকেই আমার নজর ছিল চিরকাল, এবং এখনো আছে। প্রকাশক হিসেবে আমরা ছোট; কিন্তু, পাঠকের যতটুকু সাড়া পাচ্ছি আমি খুশি। সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েই আমাদের চলতে হবে।
ভিউজ বাংলাদেশ: সংবেদ কি নিজস্ব একটা পাঠকগোষ্ঠী সৃষ্টি করতে পেরেছে বলে আপনি মনে করেন?
পারভেজ হোসেন: আমার তো মনে হয় তাই। একদল পাঠক আছেন যারা সংবেদে আসেন। নতুন বই খোঁজেন। এবার কম বই আনাতেও তারা প্রশ্ন করেছে, এত কম বই কেন এনেছেন?
ভিউজ বাংলাদেশ: এবারের বইমেলায় সংবেদ থেকে কতগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে?
পারভেজ হোসেন: আটটি কি দশটি আসবে। এর মধ্যে একটি আছে ঘাসসান কানাফানির একটি অনূদিত বই।
ভিউজ বাংলাদেশ: সংবেদ নামের দিক দিক দিয়ে গুণের দিক দিয়ে অনেক বড় প্রকাশনী। এত কম বই কেন?
পারভেজ হোসেন: আমি কিন্তু অত বই প্রকাশের পক্ষে না। আমি জানি না কীভাবে একটা প্রকাশনী ১০০ বই বের করে। ১০০টি বই হলে কমপক্ষে ৫০ জন লেখক লাগবে, যদি একজন ২টি করেও বই লিখেন। এই ৫০ জন লেখক কোথায়? আমি খুব বিস্মিত হই, একুশের বইমেলায় যে চার হাজার, পাঁচ হাজার বই বেরোয়, এই বইগুলোর খবর মেলার পরে আর পাই না। পাঁচ হাজার বইয়ের মধ্যে থেকে কি ৫০০ বইও টিকে মেলা শেষে? কাগজের কি নিদারুণ অপচয়! যে বই আমি খুঁজে পাই না, যার অস্তিত্ব আর নাই, এই বিষয়টা নিয়ে একটু ভাববার সময় এসেছে বোধ হয়। মিনিমাম কোয়ালিটি বজায় রাখলে আমার মনে হয় অর্ধেক বই কমে যাবে।
ভিউজ বাংলাদেশ: সংবেদ থেকে এ পর্যন্ত মোট কতগুলো বই বেরিয়েছে?
পারভেজ হোসেন: সংবেদ থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৫০টি বই বেরিয়েছে; কিন্তু, এর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০টি বই এখন পাওয়া যায়। বাকিগুলো শেষ হয়ে যাওয়ার পর আর পুনঃমুদ্রণ হয়নি।
ভিউজ বাংলাদেশ: যেগুলো নেই সেগুলো কেন নেই?
পারভেজ হোসেন: চাহিদা না থাকার কারণেই আর পুনঃমুদ্রণ হয়নি। এগুলোর মধ্যে কিছু কবিতার বই, গল্পের বই আছে। কিছু পুনঃমুদ্রণ হয়েছে। পরে আবার করতে পারি কখনো, যদি প্রয়োজন হয়।
ভিউজ বাংলাদেশ: সংবেদের কি নিজস্ব কোনো সম্পাদনা বিভাগ আছে?
পারভেজ হোসেন: আলাদা কোনো বিভাগ নেই। আমিই সম্পাদনা করি। বা প্রয়োজনে আমার কোনো লেখক-গবেষক বন্ধুকে পাণ্ডুলিপিটা দেখাই।
ভিউজ বাংলাদেশ: নিজস্ব প্রকাশনার মার্কেটিংয়ের জন্য সংবেদ কী করে?
পারভেজ হোসেন: সারা বাংলাদেশে সংবেদের বিশটার মতো বইয়ের দোকান আছে যাদের সাথে সংবেদ যুক্ত। এদের কাছে সংবেদের বই থাকে। অনেকে বই অর্ডার দেয়। প্রথমা, বাতিঘর, পাঠক সমাবেশ সংবেদের বই বিক্রি করছে। এইসব বড় বড় প্রকাশনা সংস্থার আউটলেট অনেক বেশি। তারপর রকমারি আছে। অনলাইনে এররকম আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যারা বাংলাদেশে সংবেদের বই পৌঁছে দেয়। সংবেদের নিজস্ব কোনো আউটলেট নেই। সংবেদের বই অন্যরা বিক্রি করে।
ভিউজ বাংলাদেশ: সারা বছর ধরে সংবেদের যত বই বিক্রি হয়, আপনার কি মনে হয় ভবিষ্যতে এই প্রতিষ্ঠানটাকে আরেকটু বড় জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব?
পারভেজ হোসেন: আমি চাই প্রকাশনা-ব্যবসায় একটা পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে উঠুক। সংবেদও যেন তার মধ্যে একটা প্রতিষ্ঠান হয়। এই যে এত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, তার মধ্যে সংবেদকে আপনারা কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছেন আমি জানি না। আমি যা চাই তা করতে অনেক বাধা। অনেক টাকা লগ্নি করার ক্ষমতা আমার নাই। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও আমি বেশি পাণ্ডুলিপি পাই না। ভালো পাণ্ডুলিপি থাকলে কোনো লেখককে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় না সেটা প্রকাশের জন্য। ভালো পাণ্ডুলিপির এখন এতই সংকট, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এতই বেশি, সেই তুলনায় ভালো লেখক কোথায়? আমাদের লেখালেখির বিষয়-বৈচিত্র্যও কম। কতরকমের বই হতে পারে। কতভাবে হাজির করা যায় একটা বইকে। নেই তো সেরকম।
ভিউজ বাংলাদেশ: ভালো পাণ্ডুলিপির জন্য একজন লেখককে যে সময় দিতে হয়, সে সময়-ব্যয়ের জন্য তার অর্থসংস্থানও দরকার; কিন্তু, লেখক তো লিখে টাকা পান না। এমনও অভিযোগ আছে যে অনেক প্রকাশনী লেখকদের ঠিক মতো রয়ালিটি দেয় না।
পারভেজ হোসেন: সত্যি অর্থে কি একটার সঙ্গে আরেকটা সম্পর্কিত। একজন প্রকাশক যদি তার লেখককে সম্মানী দিতে চান, তাহলে কতগুলো বই বিক্রি করতে হবে? যখন লেটার প্রেস ছিল তখন যে কোনো বই সাড়ে বারোশ কপি ছাপা হতো। এর নিচে কোনো বই ছাপা হতো না। তাহলে প্রকাশকের পোষাবে না। প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়ে যাওয়ার কারণে এখন তিনশ, দুশ বইও ছাপে। প্লেট রেখে দেয়, আবার ছাপে প্রয়োজন হলে। খুব কম বই আছে বছরে তিনশ কপি বিক্রি হয় না। তিনশ কপি বই বিক্রি না হলে একজন লেখককে আসলে কিছু দেয়া যায় না।
ভিউজ বাংলাদেশ: তাহলে একজন লেখক সিরিয়াস বা গবেষণামূলক লেখা কীভাবে লিখবেন?
পারভেজ হোসেন: এটা জাতির দুর্ভাগ্য যে বইয়ের বিক্রি কমে গেছে। একটা ভালো বই বছরে পাঁচশ-এক হাজার কপি বিক্রি হওয়া খুবই কঠিন। আমি মনে করি সতেরো-আঠারো কোটি মানুষের দেশে একটা ভালো বই যদি পনেরোশ বা আঠারো কপি বিক্রি হয় তাহলে লেখক-প্রকাশক উভয়েই কিছু অর্থ পেতে পারে। তখন একটা সুষ্ঠু লেনদেন হতে পারে; কিন্তু, সেখানে যদি দুশ-আড়াইশ কপি বিক্রি হয় তাহলে কে কাকে টাকা দিবে?
ভিউজ বাংলাদেশ: এর থেকে উত্তরণের উপায় কী?
পারভেজ হোসেন: উত্তরণের উপায় পাঠক বাড়ানো; কিন্তু, পাঠক কীভাবে বাড়বে সেটা আমি জানি না। বিনোদন, সময় কাটানোর মাধ্যম এখন এত বেশি যে পাঠক ক্রমশ কমছে। আমাদের মধ্যে জ্ঞানচর্চা, ভালো বই পড়ার প্রবণতা কম।
ভিউজ বাংলাদেশ: বাংলাদেশের লেখকরা কি স্বাধীন? অনেক লেখক অনেক লেখা লিখতে পারেন না। তাহলে ভালো বই কীভাবে লেখা সম্ভব?
পারভেজ হোসেন: সেরকম একটা সমস্যা তো আছেই। ধর্ম নিয়ে কিছু বলা যায় না। রাষ্ট্রও অনেক জায়গায় অসহনশীল। সব কথা চাইলেই বলা যায় না। রুচির বাধা, সমাজের বাধা, রাজনৈতিক বাধা তা তো আছেই। আবার একেবারেই যে কোনো কথা হচ্ছে না তাও তো না।
ভিউজ বাংলাদেশ: আপনি নিজে একজন লেখক, প্রকাশনা সংস্থা চালাতে গিয়ে আপনার লেখালেখির কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না?
পারভেজ হোসেন: আমি আসলে প্রিন্টার। আমার একটা ছাপাখানা আছে। আমি যেহেতু অন্য কোনো কাজ করি না, এটা দিয়েই আমার চলে। এসব করতে করতেই লেখালেখি করি। খুব একটা সমস্যা হয় না।
ভিউজ বাংলাদেশ: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
পারভেজ হোসেন: ভিউজ বাংলাদেশকেও ধন্যবাদ।
মতামত দিন