হবিগঞ্জে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় বৃদ্ধ নিহতের ঘটনায় তোলপাড়, চালককে গ্রেপ্তারের দাবি
হবিগঞ্জ শহরে প্রকাশ্যে বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় পথচারী এক বৃদ্ধের নিহতের ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ করেছেন নিহতের স্বজনেরা। তারা অভিযোগ করেছেন, মোটরসাইকেলের চালক পুলিশ প্রশাসনে কর্মরত হওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। উল্টো হবিগঞ্জ সদর থানার পুলিশ কর্মকর্তারা নিহতের বাসায় এসে স্বজনদের বিষয়টি মিটমাট করার পরামর্শ দিয়েছেন।
গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) শহরের শায়েস্তানগর এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয়ের কাছে দ্রুতগতির মোটরসাইকেলের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন পথচারী জহুর আলী (৭৩)। এরপরই চালককে দ্রুত শহরের ফায়ার সার্ভিস রোড হয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যেতে একাধিক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়। অন্যদিকে এক নারীসহ কয়েকজন মিলে জহুর আলীকে উদ্ধার করে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করান।
দুর্ঘটনায় আহত জহুর আলীর মাথা ফেটে যাওয়ায় সেখানে তিনটি সেলাই দেওয়া হয়। পরে তার অবস্থার অবনতি ঘটলে চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে সিলেট নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন রাত ১১টায় জহুর আলী মারা যান। পরদিন বাদ জোহর জানাজা শেষে তাকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয় বলে নিহতের স্বজনেরা জানিয়েছেন।
এদিকে দুর্ঘটনার পরপরই হবিগঞ্জ সদর থানার ওসিসহ ডিএসবির সদস্যরা শহরের মোহনপুর এলাকায় জহুর আলীর বাসায় যান বলে নিহতের লন্ডনপ্রবাসী মেয়ে মাহমুদা খা জানিয়েছেন। হবিগঞ্জ জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মাহমুদা খা দাবি করেন, দুর্ঘটনায় জড়িত মোটরসাইকেলচালক পুলিশে কর্মরত। এ কারণেই ওসি বাসায় গিয়ে নিহতের স্বজনদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে ওই চালকের পরিচয় জানাতে তারা অপারগতা প্রকাশ করেন।
এমন অভিযোগ তুলে মাহমুদা খা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একাধিক স্ট্যাটাস দিয়েছেন। পাশাপাশি দুর্ঘটনার সময়কার একাধিক সিসিটিভি ফুটেজও নিজের ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার করেছেন। তিনি দুর্ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যের পরিচয় প্রকাশ ও তাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন এবং এ ব্যাপারে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে পুলিশ জানিয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হলেও তিন দিন পরও কেউ অভিযোগ দেননি।
শুক্রবার (১৯ জুন) রাতে হবিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল হক বলেন, দুর্ঘটনার পর তিনি নিজে নিহতের বাসায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বিভিন্নজনের কাছে নিহতের পরিবার নানা অভিযোগ করলেও থানায় লিখিত অভিযোগ দেননি।
মোটরসাইকেলচালক পুলিশে কর্মরত কি না—এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে গিয়ে ওসি জাহিদুল হক বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন। পুলিশ চালককে শনাক্ত করেছে এবং অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি দাবি করেন, দুর্ঘটনার পর নিহতের পরিবার পুলিশকে না জানিয়ে মরদেহ দাফন করায় সুরতহাল বা ময়নাতদন্ত করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে জহুর আলীর অনাকাঙ্ক্ষিত ও নির্মম মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন জেলার বিশিষ্ট নাগরিক ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। বিবৃতিতে তারা বলেন, 'শহরের প্রধান সড়কে প্রকাশ্য দিবালোকে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে একজন মানুষকে মেরে ফেলার পরও ঘাতক চালক বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা আইনের শাসনের পরিপন্থী।' তারা অবিলম্বে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ঘাতক মোটরসাইকেলচালককে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাতে নেতৃবৃন্দ মরহুম জহুর আলীর বাসায় গিয়ে তার ছেলে পারভেজের সঙ্গে দেখা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করে আইনি লড়াইয়ের দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন।
বিবৃতিতে সম্মতি ও সংহতি প্রকাশ করেছেন পীযূষ চক্রবর্তী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, অ্যাডভোকেট জুনায়েদ আহমেদ, অনুপ কুমার দেব মনা, সিদ্দিকী হারুন, রনজন রায়, তোফায়েল সোহেল, অ্যাডভোকেট ফখরুদ্দিন জাকী, আজিজুর রহমান কাউসার, পলাশ চৌধুরী ও মো. আছকির মিয়া প্রমুখ।
মতামত দিন