‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বাংলাদেশ ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বই: ইউপিএলের বিবৃতি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে বাংলাদেশ ও দেশের ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)। বইটির বিক্রিকে কেন্দ্র করে বাংলাবাজারে নিজেদের বিক্রয়কেন্দ্রে তালা দেওয়ার ঘটনার পর দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, বইটিতে বাংলাদেশ সৃষ্টি ও মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাতের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে।
ইউপিএল বলেছে, তারা প্রকাশিত প্রতিটি বইয়ের দায় ধারণ করে। কোনো বই নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তা করতে হবে। আইনসম্মতভাবে কোনো বই নিষিদ্ধ করা হলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত মেনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিবৃতিতে ইউপিএল জানায়, ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কয়েকজন ব্যক্তি বাংলাবাজারের তাদের বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে নিষিদ্ধ বই দাবি করেন এবং এর বিক্রি বন্ধের কথা বলেন। একপর্যায়ে বিক্রয়কেন্দ্রের শাটার বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় ইউপিএলের দুই বিক্রয়কর্মীকে হয়রানি করা হয়। পরে তাদের ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আটকে রাখা হলেও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ইউপিএলের ভাষ্য, সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের জানানো হয়েছিল যে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ কোনো বই নয়। সরকার বা আদালতের পক্ষ থেকে বইটি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তারা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। তবে বইটি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সরকার বা আদালতের এমন কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তাদের জানা নেই।
ঘটনাটিকে ‘জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার ও দুর্ভাগ্যজনক’ বলে উল্লেখ করেছে ইউপিএল। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, প্রায় সব সরকারের আমলেই কোনো না কোনো বই নিয়ে তাদের চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সরকার, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রকাশনা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে এবং নির্দিষ্ট বই প্রকাশ বা বিক্রি না করার জন্য চাপও দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে ইউপিএল জানায়, আগের সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা থেকে তাদের প্রকাশিত একটি বইয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছিল। কিছু পাণ্ডুলিপি প্রকাশে তারা অসম্মতি জানালে সরকারি হেনস্তার মুখেও পড়তে হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তিরাও নির্দিষ্ট কিছু বই প্রকাশ না করার জন্য চাপ দিয়েছেন বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
মওদুদ আহমদের বই নিয়েও চাপের মুখে পড়ার কথা জানিয়েছে ইউপিএল। পাশাপাশি অধ্যাপক আসিফ নজরুলের গঙ্গা চুক্তি বিষয়ে লেখা একটি বই ‘অত্যন্ত প্রতিকূল’ সময়ে রিভিউয়ারদের মতামতের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়েছিল বলেও জানিয়েছে তারা।
ইউপিএলের দাবি, প্রকাশক হিসেবে তারা যতটা সম্ভব এসব চাপ উপেক্ষা করেছে। এর ফলে বিভিন্ন সময়ে বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রকাশনার মৌলিক নীতি থেকে তারা সরে আসেনি। তাদের প্রকাশিত প্রতিটি বইয়ের ক্ষেত্রেই একই নীতি অনুসরণ করা হয়।
প্রকাশনা প্রক্রিয়া সম্পর্কে ইউপিএল বলেছে, প্রতিটি পাণ্ডুলিপি স্বাধীন রিভিউয়ারদের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। রিভিউয়ারদের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতেই বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা থাকায় কোনো চাপের মুখে তারা প্রকাশিত বই সরিয়ে নেয় না।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, আগের সরকারের সময়ের মতো বর্তমান সময়েও তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ থেকে নিয়মিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক প্রকাশনার উদাহরণ হিসেবে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের লেখা জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসবিষয়ক একটি বইয়ের কথাও উল্লেখ করেছে ইউপিএল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বিশেষজ্ঞ রিভিউয়াররা বইটিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে বলে মতামত দেওয়ার পরই সেটি প্রকাশ করা হয়েছে।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ সম্পর্কে ইউপিএল বলেছে, বইটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। এতে বাংলাদেশ সৃষ্টি ও মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাতের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ফলে বইটির প্রকাশনা ও বিক্রির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সেটিও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত বলে মনে করে প্রতিষ্ঠানটি।
ইউপিএলের বক্তব্য, কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বইটি নিষিদ্ধ করলে তারা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। তবে কোনো ফৌজদারি অপরাধে উসকানি নেই—এমন কোনো বইয়ের প্রকাশনা ও বিপণনে হস্তক্ষেপ সংস্কৃতির সামগ্রিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।
বিবৃতিতে ইউপিএল আরও বলেছে, বিগত সরকারের আমলে আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ না করেই আদর্শ প্রকাশনীর তিনটি বইয়ের স্টল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও তারা একই পেশাগত অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করেছিল। তাদের সেই অবস্থান এখনো দৃঢ় ও অপরিবর্তিত রয়েছে।
রাষ্ট্র ও সমাজের বিকাশের স্বার্থে মুক্তচিন্তা ও বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার পরিসরে হস্তক্ষেপ না করা সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব বলেও মনে করে ইউপিএল। প্রতিষ্ঠানটির মতে, প্রকাশনার মতো জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম যদি আইনসম্মত নয়—এমন চাপ বা হুমকির মুখে থাকে, তাহলে দেশের সামগ্রিক সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ পরিস্থিতিতে লেখক, পাঠক, শিক্ষক, সাংবাদিক, সহ-প্রকাশক, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সরকারের বিবেচক অংশ এবং শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সবার পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছে ইউপিএল। একই সঙ্গে প্রকাশনা শিল্পে ‘গুন্ডামির রাজত্ব’ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের অবৈধ তৎপরতা রাষ্ট্র, সমাজ ও জ্ঞানচর্চার স্বার্থে কঠোরভাবে দমনের আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
মতামত দিন