সালিসে নারীকে জুতাপেটা করলেন ইউপি চেয়ারম্যান, ভিডিও ভাইরাল
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় গ্রাম্য সালিসে এক নারীকে প্রকাশ্যে জুতাপেটা করেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. ফরিদ উদ্দিন। গত সোমবার বিকেলে উপজেলার একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার ১১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার রাতে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঘটনার তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভুক্তভোগী নারীর স্বামী প্রবাসে থাকেন। এক যুবকের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্কের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সালিস বসানো হয়। সালিসে ওই নারী ও যুবকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নারীকে জুতাপেটার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লেও ওই যুবককে শাস্তি দেওয়ার কোনো ভিডিও প্রকাশ্যে আসেনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে একটি চেয়ারে বসে আছেন ইউপি চেয়ারম্যান ফরিদ উদ্দিন। তাঁর সামনে ভুক্তভোগী নারীকে ডেকে বসানো হয়। একপর্যায়ে নিজের পায়ের জুতা দিয়ে ওই নারীকে পেটান চেয়ারম্যান। তাঁকে চেয়ারে বসা অবস্থায় তিনবার এবং পরে দাঁড়িয়ে আরও তিনবার জুতাপেটা করতে দেখা যায়। এ সময় আশপাশে অনেক নারী-পুরুষ দাঁড়িয়ে থাকলেও কাউকে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার ও বুধবার সকালে ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অভিযোগের বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান মো. ফরিদ উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। তবে মঙ্গলবার রাতে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে তিনি ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য দেন।
চেয়ারম্যান বলেন, ‘প্রবাসী স্বামীর সংসারে থেকে ওই নারী পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। লোকজন তাঁদের হাতেনাতে আটক করেন। আমি সেখানে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করেছি। সামাজিক বিচারের রায় আমি কার্যকর করেছি মাত্র। সেটি না করলে এলাকার বিক্ষুব্ধ লোকজন বড় ধরনের ঝামেলা সৃষ্টি করত।’ কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিডিওটি ছড়িয়ে দিতে পারে বলেও তিনি ধারণা করেন।
ভুক্তভোগী নারীর পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, ঘটনাটি জানার পরপরই তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানিয়েছেন। তিনি বিষয়টি দেখছেন।
ব্রাহ্মণপাড়ার ইউএনও মুন্নী ইসলাম বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে এখন গ্রাম আদালত আছে। সেখানে কী ধরনের অভিযোগ গ্রহণ করা যাবে এবং সেগুলোর নিষ্পত্তি কীভাবে হবে, তা নির্ধারিত রয়েছে। এর বাইরে কেউ বিচারের নামে এমন ঘটনা ঘটাতে পারেন না। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লার নারী নেত্রী ও মানবাধিকার সংগঠক দিলনাশি মোহসেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমত চেয়ারম্যানের জানা উচিত তাঁর এখতিয়ার কতটুকু। তিনি এমন ঘটনার বিচার করতে পারেন কি না? আর যদি ঘটনাটি সত্যও হয়, তারপরও একজন নারীকে এভাবে প্রকাশ্যে জুতাপেটা করতে পারেন কি না—সেটি প্রশ্ন।’
তিনি বলেন, ‘কেউ অপরাধী হলে তাঁকে আইনের আওতায় তুলে দেওয়া দরকার ছিল। একজন জনপ্রতিনিধির এমন কাজ করা নিন্দনীয়।’ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ইউপি চেয়ারম্যানের বিচার দাবি করেন তিনি।
মতামত দিন