Views Bangladesh Logo

ডাকসু সংগ্রহশালায় ইতিহাস বিকৃতি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রতিবাদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের জাদুঘরে অনুমোদনহীন ও অনিয়মতান্ত্রিক সংস্কারের নামে ঐতিহাসিক ছবি ও নথি সরিয়ে ইতিহাস বিকৃতিতে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইউনিভার্সিটি টিচার্স নেটওয়ার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সংগঠনটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রতিবাদ জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও ঘটনাস্থল পরিদর্শনের মাধ্যমে তারা জানতে পেরেছে, জাদুঘরের দেয়ালে আগে টাঙানো অনেক মূল্যবান ও ঐতিহাসিক ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও মুক্তিসংগ্রামের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিও রয়েছে। একই স্থানে তৎকালীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি স্থাপন করা হয়েছে। সংগঠনটির একটি প্রতিনিধিদল ডাকসু জাদুঘর পরিদর্শন করে এসব পরিবর্তনের সত্যতা দেখেছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

ইউনিভার্সিটি টিচার্স নেটওয়ার্ক বলেছে, ডাকসুর মতো ঐতিহাসিক ও প্রতিনিধিত্বশীল স্থানে এ ধরনের কর্মকাণ্ড অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষিত স্থাপনা ও জাদুঘরে কোনো পরিবর্তন, সংস্কার বা পরিবর্ধন করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পূর্বানুমোদন এবং নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। শিক্ষার্থী সংসদের কোনো নেতা, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা উগ্র ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম উপেক্ষা করে জাদুঘরের পরিবর্তন করার সুযোগ নেই।

সংগঠনটি আরও বলেছে, ডাকসু জাদুঘর বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস। ফলে এর মতো সংবেদনশীল স্থানে যেকোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা প্রয়োজন।

বিজ্ঞপ্তিতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভূমিকার সমালোচনা করে বলা হয়, তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন না। বরং ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্নে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণা করে তিনি তৎকালীন পূর্ব বাংলার বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিরোধিতা করেছিলেন। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সংঘটিত গণহত্যার জন্যও পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি। এমন একটি রাষ্ট্রের বিতর্কিত শাসকের ছবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইতিহাস ও সংগ্রামের স্মারকে যথাযথ ঐতিহাসিক তথ্য ছাড়া স্থান দেওয়া বাঙালি জাতির প্রতি অবমাননাকর বলেও মন্তব্য করেছে সংগঠনটি।

শেখ মুজিবুর রহমান প্রসঙ্গে ইউনিভার্সিটি টিচার্স নেটওয়ার্ক বলেছে, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং জাতীয় মুক্তির প্রতিটি আন্দোলনের পেছনে তার গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব ছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে তাকে ঘিরে বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে সেই বিতর্ককে সামনে রেখে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগের ইতিহাসের গুরুত্ব মুছে দিতে তার ছবি সরিয়ে ফেলা গ্রহণযোগ্য নয়।

সংগঠনটির ভাষ্য, শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি ক্ষোভকে তার কন্যা ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি ক্ষোভের সঙ্গে একাকার করে ইতিহাসের প্রধান ব্যক্তিত্বদের মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞপ্তিতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের হাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের ওপর সংঘটিত গণহত্যার কথাও তুলে ধরা হয়। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও এ হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় উল্লেখ করে সংগঠনটি বলেছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত ছবি বা নথি সরিয়ে কোনো নির্দিষ্ট উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মেনে নিতে পারেন না।

ইউনিভার্সিটি টিচার্স নেটওয়ার্ক বলেছে, ডাকসু জাদুঘর কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি পুরো জাতির ঐতিহাসিক স্মারক। তাই ইতিহাস বিকৃতির এ প্রচেষ্টার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।

ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলে তারা জানতে পেরেছে। জাদুঘরে অনুমোদনহীন পরিবর্তন ও ইতিহাস বিকৃতির পুরো ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।

একই সঙ্গে জাদুঘর থেকে ঐতিহাসিক ছবি ও স্মারক সরানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা। পাশাপাশি জাদুঘর থেকে সরিয়ে নেওয়া সব ছবি ও স্মারকের পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তালিকা প্রকাশ করে সেগুলো আগের জায়গায় যথাযথ মর্যাদায় পুনঃস্থাপনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

ডাকসু জাদুঘরের ঐতিহাসিক মর্যাদা ও ইতিহাসের সত্য অক্ষুণ্ন রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি টিচার্স নেটওয়ার্ক।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ