Views Bangladesh Logo

রংপুরে চার খুনের যেসব প্রশ্নের জবাব মিলছে না

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং দুই সন্তান আগামী ও আয়ুসকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও আদায় করেছে পুলিশ। কিন্তু ঘটনার প্রযুক্তিগত কিছু আলামত নিয়ে খোদ তদন্তকারীদের কাছেই স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই, যা পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

গত শনিবার রাতে রংপুর শহরের দাসপাড়া মাছুয়াপাড়া এলাকার বাসা থেকে তালা ভেঙে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানানো হলেও ঘটনার রাতে গোটা বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ কীভাবে বিচ্ছিন্ন হলো, তার সদুত্তর দিতে পারেনি পুলিশ।

সংযোগ পুনরায় চালু করতে ডাকা স্থানীয় ইলেকট্রিশিয়ান উজ্জ্বল কুমার বর্মন জানান, ‘গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে সংযোগ দেওয়া হয়েছে, সেখানে উঠে আমি দেখেছি সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। লাইনটা পুরোপুরি খোলা ছিল। অর্থাৎ নিউট্রাল ফেজের তার খুলে ফেলা। বাসাবাড়ির লাইন লুজ হলে লাগা থাকে। স্পার্ক করে ঝুলে থাকে। কিন্তু এভাবে খুলে পড়ে থাকতে দেখিনি। কেউ খুলে রেখেছে বলেই আমার মনে হয়েছে।’ তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিলন কুমার চ্যাটার্জি বলেন, এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।

পরিবারের দাবি, নিহত চারজনের প্রত্যেকের হাতেই আলাদা মোবাইল ফোন ছিল। অথচ পুলিশ উদ্ধার করেছে ডিটারজেন্টে ভেজানো অবস্থায় মাত্র দুটি ফোন। বাকি দুটি ফোন কোথায় গেল, সে প্রশ্নের জবাব এখনো অজানা।

মামলার বাদী ও নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন গ্রেপ্তারকৃত দুইজনের পক্ষে এতবড় ঘটনা ঘটানো আদৌ সম্ভব কিনা তা নিয়ে। তিনি বলেন, ‘বাড়িতে ঢুকে একই পরিবারের চারজনকে মাত্র দু’জনের পক্ষে হত্যা করা সম্ভব নয়। আমার ধারণা, হত্যাকাণ্ডের পেছনে বড় কোনো শক্তি ও নেপথ্য কাহিনি রয়েছে। সন্দেহটা ওই জায়গায় যে দুইটা লোকের পক্ষে এই হত্যাকাণ্ড করা সম্ভব নয়। চারটে মানুষকে দুইটা লোকে মারবে এবং তারা সুস্থভাবে বাড়িতে ঘুমাবে, এটা কখনোই সম্ভব নয়। একটা মানুষ খুন করা চাট্টিখানি কথা নয়। এর পিছনে কোনো বড় শক্তি আছে অলক্ষ্যে, আড়ালে। হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত আছে।’

তদন্ত নিয়ে হতাশাও প্রকাশ করেন তিনি। গোপীনাথের মেয়ে কৃষ্ণা তালুকদারও বলেন, ‘পুলিশ বলছে, ওই দু’জনের কাছ থেকে কিছু গহনা উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কথা যদি সত্যি হয় তাহলে ওই দুইজন এই ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। কিন্তু শুধু দু’জনের পক্ষে চারজনকে হত্যা করা সম্ভব নয়। এর পেছনে অন্য আরও কেউ আছে এটা আমরা নিশ্চিত। কিন্তু পুলিশ তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে কিনা বুঝতে পারছি না। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।’

একই সুরে সন্দেহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান যুব ঐক্য পরিষদও। সংগঠনের সভাপতি শিমুল সাহা রংপুরে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। পরে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘হত্যাকারী যেই হোক আমরা ন্যায়বিচার চাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো পুলিশ যা বলছে, সেটা তো কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না। এমনকি আমরাও বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি নিজে গ্রেপ্তার হওয়া ছেলে দুইটার বাড়িতে গিয়ে কথা বলেছি। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাতে আমাদের মনে হয়েছে, কিছু লুকানো হচ্ছে। তাই আমরা বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করেছি।’

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথও বলেন, ‘পুলিশের তদন্তে শুরু থেকেই আমাদের সন্দেহ আছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ দু’জনকে ধরে বলল, এরাই খুনি। আবার তাদের খুব বেশি জিজ্ঞাসাবাদ না করেই আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দিল। পুলিশের আচরণ ও কাজকর্মে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারছি না। আমরা সরকারের কাছে সঠিক তদন্তের দাবি করছি।’

এদিকে ময়নাতদন্তে ধর্ষণ কিংবা অ্যাসিড ব্যবহারের কোনো আলামত মেলেনি বলে জানিয়েছেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে যখন মরদেহগুলো আনা হয়েছে, তার অন্তত দুই দিন আগে তাদের মৃত্যু হয়েছে। লাশগুলোতে পচন ধরেছিল। পোকাও হয়ে গিয়েছিল। ফলে ডোমের কাছে যেটা বীর্য মনে হয়েছিল, আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি, আসলে সেটা বীর্য ছিল না। ফলে সেখানে ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেনি।’ মুখমণ্ডল বিকৃত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি জানান, রাসায়নিক বা অ্যাসিড বার্নের কোনো চিহ্ন মেলেনি; দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় স্বাভাবিক পচন প্রক্রিয়াতেই মুখ কালচে ও বীভৎস দেখিয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃত মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের মাদকাসক্তি নিশ্চিত করতে ডোপ টেস্টের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। মামলার তদন্তভার এখন দেওয়া হয়েছে রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে। গ্রেপ্তার দুই অভিযুক্তর পরিবারও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস বলেন, ‘আমার সন্তান নেশা করে একথা কোনদিন শুনিওনি। কেউ বলেওনি। সে স্বর্ণের দোকানে কাজ করতো। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমার ছেলে জড়িত থাকতে পারে একথা এলাকার কেউ বিশ্বাস করবে না। তারপরও আমি চাই সুষ্ঠু তদন্ত হোক। তাতে যদি আমার ছেলে দোষী হয় তাহলে আমিও তার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’

মঙ্গলবার নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির উঠানে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান হয়। একইদিন রংপুর জিলা স্কুল প্রাঙ্গণে স্মরণসভায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ