মিস ওয়ার্ল্ডের মঞ্চে মাতৃত্বের গল্প, সাত স্তরের রহস্যে উগান্ডার ‘লেয়ার্স অব লাইফ’
ফ্যাশনের মঞ্চে সাধারণত ঝলমলে পোশাক, নকশা আর নান্দনিকতাই দর্শকের নজর কাড়ে। তবে মিস ওয়ার্ল্ড ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ডিজাইনার অ্যাওয়ার্ডে উগান্ডার প্রতিযোগীর পোশাক যেন সেই প্রচলিত ধারণাকেই বদলে দিল। হাজারো জমকালো গাউনের ভিড়ে তাঁর পরনে দেখা গেল মানবদেহের ভেতরের এক জটিল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ‘লেয়ার্স অব লাইফ’ নামের এই গাউনটি তৈরি হয়েছে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় মায়ের শরীরের সাতটি স্তর অতিক্রম করে সন্তানের জন্ম নেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে।
গাউনটির নেপথ্যে রয়েছেন উগান্ডার ফ্যাশন ডিজাইনার কীশা আবদুল্লাহ। মাতৃত্বের নিজস্ব অভিজ্ঞতাই তাঁকে এই ব্যতিক্রমী পোশাক তৈরিতে অনুপ্রাণিত করেছে। সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় একজন নারীর শরীরের ওপর দিয়ে যে কঠিন শারীরিক প্রক্রিয়া যায়, সেটিকে পোশাকের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। সাধারণত অস্ত্রোপচারের পর শরীরে থাকা সামান্য ক্ষতচিহ্নটিই চোখে পড়ে। কিন্তু সেই দাগের আড়ালে শরীরের ভেতরে ঘটে যাওয়া জটিল পরিবর্তন অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়।
‘লেয়ার্স অব লাইফ’ গাউনে সেই অদৃশ্য শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকেই দৃশ্যমান করা হয়েছে। ত্বক থেকে শুরু করে সাবকিউটেনিয়াস ফ্যাট, ফ্যাসিয়া, পেটের মাংসপেশি, পেরিটোনিয়াম, জরায়ু এবং অ্যামনিওটিক থলি, সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সঙ্গে সম্পর্কিত সাতটি স্তরের ধারণা এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি স্তরকে আলাদা টেক্সচার ও কাপড়ের বিন্যাসের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।
লাল, গোলাপি, ক্রিম ও ত্বকের রঙের সমন্বয়ে তৈরি গাউনটির নকশায় ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষভাবে রঙ করা সুতো ও বিভিন্ন লেয়ারিং কৌশল। দূর থেকে পোশাকটি যেমন একটি শৈল্পিক গাউন মনে হয়, কাছ থেকে দেখলে তাতে মানবদেহের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর প্রতীকী উপস্থাপন চোখে পড়ে। ফলে এটি একই সঙ্গে ফ্যাশন, শিল্প ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ধারণাকে এক সুতোয় বেঁধেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। সিজারিয়ান সেকশনকে অনেক সময় সন্তান জন্মদানের সহজ পদ্ধতি হিসেবে দেখা হলেও এটি আসলে একটি বড় ধরনের অস্ত্রোপচার। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে মায়ের শরীরে একাধিক স্তর অতিক্রম করার জটিল প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সুস্থ হয়ে ওঠার সময়। সেই বাস্তবতাকে ফ্যাশনের আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরে গাউনটি সি-সেকশন নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ও সামাজিক সংকোচের বিষয়টিও সামনে এনেছে।
ফ্যাশন সমালোচকদের কাছে তাই ‘লেয়ার্স অব লাইফ’ কেবল একটি প্রতিযোগিতার পোশাক নয়। এটি মাতৃত্বের শারীরিক সংগ্রাম, যন্ত্রণা ও শক্তির প্রতীক হিসেবেও আলোচনায় এসেছে। উগান্ডার প্রতিযোগীর এই উপস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, ফ্যাশন শুধু সৌন্দর্য প্রদর্শনের মাধ্যম নয়, চাইলে তা মানুষের শরীর, মাতৃত্ব ও জীবনের গভীর বাস্তবতাও বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে পারে।
মতামত দিন