Views Bangladesh Logo

ডেঙ্গুতে খুলনায় এক রাতে দুই অন্তঃসত্ত্বার মৃত্যু, মেলেনি আইসিইউ

তৃতীয় সন্তানের অপেক্ষায় ছিলেন নুসরাত জাহান। চিকিৎসক সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের তারিখও ঠিক করে দিয়েছিলেন। পরিবারের সবাই অপেক্ষা করছিলেন নতুন অতিথির জন্য। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হলো এক রাতেই। ডেঙ্গু আক্রান্ত নুসরাতের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে খুলনার একাধিক হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা খুঁজেও পাওয়া যায়নি। ঢাকায় নেওয়ার পথে ফরিদপুরের ভাঙ্গার কাছে তার মৃত্যু হয়। গর্ভের সন্তানকেও বাঁচানো যায়নি।

একই রাতে খুলনার আরেক হাসপাতালে মারা যান সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা সাদিয়া আফরিন সুমাইয়া। তারও প্রয়োজন ছিল নিবিড় পরিচর্যার। কিন্তু এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেওয়ার পরও আইসিইউ শয্যা মেলেনি। শেষ পর্যন্ত লেবার ওয়ার্ডেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নুসরাতের স্বামী নাহিদ হাসান জানান, গত শুক্রবার নুসরাতের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। সেদিন তার রক্তের প্লাটিলেট নেমে আসে ৬২ হাজারে। তাকে খুলনা নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসক আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে চেষ্টা করেও আইসিইউ শয্যা না পেয়ে রাতে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেও কোনো শয্যা খালি ছিল না।

পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে নুসরাতকে ঢাকার দিকে নেওয়া হচ্ছিল। রোববার ভোরে ফরিদপুরের ভাঙ্গার কাছে তার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হলে দ্রুত স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গর্ভের সন্তানকে বাঁচানোরও চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটিও সম্ভব হয়নি।

নুসরাতের পরিবার তখন সন্তানের জন্মের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। গত ১৫ সেপ্টেম্বর চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করেছিলেন নাহিদ-নুসরাত দম্পতি। চিকিৎসক গত রোববার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের দিন নির্ধারণ করেছিলেন। নবজাতকের নামও ঠিক করে রেখেছিল পরিবার। সেই দিনই তাদের ঘরে নেমে আসে শোক।

নাহিদের বড় ভাই মাহমুদ হাসান সোহেল বলেন, নতুন সন্তানকে ঘিরে পুরো পরিবার আনন্দে ছিল। কিন্তু কীভাবে সবকিছু বদলে গেল, তারা এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না। নুসরাতের ছয় বছর বয়সী মেয়ে রওদা মায়ের মৃত্যুর অর্থ পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও মাঝেমধ্যে প্রশ্ন করছে, ‘আমি কাকে আম্মু বলে ডাকব?’

নুসরাত বটিয়াঘাটার ইউসুফিয়া দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। গর্ভধারণের পর চাকরি ছেড়ে দেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, সন্তানদের মশার কাছ থেকে দূরে রাখার বিষয়ে তিনি সবসময় সতর্ক থাকতেন। নুসরাতের স্বামী নাহিদ হাসান খুলনার একটি গ্রামীণফোন সেন্টারের উপপরিচালক হিসেবে কাজ করেন।

একই সময়ে সাদিয়া আফরিন সুমাইয়ার অবস্থাও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। পরিবারের সদস্যরা জানান, গত বুধবার তার মায়ের এবং শুক্রবার বাবার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এর মধ্যে সুমাইয়ারও জ্বর আসে। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় পরিবার প্রথমে এটিকে গর্ভকালীন কোনো জটিলতা বলে মনে করেছিল। তাই তিনি হাসপাতালে যাননি।

শনিবার রাতে সুমাইয়ার শরীরে রক্তক্ষরণ শুরু হলে স্বজনরা তাকে দ্রুত গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা আইসিইউতে ভর্তির পরামর্শ দেন। কিন্তু সেখানে আইসিইউ না থাকায় তাকে সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেও আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি। অন্য হাসপাতালগুলোতেও খোঁজ করেও শয্যা না পেয়ে তাকে ওই হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। রোববার ভোরে সুমাইয়ার মৃত্যু হয়।

সুমাইয়ার দেড় বছর বয়সী মেয়ে কেয়া এখনো মায়ের খোঁজ করছে। স্বজনদের কাছে বারবার জানতে চাইছে, ‘আমার সোনা মা কোথায়?’ দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের পর বাবার বাড়িতে ছিলেন সুমাইয়া। কয়েক দিন ধরে জ্বর থাকলেও সেটিকে গর্ভকালীন সমস্যা মনে করায় ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়নি। হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার অবস্থা গুরুতর ছিল। মৃত্যুসনদে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

নুসরাত ও সুমাইয়ার পরিবার বলছে, দুজনেরই চিকিৎসার জন্য শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন হয়েছিল নিবিড় পরিচর্যার। কিন্তু সংকটের সময়ে আইসিইউ শয্যা না পাওয়ায় চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের সরকারি হিসাবেও তাদের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ হাজার ৮৯৮ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ১১ জন। তবে বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি বলে জানা গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৬৫৫ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯০ জনে। মোট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৩ হাজার ৬২৭ জন।

এই ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৩১৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। খুলনা বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ২৭১ জন। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ২৮১ জন, বরিশালে ২১৭, রাজশাহীতে ১৪৬, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৬৭, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬৬, ময়মনসিংহে ৪৩, রংপুরে ৪১ এবং সিলেটে ৯ জন ভর্তি হয়েছেন।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শরীফ শাম্মীউল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সিটি করপোরেশন সরাসরি হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করে। হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হিসেবে ভর্তি বা মৃত্যু না হলে সেই তথ্য তাদের কাছে আসে না। ফলে সরকারি হিসাবের বাইরে থাকা মৃত্যুর সংখ্যা আলাদাভাবে ধরা পড়ছে না।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, এডিস মশা নির্মূলে সিটি করপোরেশন কাজ করছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সাতটি বিনামূল্যের চিকিৎসা শিবিরও চালু রয়েছে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ