Views Bangladesh Logo

বাংলায় কালী পূজার প্রচলন

হিন্দুদের তেত্রিশ কোটি দেবতা, বলা হয়ে থাকে। সনাতনধর্মীদের দেবকল্পনায় আবার দেবদেবীদের সারি ও শ্রেণি নির্দিষ্ট হয়েছে, যেমন হয়েছে গ্রিক ও মিশরীয় দেবকল্পনায়। মিশরে রা, আইসিস, হোরাস, আনুবিসরা প্রথম সারির দেবতা। গ্রিকদের মধ্যে যেসব দেবদেবী অলিম্পাস পাহাড়ে থাকেন, সেই জিউস, হেরা, অ্যাথেনা বা পসেইডন প্রমুখ হচ্ছেন মুখ্য দেবতা।

ভারতীয় পুরাণে ব্রহ্মা, বিষ্ণু (কৃষ্ণ) ও মহেশ্বরকে (শিব) এই স্থান দেওয়া হয়েছে। আর দেবীদের মধ্যে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী। কালী দেবী দুর্গারই আরেক রূপ, যে দেবীর নামের প্রথম উল্লেখ মেলে অথর্ববেদে। সেখানে যে ‘কালসূক্ত’ বা কালকে (মহাসময়, Eternal Time) বন্দনা করা হয়েছে, তারই সমরেখ এই দেবী। অগ্নির সাতটি লেলিহান জিহ্বার একটিকে ‘কালী’ বলা হয়েছে আবার। মুণ্ডক উপনিষদে পাই এই সাতটি জিহ্বার নাম, যার প্রথমটিই ‘কালী’। দীর্ঘদিন বাদে, ষষ্ঠ শতকে রচিত মার্কণ্ডেয় পুরাণে দেবী কালীর সবিশেষ বর্ণনা মেলে। সেখানে তিনি দশমহাবিদ্যার প্রথম দেবী, যিনি বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ—এই ত্রিকালকে ধারণ করে আছেন।

সনাতনধর্মে বিশ্বাসীরা শৈব, শাক্ত, গাণপত্য, বৈষ্ণব ও কার্তিকেয়—প্রধানত এই পাঁচটি শাখায় বিভক্ত। অর্থাৎ কেউ শিব, কেউ শক্তি (দুর্গা, কালী), গণেশ, শ্রীকৃষ্ণ, আবার কেউ কার্তিকেয়ের (প্রচলিত নাম কার্তিক) উপাসক। কালীর একান্ত ভক্তরা অতএব শাক্ত। এই অভিধা প্রমাণ করে, তাঁরা শক্তির উৎস হিসেবে কালীর ভূমিকায় আস্থাশীল।

যুগে যুগে দেবী কালীর নানান বিবর্তিত রূপ দেখতে পাই। আর সেই সূত্রে কালীর নামও ভিন্ন ভিন্ন। ওই যে দশমহাবিদ্যার কথা বলা হলো আগে, ‘বিদ্যা’ আসলে এখানে দেবীর সমার্থক শব্দ। তাঁরা হলেন কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলা। এঁদের নিয়ে আলাদা আলাদা কাহিনি আছে কালিকাপুরাণে।

যাই হোক, কালী একদিকে সর্বশক্তিময়ী, অন্যদিকে দেবী দুর্গার মতোই অসুরবিনাশী। যেমন রক্তবীজ, শুম্ভ ও নিশুম্ভ (দুই ভাই), চণ্ড ও মুণ্ড (এরাও দুই ভাই), দারুকাসুরসহ আরও অনেকে। এই যে দেবীদের হাতে অসুরদের হত্যা, এর একাধিক তাৎপর্য রয়েছে। এক, পুরুষ দেবতারা নন, দেবীর শক্তি ও ঘৃণাই প্রণোদিত করছে অসুর তথা অশুভ শক্তিকে বিনাশ করার ক্ষেত্রে। আর দুই, নারীর শক্তি ও সামর্থ্যকে পুরুষের চেয়ে বলবত্তর দেখানো হয়েছে। ভারতীয় ষড়দর্শনের অন্যতম সাংখ্যদর্শনেও পুরুষকে নিষ্ক্রিয়-নির্বীর্য আর নারীকে জগৎসংসারের মূল কারয়িত্রী বলে বিবেচনা করা হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান ‘এক্স ওয়াই’ (পুরুষ) ও ‘এক্স এক্স’ (নারী)-এর বিভাজনরেখা দেখিয়ে নারীই যে সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের প্রকৃত কারয়িত্রী, তা সাব্যস্ত করেছে। ‘সাগরের তলদেশে হাঙরের মুখোমুখি হতে যে সাহসের প্রয়োজন হয়, নারীর তা আছে’—বলেছে সাংখ্যদর্শন। ভাবতে অবাক লাগে, আদ্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে কী করে এমন উত্তুঙ্গ করে ঘোষণা দিল! এখানে নারী ‘প্রকৃতি’ নামে পরিচিত, আর তার অন্য অভিধা হলো আদ্যামাতা, নারীশক্তি, জগন্মাতা। জগন্মাতা শব্দে ‘Eternal Motherhood’-এর দ্যোতনা রয়েছে।

একটা কৌতূহলী জিনিস। দেবদেবীর পুজোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, দেবীদের, অর্থাৎ দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী (পরবর্তীকালে লোকায়ত দেবী মনসা)-কে আমিষ নিবেদন করতে হয়, কিন্তু কৃষ্ণ, রামচন্দ্র বা শিবের পুজোয় নিরামিষ আহার্য দিতে হয়। দুর্গাপূজায় তো মোষ বলিই প্রশস্ত, সঙ্গে ছাগ (খাসি নয়)। লক্ষ্মী-সরস্বতী পুজোয় লাগে ইলিশ। কেউ কেউ সরস্বতী পুজোয় নিরামিষও খান। তবে লক্ষ্মীপুজোয় কখনো নয়। তবে আরেকটি নিয়ম আছে। ব্রাহ্মণের ঘরে যে লক্ষ্মী বা সরস্বতী ও অন্য দেবতার পুজো হয়, সেখানেই রান্না করা খাবার দেওয়া চলে, যাকে বলে ‘ভোগপ্রসাদ’। অব্রাহ্মণরা কেবল ফলপ্রসাদ দেওয়ার অধিকারী। জাতপাত বড় বিসদৃশ হিন্দু সমাজে।

ছাগ বলি দিয়ে তার মাংস রান্না করে খাওয়া হয়। মোষের মাংস খাওয়া হিন্দুদের নিষিদ্ধ নয়। তবে বলির মোষের মাংস খাওয়ার কথা বিশেষ শোনা যায় না। মধ্যযুগের কবি মুকুন্দরাম ও এ যুগে তারাশঙ্করের লেখায় পুজোয় মোষ বলি ও তার মাংস খাওয়ার কথা আছে। তবে তা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের প্রথা হিসেবেই দেখানো হয়েছে। কালী ও মনসাপূজায় ছাগবলি দিতে হয়। তবে এসব নিষ্ঠুর প্রথা সামাজিকতা ও মানবিকতার চাপে পড়ে অনেক কমে এসেছে। বদলে চালকুমড়ো, আখ, তরমুজ, শসা বা পুতুল বলি দেওয়া হচ্ছে। ডাকাতরা ডাকাতি করার আগে যে কালীপুজো করত, সেখানে নরবলির মতো বীভৎস ঘটনাও ঘটত। বিহারে ঘাটশীলার কাছে রঙ্কিণীদেবীর মন্দির-সংলগ্ন স্থানে বলিকৃত মানুষের অজস্র হাড়গোড় পাওয়া গেছে।

আইন করে এসব ব্রিটিশ সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল। কালীপুজোতে বলির বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘রাজর্ষি’। তবু এই প্রথা আজও লুপ্ত হয়নি।

এবার বলি বাংলায় কালীপুজোর জনপ্রিয়তার কথা। বাংলায় প্রবাদ আছে, ‘কানু বিষে গীত নেই’, অর্থাৎ কানু বা শ্রীকৃষ্ণ বাঙালিদের (সনাতনীদের) কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁকে নিত্য স্মরণ, পূজা, বৈষ্ণব কবিতায় কৃষ্ণ, নামাবলীতে, নামগানে, এমনকি অন্তিমে শ্মশানযাত্রাতেও ‘হরে রাম’ কীর্তন করতে করতে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। আর কৃষ্ণের পরেই রয়েছে কালীর স্থান। কৃষ্ণের অসংখ্য নামের কোনো না কোনোটি যেমন সনাতনীদের রাখা হয়—বাসুদেব, গোবিন্দ, গোপাল, মাধব, গিরিধারী ইত্যাদি—ঠিক তেমনি কালী ও তাঁর প্রতিশব্দ দিয়েও মেয়েদের নাম রাখা হয়—শুভ্রা, কৃষ্ণা, শ্যামা, তারা, ভবানী, এলোকেশী, নারায়ণী, পরমেশ্বরী, সাবিত্রী।

যদিও কার্তিকী অমাবস্যায় কালীপুজো সবচেয়ে বেশি হয়, সারাবছর ধরেই কিন্তু নানান তিথিতে কালীপুজো হয়। যেমন রটন্তী কালীপুজো হয় মাঘ মাসের চতুর্দশীতে (সাধারণত অমাবস্যায় কালীপুজো হলেও রটন্তী কালীপুজো এর ব্যতিক্রম), ফলহারিণী কালীপুজো (উল্লেখ্য, জ্যৈষ্ঠে অনুষ্ঠিত এই পুজোর দিনেই ১৮৭৩ সালে শ্রীরামকৃষ্ণ সারদাদেবীকে পুজো করেন) ইত্যাদি।

আজকে যে কালীপুজোর রমরমা, তার সূচনা কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের মাধ্যমে। সপ্তদশ শতকের নবদ্বীপের এই তান্ত্রিক পণ্ডিত তন্ত্রের ১৭০টি পুঁথি পর্যালোচনা করে তাঁর বিখ্যাত ‘তন্ত্রসার’ গ্রন্থটি লেখেন, যেখানে কালীপুজোর বিধিবিধান দেওয়া হয়েছে। এর পর থেকেই বঙ্গে কালীপুজোর ব্যাপক প্রচলন, অজস্র কালীমন্দিরের নির্মাণ। যদিও তার আগে থেকেই কালীমন্দির ছিল। কলকাতার বিখ্যাত কালীমন্দিরটির কথা তো পঞ্চদশ শতকের মুকুন্দরামের লেখাতেই পাই—

‘কালীঘাটে এড়াইলো বেনের নন্দন।
ওইখানে গিয়া ডিঙি দিলা সে দর্শন।।'

ধনপতি সদাগর কালীগাটে তরী বেঁধে পুজো দেন কালীর।

তাছাড়া ভারতীয় পুরাণে যে একান্ন পীঠের কথা প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত, সেই উপমহাদেশব্যাপী মন্দিরগুলো সব কালীরই, যেখানকার একেক পীঠের ‘ভৈরব’ তথা রক্ষাকর্তা বিভিন্ন নামে স্বয়ং শিব।

হ্যাঁ, ভৈরব। একান্ন পীঠের যে কালী, তাঁদের যেমন আলাদা নাম, তেমনি সেই মন্দিরের ভৈরব, অর্থাৎ শিবও পীঠবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন নামধারী। যেমন কালীঘাটের কালী অম্বিকা, আর সেখানকার ভৈরব নকুলেশ্বর। প্রাচীন ভারতের মানচিত্র যেন ধরা পড়ে একান্ন পীঠ পরিক্রমার মাধ্যমে, যা ছড়িয়ে আছে উপমহাদেশের ব্যাপ্ত পরিধিতে, এমনকি এখনকার পাকিস্তান ও বাংলাদেশেও। সিলেট, যশোর (যশোরেশ্বরী), বরিশাল (শিকারপুর)—ব্যাপ্ত এই সতী তথা কালীপীঠ।

এখানে সতীর একটু ব্যাখ্যা জরুরি। পুরাণে আছে, সতী দক্ষের মেয়ে, শিবের স্ত্রী। দক্ষের অন্য এক মেয়ের বিয়েতে সতী গেলে সবার সামনে দক্ষ শিবের নিন্দা শুরু করেন। ব্যথাহত সতী দুঃখে আত্মহত্যা করলে সেই সংবাদ যখন শিবের কাছে পৌঁছায়, ক্রুদ্ধ শিব স্ত্রীকে কাঁধে নিয়ে প্রলয়নাচ শুরু করলে পৃথিবী রসাতলে যেতে বসে। কৃষ্ণ তাঁর চক্র দিয়ে সতীর দেহ একান্নটি অংশে ছিন্ন করলে তা একান্নটি বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এবং শিবের নাচ থামে। সতীপীঠ কালীপীঠে রূপান্তরিত হয়। এ-ও মনে হয় দেবতার বিনির্মাণ। কলকাতায় কালীঘাট ছাড়াও ঠনঠনিয়া, দক্ষিণেশ্বর (রানি রাসমণি প্রতিষ্ঠিত, যেখানকার পুরোহিত ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ), ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি ইত্যাদি থাকলেও এগুলো কিন্তু একান্ন পীঠের অন্তর্গত নয়।

শেষকথা। সমুদ্রমন্থনে অমৃত ওঠার আগে আরও অনেক কিছু উঠেছিল। তার মধ্যে ছিল হলাহল বা কালকূট, অর্থাৎ বিষ। বিষের প্রভাব আকাশ-বাতাসে ব্যাপ্ত হয় (চেরনোবিল, ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনা স্মর্তব্য)। তখন পরিত্রাতা হয়ে দেখা দেন শিব। তিনি সমুদয় বিষ পান করেন। তবে গলাধঃকরণ করেননি, শিবজায়া পার্বতী তাঁর গলা চেপে ধরেন, যাতে বিষ পেটে না যায়। শিব বিষ কণ্ঠে রেখে দিয়েছিলেন, যে কারণে তাঁর ‘নীলকণ্ঠ’ নাম।

পেটে যায়নি, তবু তো বিষ, তার প্রভাব আছে না একটা? অতএব শিবের বিস্বাদ মুখে পার্বতী তাঁর স্তন তুলে দিয়ে শিবকে স্তনসুধা পান করান। পুরাণের এ এক অনবদ্য ও সাহসী নির্মাণ! পার্বতীর স্তনপানরত শিবের মূর্তি আছে তারাপীঠে। তবে তা সাধারণ দর্শকদের দর্শনীয় নয়। ‘কোনো কোনো ভাগ্যবানে দেখিবারে পায়।’

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ