বান্দরবানের জমজমাট পর্যটন স্পটগুলোতে ভ্রমণপিপাসুদের ঢল
ঈদের চতুর্থদিনে এসে বান্দরবানের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ঢল নেমেছে ভ্রমণপিপাসুদের। দীর্ঘদিনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর লম্বা ছুটি কাটাতে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের পাশাপাশি এসেছেন স্থানীয় ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের দর্শণার্থীরাও।
আগের তিনদিনের পর্যটকখরা কাটিয়ে মঙ্গলবার (১০ জুন) লাখো মানুষের পদচারণায় মুখর পর্যটন স্পটগুলো। পরিবার-পরিজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের নিয়েও ঘুরতে এসেছেন অনেকে। জেলার হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট গেস্টহাউজগুলোতেও কোনো রুম ফাঁকা নেই। শহরের ধনেশপাখি মোড়ের জিপগাড়ি স্টেশনে ট্যুরিস্ট বহনকারী চার শতাধিক চাঁদের গাড়ির একটিও বসে নেই। পর্যটকদের নিয়ে পছন্দনীয় স্পটগুলোতে ছুটে বেড়াচ্ছে সবগুলোই।
পর্যটকরা বলছেন, ‘ভ্রমণের জন্য অসাধারণ জায়গা পাহাড়ি প্রকৃতি এবং শৈল্পিক ছোয়ায় সাজানো বান্দরবান। নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ সার্বিক পরিস্থিতিও পর্যটকবান্ধব’। তবে, তবে পর্যটন স্পটগুলোতে পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় নারীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন বলেও জানান কেউ কেউ।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, নীল দিগন্ত, নীলাচল, নীলগিরি, মেঘলা লেক, প্রান্তিক লেক, শৈলপ্রপাত, বুড্ডিস্ট টেম্পল, বাংলার দার্জিলিং খ্যাত চিম্বুক পাহাড় এবং নীলগিরি সড়কের ডাবল হেন্ডস ভিউ ও টাইটানিক ভিউ পয়েন্টসহ পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ভ্রমণপিপাসুরা। অসংখ্য ঝর্নাধারা, রহস্যে ঘেরা দেবতাখুম, আলীর সুড়ঙ্গের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর দূর-দূরান্তের দর্শনীয় স্থানগুলোতেও বসেছে পর্যটকদের মিলনমেলা।
পাহাড়ের আনাচে-কানাচে কিংবা মেঘলা লেকের পানিতে প্যাডেল বোট ও ইঞ্জিন নৌকায় ঘুরে ঘুরে চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যে ঘেরা প্রকৃতির নির্মল ছোঁয়া পেয়ে খুশি তারা। ডিম পাহাড়, বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের তীর্থস্থান স্বর্ণমন্দির, রামাজাদী ও গৌতম বুদ্ধের মূর্তির সামনে, পাহাড়ের ভেতরে তৈরি টানেল এবং মেঘলা লেকের ঝুলন্ত সেতুতে দলবদ্ধ ছবি তোলার আনন্দেও মেতেছেন অনেকে। কোথাও কোথাও আবার স্বস্তিতে সেলফি তোলারও ঠাঁই নেই।
নীলাচলে বেড়াতে আসা পর্যটক মুক্তার আলী রাহন ও রায়হান বলেন, পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে বান্দরবান অনন্য। এ যেন সৃষ্টিকর্তার অলৌকিক দান। ছুটির দিনগুলোতে সময় পেলেই এখানে ঘুরতে আসি, ভালোই লাগে। পাহাড়ের পাশাপাশি সমুদ্র দেখে কখনোই মন খারাপ হয় না’।
মেঘলা লেকের সামনে পর্যটক সানজিদা ও শায়েলা বলেন, ‘অদ্ভুত সুন্দর এখানকার পাহাড়গুলো। পর্যটন স্পটগুলো প্রকৃতি আর শৈল্পিক ছোঁয়ায় সাজানো-গোছানো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা ও নজরদারিতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না থাকায় নিশ্চিন্তে ঘুরে-বেড়াতেও পারছি’।
জেলায় পর্যটকদের সেবায় রয়েছে শতাধিক হোটেল-মোটেল রিসোর্ট গেস্ট হাউস। পর্যটকদের পরিবহনে রয়েছে চার শতাধিক ট্যুরিস্ট গাড়িও। সব মিলিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩০ হাজার মানুষ পর্যটন ব্যবসা সংশ্লিষ্ট। পর্যটক বরণে দিনভর ব্যস্ততাময় তৎপরতার পাশাপাশি পর্যটনশিল্পের আরও প্রসারে আশাবাদী তারাও।
ট্যুরিস্ট গাড়িগুলোর শ্রমিকনেতা কামাল আহমেদ জানান, দীর্ঘদিন পর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ঈদের লম্বা ছুটিতে সবগুলো ট্যুরিস্ট গাড়িই ভাড়া হয়েছে। স্টেশনে কোনো গাড়িই বসা ছিল না। উল্টো গাড়ির অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে পর্যটকদের। চাপ সামলাতে হিমসিম খেতে হয়েছে পরিবহন দায়িত্বশীলদেরও।
জেলা হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন বলেন, বৈচিত্র্যময় জেলা বান্দরবান ভ্রমণে এখন আর কোনো বাধা নেই। ঈদের ছুটির সঙ্গে এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে আশানুরূপ পর্যটকের সাড়া মিলেছে। সব উপজেলার পর্যটন স্পটগুলোই স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়াতে পারছেন পর্যটকরা।
তিনি বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে প্রথম কয়েকদিন তেমন পর্যটক ছিল না। তবে মঙ্গলবার সবগুলো হোটেল-মোটেল রিসোর্টের সব রুম বুকিং হয়ে গেছে। কোথাও রুম ফাঁকা নেই৷ সামনের দিনগুলোতে আরও অনেক পর্যটক আসবেন বলে আমরা সবাই আশাবাদী। এভাবেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা কাটিয়ে দ্রুতই ঘুরে দাঁড়াবে পাহাড়ের পর্যটন শিল্পও’।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মনজুরুল হক বলেন, সেনাবাহিনীর পরামর্শে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে প্রশাসন। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য উন্মুক্ত এখন গোটা বান্দরবান।নিরাপত্তার কোনো সমস্যাও নেই। পর্যটকরা নিরাপদে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়াতে পারছেন পছন্দের পর্যটন স্পটগুলোতে। তাদের সার্বিক নিরাপত্তা ও আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিতে কাজ করছে প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীও।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে