টাকায় বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ বিক্রির সুযোগ ট্যুর অপারেটরদের
বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ এখন বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে টাকায় বিক্রি করতে পারবেন নির্দিষ্ট ট্যুর অপারেটররা। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সদস্য ট্যুর অপারেটরদের এই সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন ব্যবস্থায় দেশের ভেতরে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে টাকায় বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজের মূল্য নেওয়া যাবে। পরে সংশ্লিষ্ট বিদেশি ট্যুর অপারেটর, হোটেল বা অন্যান্য সেবা প্রদানকারীর কাছে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে পারবেন অনুমোদিত ব্যাংক।
রোববার এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার ফলে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য মুদ্রা বিনিময় ও আলাদা করে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া কিছুটা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, টোয়াবের সদস্য এমন ট্যুর অপারেটররা এই সুবিধা পাবেন, যাদের বিদেশি ট্যুর অপারেটর, হোটেল অথবা ডেস্টিনেশন ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি কিংবা ব্যবসায়িক সমঝোতা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে পর্যটকদের আবাসন, পরিবহনসহ বিভিন্ন প্রকৃত ভ্রমণসেবা নিশ্চিত করার পর সংশ্লিষ্ট খরচের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাঠানো যাবে।
নতুন ব্যবস্থায় নিয়মিত বার্ষিক ভ্রমণ কোটার বাইরে একজন পর্যটকের জন্য প্রতি ক্যালেন্ডার বছরে সর্বোচ্চ ৩ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কোনো বাংলাদেশি পর্যটক ট্যুর অপারেটরের কাছ থেকে বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ টাকায় কিনতে পারবেন এবং সেই প্যাকেজের প্রকৃত বিদেশি সেবার মূল্য পরিশোধের জন্য ব্যাংক থেকে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো যাবে।
তবে এই ব্যবস্থার ক্ষেত্রে লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে ট্যুর অপারেটরদের। প্রত্যেক পর্যটকের পাসপোর্ট নম্বরের বিপরীতে লেনদেনের তথ্য রাখতে হবে। একই সঙ্গে ওই পর্যটক অন্য কোনো ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে নির্ধারিত বার্ষিক সীমা অতিক্রম করে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করেননি—এমন একটি ঘোষণা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে নিতে হবে।
তবে বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজের মূল্য যদি ৩ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি হয়, সেক্ষেত্রেও বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ধরনের প্যাকেজের মূল্য আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় সংগ্রহ করতে হবে। এই লেনদেনের ক্ষেত্রে অনুমোদিত ডিলার বা এডি ব্যাংকগুলো অ্যাকোয়ারিং সেবা দিতে পারবে। ফলে তুলনামূলক বেশি মূল্যের বিদেশ ভ্রমণ প্যাকেজের ক্ষেত্রেও বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পরিশোধের সুযোগ থাকবে।
বিদেশি সেবাদাতাদের কাছে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রেও কাগজপত্র যাচাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিটি বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট ইনভয়েস, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি, বিস্তারিত ভ্রমণসূচি, ভ্রমণকারীদের তালিকা এবং পর্যটকের কাছ থেকে টাকায় অর্থ গ্রহণের প্রমাণ যাচাই করতে হবে। অর্থাৎ শুধু প্যাকেজ বিক্রির দাবি করলেই বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর অনুমতি মিলবে না; ভ্রমণসেবার প্রকৃত অস্তিত্ব ও অর্থ লেনদেনের প্রমাণ থাকতে হবে।
এ ছাড়া অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর সাত দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের বিস্তারিত বিবরণ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জমা দিতে হবে। এর ফলে বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ বিক্রি এবং এর বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর বিষয়টি কেন্দ্রীয়ভাবে নজরদারির আওতায় থাকবে।
ব্যবসায় সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এত দিন বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ কিনতে গিয়ে গ্রাহকদের বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ ও পরিশোধের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হতো। এখন ট্যুর অপারেটরের কাছে সরাসরি বাংলাদেশি টাকায় প্যাকেজের মূল্য পরিশোধের সুযোগ তৈরি হওয়ায় গ্রাহকদের জন্য লেনদেন আরও সহজ ও স্বচ্ছ হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আরও মনে করছেন, নতুন এই ব্যবস্থা দেশের আউটবাউন্ড ট্যুরিজম বা বিদেশমুখী পর্যটন খাতকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। একই সঙ্গে ট্যুর অপারেটরদের মাধ্যমে বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ বিক্রি বাড়লে ব্যবসায়িক লেনদেন ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আসবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাও আরও নিয়মতান্ত্রিক হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিদেশ ভ্রমণকারী সাধারণ মানুষ যেমন একটি সহজ অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা পাবেন, তেমনি বৈধ ও নিবন্ধিত ট্যুর অপারেটরদের ব্যবসার পরিধিও বাড়তে পারে। তবে সুবিধাটি পাওয়ার ক্ষেত্রে টোয়াবের সদস্যপদ, বিদেশি সেবাদাতার সঙ্গে চুক্তি, নির্ধারিত বৈদেশিক মুদ্রার সীমা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণের শর্তগুলো মানতে হবে।
মতামত দিন