তোফায়েল আহমেদ আর নেই
মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ আর নেই।
শনিবার (৪ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর এক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান বলে নিশ্চিত করেছেন তোফায়েল আহমেদের ভাতিজা সাবেক এমপি আলী আজম মুকুলের ব্যক্তিগত সহকারী সালাউদ্দিন।
কয়েক বছর ধরে হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন তোফায়েল আহমেদ। স্ট্রোকের কারণে তার শরীরের একাংশ প্যারালাইজড হয়ে গিয়েছিল বলে জানা গেছে। নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ছিলেন তিনি।
তোফায়েল আহমেদ ৯ বার জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। সর্বশেষ তিনি ভোলা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে ভয়াবহ স্ট্রোকের কারণে তোফায়েল আহমেদের শরীরের একাংশ প্যারালাইজড হয়ে গেছে। স্মৃতিভ্রষ্টতায় ভুগতে থাকায় তিনি চারপাশ চিনতে অক্ষম হয়ে পড়েন। তার বাঁ হাত ও পা অবশ হয়ে যায় এবং তিনি চলাফেরায় অক্ষম হয়ে পড়েন।
অধিকাংশ সময় শয্যাশায়ী থাকাসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার কারণে প্রায়ই তাঁকে হাসপাতালে নিতে হতো। তাঁর শারীরিক অবস্থার এতটাই অবনতি হয়েছিল যে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার মতো অবস্থাও ছিল না বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে তোফায়েল আহমেদের জন্ম। তিনি ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এমএসসি পাস করেন। কলেজ জীবনেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত সহ-সভাপতি (ভিপি) ছিলেন তিনি। ১৯৬৮-৬৯-এ গণজাগরণ ও ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন তিনি ডাকসুর ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থানের নেতৃস্থানীয়দের একজন ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরের বছর তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। তিনি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। ‘মুজিববাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন তিনি।
বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা নিয়ে গঠিত মুজিববাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১০ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগরে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ প্রতিষ্ঠার অন্যতম সংগঠকও তিনি। পরের বছর গণপরিষদ গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় তিনি অংশগ্রহণ ও স্বাক্ষর করেন।
তোফায়েল আহমেদকে ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৩ সালে নিজের জেলা ভোলা থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর সপরিবার হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তোফায়েল আহমেদ শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বাণিজ্যমন্ত্রী হন।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ১৯৭৫ সাল থেকে টানা ৩৩ মাসসহ অসংখ্যবার জেল খেটেছেন তিনি। জনপ্রতিনিধি হিসেবে চেষ্টা করেছেন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে জনসাধারণের দাবিগুলো জাতীয় সংসদে উত্থাপন করার।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে