কবি জীবনানন্দ দাশের ৭২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবিতায় স্বতন্ত্র কাব্যভাষা, নিসর্গপ্রেম ও বিষণ্নতার অনন্য জগৎ নির্মাণকারী কবি জীবনানন্দ দাশের ৭২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ‘রূপসী বাংলার কবি’ হিসেবে পরিচিত এই সাহিত্যিক ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণের সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কবিতার গভীরতা, চিত্রকল্প ও স্বতন্ত্র ভাষাশৈলীর কারণে তিনি আজও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী কবি।
১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন জীবনানন্দ দাশ। বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রপ্রভাবের বাইরে নিজস্ব কাব্যভুবন নির্মাণ করে তিনি আধুনিকতার এক ভিন্নতর ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর কবিতায় প্রকৃতির নিবিড় সৌন্দর্যের পাশাপাশি উঠে এসেছে নিঃসঙ্গতা, বিষণ্নতা, নাগরিক জীবনের ক্লান্তি এবং মানুষের অস্তিত্বসংকট। জীবদ্দশায় তাঁর কবিতা নিয়ে নানা সমালোচনা থাকলেও পরবর্তী সময়ে পাঠক ও সাহিত্যসমালোচকদের কাছে তাঁর স্বতন্ত্রতা বিশেষভাবে স্বীকৃতি পায়।
জীবনানন্দের মৃত্যুর ঘটনাটিও আজও আলোচনার বিষয়। ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জ এলাকায় ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২২ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা ছিল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল, তা নিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা রয়েছে।
কবি বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দ দাশকে অভিহিত করেছিলেন ‘নির্জনতম কবি’ হিসেবে। এই পরিচয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর নিভৃতচারী জীবন ও কবিতার অন্তর্মুখী বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর কবিতায় বাংলার মাঠ, নদী, পাখি, ঘাস ও কুয়াশার চিত্র যেমন জীবন্ত হয়ে উঠেছে, তেমনি প্রতিফলিত হয়েছে সময়, স্মৃতি, মৃত্যু ও মানুষের অন্তর্গত নিঃসঙ্গতার অনুভব।
জীবনানন্দের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ঝরা পালক’, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘সাতটি তারার তিমির’ ও ‘রূপসী বাংলা’। এর মধ্যে ‘রূপসী বাংলা’ তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। বাংলার প্রকৃতি ও জনপদের প্রতি গভীর অনুরাগ এই কাব্যগ্রন্থকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। অন্যদিকে ‘বনলতা সেন’ কবিতায় ইতিহাস, ক্লান্তি, ভ্রমণ ও আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা এক অনন্য কাব্যিক আবহ তৈরি করেছে।
কবিতার পাশাপাশি কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধ রচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন জীবনানন্দ দাশ। তাঁর রচিত ‘মাল্যবান’ ও ‘সুতীর্থ’ উপন্যাস এবং ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে তাঁর বহুমাত্রিক সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে। জীবদ্দশায় তাঁর সাহিত্যকর্মের একটি অংশ প্রকাশিত হলেও মৃত্যুর পর উদ্ধার হওয়া পাণ্ডুলিপি থেকে বহু অপ্রকাশিত কবিতা, উপন্যাস ও ছোটগল্পের সন্ধান পাওয়া যায়।
জীবনানন্দের কবিতার অন্যতম শক্তি হলো পরিচিত প্রকৃতিকে নতুন চোখে দেখার ক্ষমতা। ধানসিঁড়ি নদী, বাংলার গ্রাম, শ্যামল প্রান্তর কিংবা সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা তাঁর কবিতায় নিছক দৃশ্য হয়ে থাকেনি, বরং মানুষের স্মৃতি ও অনুভূতির সঙ্গে মিশে এক গভীর জীবনবোধ তৈরি করেছে। তাঁর কবিতার বিষণ্নতা হতাশার একমাত্রিক প্রকাশ নয়; বরং তা জীবনের ক্ষয়, সৌন্দর্য ও অস্তিত্বের জটিলতাকে উপলব্ধি করার একটি বিশেষ পথ।
জীবনানন্দ দাশের আদি নিবাস বাংলাদেশের বরিশালে। তাঁর পূর্বপুরুষেরা একসময় বর্তমান মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলের বিক্রমপুরের কুমারভোগ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। পরে দাশ পরিবার বরিশালে বসতি গড়ে তোলে। বরিশালের প্রকৃতি ও পরিবেশ জীবনানন্দের কাব্যজগৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে সাহিত্য আলোচনায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে সাহিত্যপাঠের ধরন, বদলেছে মানুষের জীবনযাপনের গতি। কিন্তু জীবনানন্দ দাশের কবিতায় প্রকৃতি, স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা ও সৌন্দর্যের যে অন্বেষণ, তা আজও পাঠককে নতুন করে ভাবায়। তাঁর কবিতা তাই কেবল একটি সময়ের সাহিত্যিক নিদর্শন নয়, বরং বাংলা ভাষা ও মানুষের অনুভবের জগতে এক স্থায়ী সম্পদ।
মতামত দিন