সভায় অংশীজনদের দাবি
অধ্যাদেশ অনুমোদন শুধু কাগজে নয়, আইন হিসেবে রূপান্তর জরুরি
তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ অনুমোদন একটি বড় অর্জন হলেও, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো সেটিকে সংসদে পাস করে আইনে রূপান্তর করা এবং বাস্তবে কার্যকরভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করা—এমন মত দিয়েছেন স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অংশীজন। তারা বলেন, এই অধ্যাদেশ যেন কাগজেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তব জীবনে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখে, সেটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টার (সিআইসিসি)-তে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর কার্যকর বাস্তবায়নে করণীয় শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এসব মতামত তুলে ধরা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব সাইদুর রহমান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মিজ নূরজাহান বেগম। বিশেষ অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু জাফর এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ড. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ।
মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টোব্যাকো অ্যাটলাস ২০২৫ অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী প্রায় ২ কোটি ১৩ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহার করে। তামাকজনিত রোগে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যা দৈনিক গড়ে ৫৪৫ জনেরও বেশি।
এছাড়া তামাক ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ৩৯.২ হাজার কোটি টাকা। অংশীজনরা একে দেশের জন্য একটি ‘নীরব তামাক মহামারী’ হিসেবে অভিহিত করেন।
উপদেষ্টা পরিষদের সর্বশেষ বৈঠকে (২৪ ডিসেম্বর ২০২৫) অনুমোদিত সংশোধিত অধ্যাদেশে উল্লেখযোগ্য কিছু কঠোর বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—ই-সিগারেট, ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ENDS), হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্ট (HTP) নিষিদ্ধ, নিকোটিন পাউচকে ‘তামাকজাত দ্রব্য’-এর সংজ্ঞার আওতায় আনা, পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহণে সব ধরনের তামাক ব্যবহার নিষিদ্ধ, ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান (DSA) রাখার বিধান সরকারের অনুমোদনের শর্তাধীন, তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও বিক্রয়স্থলে প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং প্যাকেটে স্বাস্থ্য সতর্কবাণী ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করা।
অংশীজনরা বলেন, এসব বিধান বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত অধ্যাদেশটিকে সংসদে পাস করে আইনে পরিণত করা অপরিহার্য।
সভায় স্বাগত বক্তব্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি বলেন, প্রতিদিন তামাকের কারণে ৫৬৪ জন মানুষ মারা যাচ্ছে। যদি বিমান দুর্ঘটনায় এত মানুষ মারা যেত, আমরা স্তব্ধ হয়ে যেতাম। কিন্তু তামাকজনিত মৃত্যু নীরব, ধোঁয়ার মতো ধীরে আসে—আর আমরা এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
তিনি বলেন, তামাক খাত থেকে সরকার যেখানে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়, সেখানে চিকিৎসা ব্যয় ও উৎপাদনশীলতা হারিয়ে ক্ষতি হয় ৮৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ফরিদা আখতার বলেন, অধ্যাদেশ অনুমোদন হয়েছে সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। কিন্তু তামাক কোম্পানিগুলো বসে নেই। সামনে নির্বাচন, তাই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে—ক্ষমতায় এলে যেন তারা দ্রুত এটিকে আইনে পরিণত করে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নূরজাহান বেগম বলেন, এই অধ্যাদেশ অনুমোদনের কৃতিত্ব আমাদের সবার। কিন্তু নির্বাচিত সরকার এসে যদি এটি সংসদে পাস না করে, তাহলে এতদিনের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করতে নিরবচ্ছিন্ন অ্যাডভোকেসি চালিয়ে যেতে হবে এবং সব মন্ত্রণালয়কে নিজ নিজ ক্ষেত্র ধূমপানমুক্ত করার আহ্বান জানান।
সভায় আরও বক্তব্য দেন বিসিআইসির সাবেক চেয়ারম্যান ও সিটিএফকে-বাংলাদেশের লিড পলিসি অ্যাডভাইজর মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ভাইটাল স্ট্রাটেজিস বাংলাদেশের সিনিয়র কনসালটেন্ট মো. শফিকুল ইসলাম, ডব্লিউএইচও বাংলাদেশের প্রতিনিধি ড. রাজেশ নারওয়াল এবং জ্যেষ্ঠ কারিগরি পরামর্শক অ্যাডভোটেক সৈয়দ মাহবুবুল আলম।
তারা বলেন, অধ্যাদেশটিকে জনদাবিতে রূপান্তর করতে ব্যাপক জনসমর্থন গড়ে তুলতে হবে। তাহলে সরকার এটিকে উপেক্ষা করতে পারবে না।
মতামত দিন