সুন্দরবনে শিকারির ফাঁদ থেকে উদ্ধার বাঘিনীটি বাঁচার জন্য লড়ছে
সুন্দরবনে শিকারির ফাঁদ থেকে উদ্ধার করা গুরুতর আহত বাঘিনীটি বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে। রবিবার (৪ জানুয়ারি) বিকেলে বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার সরকার খালের পাশে বৈরাগী বাড়ির কাছে নাইলনের দড়ির ফাঁদ থেকে ৩-৪ বছর বয়সী বাঘিনীটিকে উদ্ধার করে বন বিভাগ।
পশুচিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বেশ কয়েকদিন ধরে আটকে থাকা প্রাণীটি খুব দুর্বল এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
গাজীপুর সাফারি পার্কের পশুচিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. জুলকার নায়েন বলেন, ‘ফাঁদে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকার কারণে বাঘিনীটি বাম পায়ে বেশি আঘাত পেয়েছে। পা পচে গেছে। রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে গেছে। রক্তনালী এবং শরীরের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাঘিনীটি খনিজ ও লবণের ঘাটতি এবং তীব্র অনাহারে ভুগছে।’
তিনি বলেন, ‘বাঘিনীটির নাক থেকে তরল নিঃসরণ লক্ষ করা গেছে। তার শারীরিক অবস্থা এখনও সংকটজনক। বর্তমানে তাকে অন্য কোথাও স্থানান্তর করার মতো অবস্থা নেই। চিকিৎসা চলছে, তবে সুস্থ হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন।’
খুলনা বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ডিএফও নির্মল কুমার পাল বলেন, ‘রবিবার সন্ধ্যায় বাঘিনীটি জ্ঞান ফিরে পেয়েছে, কিন্তু এখনও অসুস্থতার মধ্যে রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বারবার চেষ্টা করার পরেও সে হাঁটছে না এবং খাবার গ্রহণ করছে না। লবণাক্ত পানি এবং ওষুধ পানিতে মিশ্রিত করা হচ্ছে। একটি বিশেষজ্ঞ দল তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হতে পারে।’
এদিকে, সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় শিকারিদের ফাঁদ উদ্ধারের জন্য চিরুনি অভিযান শুরু করেছে বন বিভাগ।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘সোমবার সকালে অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযান কমপক্ষে দুই দিন চলবে।’
তিনি বলেন, ‘যদিও এখন পর্যন্ত কোনো শিকারিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, গত ৮ মাসে প্রায় ৩৫ হাজার ফুট হরিণ শিকারের ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে।’
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে খাবার ছাড়া আটকা থাকার পর বাঘিনীটি খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। স্থানীয় ও বিদেশি পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।’
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা উদ্ধার অভিযানে বিলম্বের সমালোচনা করে বলেছেন, আগেভাগে ব্যবস্থা নিলে আঘাতের তীব্রতা কমানো যেত।
তারা কর্তৃপক্ষকে নজরদারি জোরদার এবং সুন্দরবনে বাঘ রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও ওয়াইল্ডটিমের সিইও অধ্যাপক ডা. আনোয়ারুল ইসলাম বাঘিনীকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বন কর্মকর্তা, পশুচিকিৎসক, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে বলেছেন।
তিনি বলেন, ‘বাঘ সুন্দরবনের অভিভাবক এবং স্থানীয় জনগণ বাঘের অভিভাবক। বাঘ ছাড়া সুন্দরবন টিকে থাকতে পারে না।’
অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘বাঘ বাংলাদেশের জাতীয় পশু। সুন্দরবন বাঘের একমাত্র আশ্রয়স্থল। বর্তমানে সুন্দরবনে ১২৫টি বাঘ রয়েছে। আমরা একটি বাঘও হারাতে চাই না।’
শনিবার (৩ জানুয়ারি) বিকেলে বনের প্রায় আধা কিলোমিটার ভেতরে একজন জেলে বাঘটিকে প্রথম দেখতে পান। এলাকাটি ঘিরে রাখার পর রবিবার বিকেলে বন কর্মকর্তারা প্রাণীটিকে শান্ত করে খুলনা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যান।
বন বিভাগের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা ১২৫টিতে দাঁড়িয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালের হিসাবে বাঘের সংখ্যা ১১৪টি এবং ২০১৫ সালে ১০৬টি ছিল।
এ অঞ্চলে শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার কারণে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে বাঘ।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে