মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়া নিয়ে টিআইবির উদ্বেগ

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির দাবি, খসড়া দুটিতে কিছু ইতিবাচক বিষয় থাকলেও মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু দুর্বলতা বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে গুমের ঘটনায় দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে—এমন কিছু বিধানও খসড়ায় রাখা হয়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এসব কথা বলেন।
গত ১০ আগস্ট সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে খসড়া দুটি অনুমোদন করা হয়।
টিআইবি বলেছে, অতীতের গুম, খুন ও বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল বাস্তবে কতটা শিক্ষা নিয়েছে, খসড়া দুটি পর্যালোচনায় সে প্রশ্নই সামনে এসেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বড় একটি অংশ শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে। অথচ প্রস্তাবিত আইনে শৃঙ্খলা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনকে সরকার বা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
তার দাবি, ২০০৯ সালের আইনেও একই ধরনের দুর্বলতা ছিল। এর ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কমিশন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ‘এ’ শ্রেণির মর্যাদা অর্জন করতে পারেনি।
কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটিতে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে রাখার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, বাছাই কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যেও সরকারের প্রভাব থাকার সুযোগ থাকায় কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি রয়েছে।
এ ছাড়া কমিশনে নারী, সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা না থাকায়ও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি।
টিআইবির মতে, খসড়ায় কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান বলা হলেও এটি কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীন হবে না—এ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি। ঢাকার বাইরে কার্যালয় স্থাপন ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে সরকারের পূর্বানুমোদন, সরকারি কর্মচারীদের প্রেষণে নিয়োগ এবং সরকারি চাকরিতে থাকা ব্যক্তিকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগের সুযোগ কমিশনের স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
এ ছাড়া বর্তমান সরকারের সময়ে প্রণীত প্রাথমিক খসড়ায় থাকা ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনে অজুহাত অগ্রহণযোগ্য’ বিষয়ক বিধান বাদ দেওয়ারও সমালোচনা করেছে টিআইবি।
সামরিক আটককেন্দ্রকে কমিশনের পূর্বঘোষণা ছাড়া পরিদর্শনের এখতিয়ার থেকেও বাদ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন করেন, এর মাধ্যমে গোপন আটককেন্দ্র বা ‘আয়নাঘর’ বহাল রাখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়ায় গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপর এককভাবে ন্যস্ত করারও সমালোচনা করেছে টিআইবি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গুমের ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বড় একটি অংশই শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। এমন পরিস্থিতিতে গুমের তদন্ত পুরোপুরি পুলিশের হাতে রাখা হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে অধস্তন তদন্ত কর্মকর্তার তৈরি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওই কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। টিআইবির আশঙ্কা, এ ধরনের বিধান বাস্তবে গুমের ঘটনায় বিচারহীনতার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
টিআইবির অভিযোগ, খসড়ায় জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি গুমের সংজ্ঞায় যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বাংলাদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গুমের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়নি বলেও দাবি করেছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকে কারাগার, হাজতখানা, আটককেন্দ্র ও গোপন আটককেন্দ্র পরিদর্শনসহ যেসব ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, অনুমোদিত খসড়ায় সেসব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রাখা হয়নি বলে জানিয়েছে টিআইবি।
সংস্থাটি বলেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, মানবাধিকার, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষ্য এবং সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইন দুটি সংসদে উত্থাপনের আগে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে পুনরায় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মতামত দিন